Advertisement
E-Paper

সম্পাদক সমীপেষু: শ্রমজীবীই মূল শক্তি

প্রসঙ্গক্রমে মহারাষ্ট্র বিধানসভার একটি কেন্দ্র ডহাণু। যেখানে নয়া উদারবাদ, ধর্মীয় মেরুকরণের বিরুদ্ধে লড়ে সিপিআইএম ধারাবাহিক ভাবে বার বার জয়ী হয়ে আসছে। তা সম্ভব হচ্ছে কারণ সেখানে খেতমজুর, কৃষকরাই দলের সাংগঠনিক শক্তি পোক্ত করছেন।

শেষ আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫ ০৬:৩৩
Share
Save

‘মানবজমিন?’ (৪-৩) শীর্ষক সম্পাদকীয় প্রসঙ্গে কিছু কথা। রাজ্য রাজনীতিতে বাম দলগুলির প্রাসঙ্গিকতা প্রায় হারিয়ে যাচ্ছে। এই দুঃসময়ে পার্টির রাজ্য সম্মেলনের প্রকাশ্য সমাবেশ, ডানকুনির জমায়েত দেখে উচ্ছ্বসিত নেতৃবৃন্দ। তাঁদের ভাষণে আগামী দিনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত স্পষ্ট। কিন্তু ২০১১ সালের পরে দলের ধারাবাহিক ব্যর্থতা কর্মীদের মধ্যে একটা হতাশা তৈরি করেছে। ৩৪ বছর ধরে যে দল নিরঙ্কুশ আধিপত্য নিয়ে সরকার পরিচালনা করেছে, তাদের এই ভঙ্গুর অবস্থা নিয়ে রাজনীতি বিশেষজ্ঞদের সামনে নানা প্রশ্ন উঠে এসেছে। প্রশ্ন উঠেছে ডানকুনির জমায়েতে কি সত্যিই আগামী দিনের সম্ভাবনার ইঙ্গিত? ২০২৩-এ যুব ‘ইনসাফ যাত্রা’, ব্রিগেডের ঐতিহাসিক জমায়েত— সবই তো হল। তার পর ২০২৪-এ লোকসভা নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হল। সেখানে দলের প্রাপ্তি শূন্য, শতাংশের হিসাবে আগের বারের চেয়েও ভোট কমল। আর জি করের ঘটনায় উত্তাল গণবিক্ষোভ দেখা গেল, কিন্তু উপনির্বাচনে দলগত ফলে তা বিন্দুমাত্র দাগ কাটল না।

আসলে এই বিপর্যয়ের অন্যতম প্রধান কারণ মধ্যবিত্ত নির্ভরতা, আর শ্রমজীবী শ্রেণির শক্তিকেন্দ্র থেকে পার্টির বিচ্ছিন্নতা। শাসক দলের ভয়ঙ্কর দুর্নীতি, অপরাধপ্রবণতা বিরোধীদের কাছে লড়াই করার অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করে দিলেও তা কাজে লাগাতে তারা ব্যর্থ। তার উপরে রয়েছে সাংগঠনিক দুর্বলতা, মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হওয়ার মতো কর্মসূচি ও তার ধারাবাহিকতার অভাব। প্রসঙ্গক্রমে মহারাষ্ট্র বিধানসভার একটি কেন্দ্র ডহাণু। যেখানে নয়া উদারবাদ, ধর্মীয় মেরুকরণের বিরুদ্ধে লড়ে সিপিআইএম ধারাবাহিক ভাবে বার বার জয়ী হয়ে আসছে। তা সম্ভব হচ্ছে কারণ সেখানে খেতমজুর, কৃষকরাই দলের সাংগঠনিক শক্তি পোক্ত করছেন। তাই ডানকুনি কিংবা ব্রিগেড সমাবেশ দেখে লাভের হিসাব আখেরে ফল দেবে না।

সারনাথ হাজরা, হাওড়া

নেতাও চাই

‘মানবজমিন?’ শীর্ষক সম্পাদকীয়টিকে বলা যায়, বর্তমানের সিপিআইএম দল সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন। এই দলে ভুল শোধরাবার পর্ব চলছে বটে কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তা যথেষ্ট নয়। সিপিআইএম দলের দেওয়াল-লিখনেই পড়লাম, ‘শ্রমিক কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে জনগণতান্ত্রিক বিপ্লব সফল করুন।’ জনগণতান্ত্রিক না জাতীয় গণতান্ত্রিক, অতীতে এ নিয়ে চর্চা কম হয়নি। সে সবই আজ থিতিয়ে গিয়েছে।

একদা লাল ঝান্ডা ‘গরিবের পার্টি’ হয়ে উঠেছিল ঠিকই, আর এ রাজ্যে লাল ঝান্ডার পার্টি বলতে মূলত সিপিআইএম দলকেই বোঝাত। ‘মধ্যবিত্তদের পার্টি’ হয়েও এই দল এক সময় নিপীড়িত শ্রমিক আর গরিব কৃষকের সংগ্রামকে মদত জুগিয়েছিল এবং সে লড়াইয়ের ফসল সে দিন তারা ঘরেও তুলেছে। কিন্তু সে সব দিন তো অতীত। নেতৃত্বের দম্ভ ও ভুল পদক্ষেপের কারণে শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী দল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। কম রোজগেরে, কম লেখাপড়া জানা লোকেরাও দলের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়েই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন। আজও এঁরা কমবেশি শাসক দলেরই ভোটার। ভোটশিকারের তাগিদে সিপিআইএম দল আবার এই প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে ফিরতে চাইছে। কিন্তু ফিরব বললেই তো আর ফেরা যায় না!

ফেরার প্রয়াস অবশ্য চলছে। দলের শ্রমিক, কৃষক সংগঠনের ডাকে আগামী ২০ এপ্রিল ব্রিগেড সমাবেশের আয়োজন তেমন ইঙ্গিতই বহন করছে। ব্রিগেড ভরাবার কৌশল দলের নেতারা জানেন, কাজেই সমাবেশ উতরে যাবে এমন কথা বলা যায়। কিন্তু সমাবেশে ভিড় জমাতে পারলেই তো আর ইভিএম-এর ফলাফল বদলে যাবে না। নিপীড়িত মানুষের মন জয় করতে হলে বর্তমান সময়ের শ্রমিক-কৃষককে সংগঠিত করার মতো ‘পার্টি-মেশিনারি’ চাই। কলকারখানার শ্রমিক বা কাস্তেতে শাণ দেওয়া কৃষকের পরিচয় আজ অনেকটাই বদলে গিয়েছে। শ্রমিক বলতে এখন বোঝায় সার্ভিস সেক্টরের পরিষেবাকর্মী, রিমোট ওয়ার্কার, গিগ শ্রমিক বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শ্রমিক। নবযুগের এই শ্রমিককে ট্রেড ইউনিয়নের আওতায় আনা খুব মুশকিল। কৃষক বলতেই বা কোন কৃষকসমাজকে বোঝানো হচ্ছে? গরিব কৃষক, না ধনী কৃষক? দেশের গরিব কৃষককে সংগ্রামমুখী করা যাচ্ছে না, অথচ গত দু’-তিন দশকে কয়েক লক্ষ কৃষক দেনার দায়ে আত্মহত্যা করেছেন। এ রাজ্যও এই প্রবণতা থেকে মুক্ত নয়। তা ছাড়া এ বঙ্গের কৃষক তো তৃণমূল-বিজেপি দ্বিত্বে বিভক্ত হয়ে আছেন।

অগণিত গরিব, কৃষক এবং বিপুল সংখ্যক অসংগঠিত শ্রমিককে সংগঠিত করবে কে? বাম নেতারা অবশ্যই সে পথ খুঁজে বেড়াচ্ছেন। ভোটযুদ্ধে জয়ী হওয়াই তাঁদের আশু লক্ষ্য, এ কথা মেনে নিয়েও বলতে হয়, ঘুরে দাঁড়াতে হলে বিপুল জনসমর্থন যেমন দরকার, তেমনই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ, তুমুল জনপ্রিয় তথা ‘ভোটক্যাচার’ নেতা বা নেত্রীকে জনগণের সামনে হাজির করাটাও জরুরি। কোনও জনপ্রিয় মুখকে ক্যাপ্টেন পরিচয়ে স্বীকার করাটা যথেষ্ট নয়, নেতৃত্বকে বুক ঠুকে বলতে হবে, তিনিই দলের প্রধান মুখ, ভাবী মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তাঁর ভাবমূর্তি গড়ে তোলাই হবে দলের লক্ষ্য। এমন কোনও দুঃসাহসিক সিদ্ধান্ত মহম্মদ সেলিম, সূর্যকান্ত মিশ্র প্রমুখরা কি গ্রহণ করতে পারবেন?

শিবাশিস দত্ত, কলকাতা-৮৪

পুঁজিবাদের স্বার্থে

শুভময় মৈত্রের ‘টেকনো-পুঁজিবাদের গল্প’ (১১-৩) প্রসঙ্গে কিছু কথা। প্রশ্ন হচ্ছে, যন্ত্রমেধার দ্রুত পরিবর্তনের ফলে শ্রমজীবী মানুষের কাজের বাজার সঙ্কুচিত হবে কি না। কাজের বাজারে ভয়ের বাতাবরণ নির্মাণ করতে পারলে অনেক ক্ষেত্রেই কম মজুরিতে কাজ করিয়ে নেওয়া সম্ভব, এই আশঙ্কা অমূলক নয়। শিল্প বিপ্লবের আদি পর্যায়েও কাজ হারাবার প্রশ্ন মানুষের মনে যেমন ছিল, আজও তা তেমনই আছে। ভবিষ্যতেও থাকবে। যদিও ‘যন্ত্র’ এবং ‘যন্ত্রমেধা’র মধ্যে একটা মৌলিক পার্থক্য রয়েছে। এত দিন যন্ত্রচালনা করার জন্য প্রশিক্ষিত শ্রমজীবী মানুষের প্রয়োজন হত। মুদ্রণ, বয়ন ইত্যাদি শিল্পে উন্নত যন্ত্রের ব্যবহার যুগান্তকারী পরিবর্তন এনে দিলেও প্রশিক্ষিত শ্রমিকের প্রয়োজন ফুরোয়নি। বিশেষ ভাবে প্রশিক্ষিত কর্মীরা সেখানে যথেষ্ট কাজ পেয়ে থাকেন।

মেট্রোযাত্রীরা যে যন্ত্রটিতে স্মার্ট কার্ড, টোকেন বা কাগজের বারকোড-যুক্ত টিকিট ব্যবহার করেন, সেটিকে যন্ত্রমেধার ক্ষুদ্রতম উদাহরণস্বরূপ ধরা যেতে পারে। এই যন্ত্রটিকে ফাঁকি দিয়ে স্টেশনে প্রবেশ করা কিংবা স্টেশনের বাইরে বেরিয়ে যাওয়ার উপায় থাকে না। মেট্রো রেলের প্রতিটি স্টেশনে এই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রটির ব্যবহার টিকিট চেকিং-এ নিয়োগের সুযোগ থেকে অনেক মানুষকে বঞ্চিত করেছে, সন্দেহ নেই। এই ভাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজের বাজার যেমন সঙ্কুচিত হবে, তেমনই নতুন যন্ত্র নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতির কাজেও প্রচুর দক্ষ কর্মীর প্রয়োজন হবে। যন্ত্রমেধার গবেষণা যত এগোবে, ততই প্রশিক্ষিত কর্মীর প্রয়োজন বাড়বে।

কিন্তু মুনাফা বৃদ্ধির স্বার্থে যে গবেষণা এগিয়ে চলেছে, তা কত মানুষকে কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দিতে পারবে, বলা কঠিন। আর এই গবেষণার নিয়ন্ত্রণ বৃহৎ পুঁজিপতিদের হাতেই থাকবে। এই ‘টেকনো-পুঁজিপতি’রা বিভিন্ন দেশে ক্ষমতাসীন দলের রাষ্ট্রনায়কদের পৃষ্ঠপোষকতা অনায়াসে পেয়ে যান। ট্রাম্প-মাস্ক জুটি এরই উদাহরণ। বিভিন্ন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত পুঁজিপতিদের সম্মিলিত শক্তির আগ্রাসন যে ক্রমেই ইচ্ছামতো মানুষের শ্রমশক্তিকে কাজে লাগাবে এবং তার মজুরিও নির্ধারণ করে শুধু নিজেদের মুনাফা বৃদ্ধি করতে চাইবে, তা সহজেই অনুমেয়।

প্রশ্ন ওঠে, এই টেকনো-পুঁজিপতিরাই কি পৃথিবীর অর্থনীতি-সমাজ-রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে থাকবে? শ্রমজীবী মানুষ কেবলই বঞ্চিত হবেন?

রতন রায়চৌধুরী, পানিহাটি, উত্তর ২৪ পরগনা

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Workers CPIM Labours Farmers

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or Continue with

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy

{-- Slick slider script --}}