মুখেন মারিতং ভারত। প্রধানমন্ত্রী মোদীর মন্ত্রিসভার রকমসকম এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের বিধ্বস্ত বাস্তব— এই দুই ছবি দেখে এ ছাড়া কিছুই মনে হয় না। এক দিকেসঙ্কটের পর সঙ্কটে সীমান্তবর্তী রাজ্যের মানুষ গ্রস্ত। অসম, মণিপুর, নাগাল্যান্ড, সর্বত্র অভ্যন্তরীণ অশান্তি, নিরাপত্তার চরম অভাব, সাধারণ মানুষের দুর্দশা সীমা ছাড়ানোর উপক্রম করেছে। অন্য দিকে, দিল্লিতে বসে দেশাধিপতিরা উত্তর-পূর্বে ‘বিকশিত ভারত’-এর স্বপ্ন বপন করছেন। গুয়াহাটিতে সম্প্রতি সম্পন্ন হল ‘অ্যাডভান্টেজ অ্যাসাম ২.০’, যাতে নাকি সে রাজ্যের বিপুল ‘প্রতিশ্রুতি’ পূর্ণ করে তাকে জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন দেওয়া যাবে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর আশীর্বাণী, ভারতের উন্নয়নের রূপরেখা এমনিতেই বিশ্বে প্রভূত প্রশংসা অর্জন করেছে, এ বার উত্তর-পূর্ব ভারত দেখিয়ে দিক তার সম্পদ ও সম্ভাবনার বিশালতা। সরকার-ঘনিষ্ঠ ব্যবসায়িক মহল যেমন অম্বানী, আদানি, জিন্দল, চন্দ্রশেখরন সেখানে উপস্থিত ছিলেন, এবং অকুতোদ্বিধায় প্রতিশ্রুতি বিতরণ করছিলেন। উপস্থিত ছিল চিন, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, তাইওয়ানের মতো এশিয়ার লগ্নিমুখী ক্ষমতাধর দেশগুলিও। প্রশ্ন এটাই যে, এমন ‘সামিট’ তো প্রথম বার ঘটছে না। অতীতে যা হয়নি, বর্তমানে যার টিকিমাত্র নেই, টিকি গজানোর ইঙ্গিতও নেই, ভবিষ্যতে যে তা পূর্ণকেশদামে বিকশিত হবে, এই ‘আশা’র পিছনে কত বড় ফাঁকির বাসা?
প্রসঙ্গত স্মরণীয়, তিন বছর আগে, শিলং-এ এমনই এক মহাবৈঠকে প্রধানমন্ত্রী মোদী প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, কয়েক হাজার কোটি টাকার দ্রুত বিনিয়োগে বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে উত্তর-পূর্বের চেহারা বদলে দেবেন। দু’টি স্লোগানও তৈরি করে দিয়েছিলেন, ‘অ্যাক্ট ফাস্ট ফর নর্থ-ইস্ট’ এবং ‘অ্যাক্ট ফার্স্ট ফর নর্থ-ইস্ট’। তার পরে কী হয়েছে, তা সকল ‘শ্যামলাল’ই জানেন। প্রবল হিংসা ও সংঘর্ষের বাতাবরণে ছারখার হয়ে গিয়েছে মণিপুর, ধ্বস্ত হয়েছে তার অর্থনীতি, এবং সঙ্গে সঙ্গে অসম ও নাগাল্যান্ডেও সঙ্কট ছড়িয়েছে। কোনও নতুন প্রকল্পের সূচনা দূরস্থান, যে সব প্রকল্প চলছিল তাদের ডিপিআর (ডিটেলড প্রোজেক্ট রিপোর্ট) পাঠানোও বন্ধ হয়েছে। সরকারি মহল থেকে রাজ্যসভার বিবরণীর অলোচনায় উঠে এসেছে পরিকল্পিত প্রকল্পের অত্যল্প ভাগ বাস্তবায়িত হওয়ার কথা। পরিস্থিতি এখনও ঘোর তিমিরেই।
রাজনৈতিক ও সামাজিক সংঘর্ষের কারণে উন্নয়ন ব্যাহত হচ্ছে বলে যাঁরা যুক্তি দেবেন, তাঁদের নিশ্চয় জানা যে উল্টো কথাটিও সত্য, উন্নয়নের ভয়ঙ্কর ন্যূনতার কারণেই এত সংঘর্ষ— সমাজে ও রাজনীতিতে। মণিপুরে মেইতেই বনাম কুকি-জ়ো গোষ্ঠীর ভয়াল সংঘর্ষের প্রেক্ষাপট— অতি স্বল্প উন্নয়নের ভাগ কে পাবে, তা নিয়ে সত্তাপ্রশ্নের দ্বন্দ্ব। কেবল এদের মধ্যেই নয়, বাস্তবিক, সমগ্র উত্তর-পূর্ব ভারতের সুবিস্তীর্ণ জনজাতি-অধ্যুষিত দরিদ্র বাসভূমিতে কান পাতলে একই কথা শোনা যায় যে, তাদের দারিদ্রসমুদ্রে নিমজ্জিত রেখে বাকি ভারত উন্নতিযাত্রায় ব্যস্ত। এই অভিযোগের মধ্যে খানিকটা কল্পিত, সত্তাবোধের অভিমানে জর্জরিত, কিন্তু বেশিটাই বাস্তব। আসল কথা, স্বাধীনতার ‘অমৃতকাল’ এল, চলেও গেল, অথচ উত্তর-পূর্বের প্রতিটি রাজ্যেই পরিকাঠামো থেকে কর্মসংস্থান ও জীবনযাত্রার মানে এই বিপুল সঙ্কট রয়ে গেল— এমনটা কিন্তু ঘটার কথা ছিল না।
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)