এ বারের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ কোয়ার্টার ফাইনালে লিভারপুল দুই পর্ব মিলিয়ে পেপ গুয়ার্দিওলার ম্যাঞ্চেস্টার সিটিকে ৫-১ (৩-০ ও ২-১) হারিয়েছিল। দ্বিতীয় পর্বের ম্যাচটির পরে লিখেছিলাম, এই লিভারপুলকে ফাইনালে দেখতে পাচ্ছি। কাজেই মহম্মদ সালাহরা ফাইনালে ওঠায় আমি বিন্দুমাত্র অবাক নই। লিভারপুলের এই সাফল্যের নেপথ্যে আসল লোকটিই হলেন দলের ম্যানেজার য়ুর্গেন ক্লপ।
যাঁর ফুটবল দর্শন হল— সর্বদা আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে দশর্কদের আনন্দ দেওয়া। আর লিভারপুলের সেই এতটাই তীব্র যে বিপক্ষ গোলকিপারের পায়ে বল থাকলেও সেই বল কেড়ে গোল করার জন্য তাড়া করছেন সালাহ, সাদিও মানে, রবের্তো ফির্মিনোরা। ফুটবলের পরিভাষায় যাকে বলে, ‘হাই প্রেসিং ফুটবল’। এই ধরনের ফুটবল খেলতে গেলে তিনটে বিষয় দরকার হয়। ফিটনেস, শক্তি এবং হার না মানা মানসিকতা। এই তিনটে বিষয় গত দুই মরসুম ধরে জেমস মিলনার, সাদিও মানেদের হৃদয়ে গেঁথে দিয়েছেন জার্মান ফুটবল ম্যানেজার ক্লপ।
ফুটবলের মোদ্দা ব্যাপারটা হল গোল। পাড়ার খেলা থেকে বিশ্বকাপ—সর্বত্রই আমরা ভিড় জমাই দর্শনীয় গোল দেখার জন্য। ক্লপের এই ঘরানার ফুটবলে গোল বেশি হচ্ছে। আর আমার মতে এটাই ভবিষ্যতের ফুটবল। মাঝে, ফুটবল খেলা বড় বেশি রক্ষণ সংগঠন-নির্ভর হয়ে পড়েছিল। অতি-রক্ষণাত্মক বা প্রতি-আক্রমণ ভিত্তিক ফুটবল খেলছিল দলগুলো। কিন্তু এখন সেই আক্রমণাত্মক ফুটবল ফিরছে। যা দেখাচ্ছে ক্লপের লিভারপুল।
এ প্রসঙ্গে আমাদের দেশের প্রয়াত ফুটবল কোচ অমল দত্তর ডায়মন্ড সিস্টেমে আমার মোহনবাগানে খেলার দিনগুলো মনে পড়ছে। ১৯৯৭ সালের সেই মরসুমে ঠিক এ ভাবেই অমল স্যরের মোহনবাগান গোলের পর গোল করছিল আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলে। আর ভরিয়ে দিচ্ছিল মাঠ। কারণ, দর্শকরা আনন্দ পাচ্ছিল গোল দেখে। ক্লপকে দেখে আমার সেই অমল স্যরের কথা মনে পড়ছে। যিনি মনে করতেন, ফুটবলে জেতা-হারা তো থাকবেই। কিন্তু এর বাইরেও যেটা দরকার, সেটা হল, দর্শকদের আনন্দ দেওয়া। ক্লপের দল সেই মজাটা দিতে পারছে বলেই লিভারপুলের খেলা ভাল লাগছে। প্রচুর গোল, সালাহ-মানেদের মতো গতিময় তারকা ফুটবলারদের ব্যক্তিগত দক্ষতা, ঢেউয়ের মতো গোলমুখী আক্রমণ আছড়ে পড়ছে বিপক্ষ রক্ষণে। এই ধরনের ফুটবল তো চোখ টানবেই।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের নক আউট পর্বে পোর্তো, ম্যাঞ্চেস্টার সিটি ও রোমাকে দুই পর্ব মিলিয়ে ১৭ গোল দিয়েছে লিভারপুল। এই ছোট্ট একটা তথ্যই বুঝিয়ে দিচ্ছে লিভারপুলের এই আক্রমণাত্মক ফুটবল কতটা বিধ্বংসী।
এই লিভারপুল কতটা ভয়ঙ্কর প্রতিপক্ষদের কাছে তার একটা ছোট্ট উদাহরণ দিই। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে এ বছর চ্যাম্পিয়ন হয়েছে ম্যাঞ্চেস্টার সিটি। যে দলের ম্যানেজার পেপ গুয়ার্দিওলা। অত্যন্ত ঝলমলে তাঁর দলের পারফরম্যান্স। কিন্তু ইপিএল এবং চ্যাম্পিয়ন্স লিগ মিলিয়ে সেই ম্যান সিটিকেই এই বছরে তিন বার হারিয়েছে লিভারপুল। এর পিছনে ক্লপের পাশাপাশি আর এক জনের নাম উল্লেখ করতে হবে। তিনি হলেন, ‘মিশরের মেসি’ সালাহ। গোল করতে ও করাতে দুই ভূমিকাতেই সফল। ঠিকানা লেখা পাস বাড়ান। গতিটাও দারুণ। শারীরিক গঠনটাও চমৎকার। তার সঙ্গে জুড়েছেন রবের্তো ফির্মিনো, মানের মতো ফুটবলার। লিভারপুল আক্রমণ ভাগের এই ত্রয়ীকে রুখতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে বিপক্ষকে। যে কারণে শক্তিশালী রোমা রক্ষণও প্রথম পর্বের সেমিফাইনালে রুখতে পারেনি সালাহদের। আর ক্লপের বিশেষত্ব এখানেই যে যখনই রোমা রক্ষণ একটু উপরে উঠে এসেছিল, ঠিক তখনই লিভারপুল মাঝমাঠ থেকে জেমস মিলনার-রা কোনাকুনি লম্বা পাস বাড়াতে শুরু করলেন। বিশেষ করে রোমা মাঝমাঠের বাঁ দিকেই এটা হচ্ছিল বেশি। কারণ, রোমার ওই দিকে খেলা আলেকজান্দার কোলারভ উঠে গিয়ে নামতে পারছিলেন না দ্রুত। সেই দুর্বলতা কাজে লাগিয়েই গোল করেছেন সালাহ।
চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনালে এই লিভারপুলকে হারানো কিন্তু রিয়াল মাদ্রিদের পক্ষে খুব সহজ কাজ হবে না। তবে ক্লপের লিভারপুল দুরন্ত আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলার পাশাপাশি বিপক্ষকে সুযোগও দিচ্ছে। সে রকম যদি ফাইনালেও হয়, তা হলে কিন্তু বিপদে পড়তে পারেন ক্লপ। এর আগে লিভারপুলকে ২০১৫-১৬ মরসুমে ইউরোপা লিগের ফাইনালে তুলেও হেরে গিয়েছিলেন ক্লপ। কাজেই এ বার চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল ক্লপের কাছেও একটা পরীক্ষা। ফাইনালের ফল যাই হোক না কেন, লিভারপুল কিন্তু হেরে গেলেও দর্শকদের আনন্দ দিয়ে মাঠ ছাড়বে। এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত।
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy