‘আমি গান করতে ভালোবাসি, কিন্তু আমার বাবা গান করতে দেয় না’— মাত্রাটানা বড় বড় অক্ষরে নীল কালিতে এই লেখার পরে, আঁকাবাঁকা ইংরেজি হরফে লেখা নাম, ক্লাস এবং সেকশন। সাদা ছেঁড়া কাগজে এমনই ‘চিঠি’ স্কুলের দেওয়ালে টাঙানো মনের কথা জানানোর চিঠির বাক্সে ফেলেছে তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র। ছেলেটি স্কুলেও গুনগুন করে। যে গান শোনে সেই গানই ঘুরে ফিরে গায়। বাংলা হোক বা হিন্দি। সেই ছাত্রের বাড়িতেই গান ‘নিষেধ’। এর সঙ্গে স্কুল কর্তৃপক্ষকে ভাবাচ্ছে আরও দু’টি চিঠি।
তার একটিতে লেখা, ‘মা আমাকে খেলতে যেতে দেয় না।’ অন্য চিঠিতে চতুর্থ শ্রেণির এক ছাত্র লিখেছে, ‘আমি সোমবার স্কুলে আসতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আমার বাবা আমাকে স্কুলে নিয়ে আসেনি। তাই আমার মনখারাপ আর সোমবারের লেখা দেখাতে পারিনি।’
এ সব চিঠি পেয়ে স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা পড়ুয়াদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছেন, মা-বাবা নিজেদের কাজ নিয়ে ব্যস্ত তাই ছেলেকে স্কুলে পৌঁছে দিতে ‘পারেন না’। কোনও পড়ুয়া আবার লিখেছে, ‘মা-বাবা ঝগড়া করে স্কুলে পাঠায় না।’
জলপাইগুড়ির ফণীন্দ্রদেব ইন্সটিটিউশনের প্রাথমিক বিভাগের প্রধান শিক্ষক জাহিরুল ইসলাম বলেন, “ইদানিং ছাত্ররা বাড়ির পরিবেশ নিয়ে আমাদের অনেক কথা জানাচ্ছে। আমাদের যেটা ভাবাচ্ছে সেটা হল, ওরা কি বাড়িতে মনের কথা বলতে পারছে না, যদি বলেও তা হলে কি বাড়ির লোকেরা সে সবে গুরুত্ব দিচ্ছেন না?”
জলপাইগুড়ির হাইস্কুল লাগোয়া এই প্রাথমিক স্কুলের পড়ুয়াদের মনের কথা জানানোর বাক্সটির নাম ‘মন পিওনের ব্যাগ।’ সেই ব্যাগেই জমা পড়ে চিঠি। স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা ৮১৪। মূলত তৃতীয় এবং চতুর্থ শ্রেণির ছাত্ররাই চিঠি লেখে।
স্কুলের এক শিক্ষকের কথায়, “একটি ছেলে গান গাইতে ভালববাসে। তাকে বাড়িতে গান গাইতে দেওএয়া হচ্ছে না এর থেকে নির্মম কী হতে পারে।” তিন পড়ুয়ার অভিভাবককেই আলাদা করে ডাকতে চলেছেন স্কুল কর্তৃপক্ষ। সিদ্ধান্ত হয়েছে, এক মনস্তাত্বিক বিশেষজ্ঞের উপস্থিতিতে পড়ুয়ার অভিভাবকদের সঙ্গে আলাদা করে কথা বলবেন স্কুলের শিক্ষকেরা। এক পড়ুয়ার অভিভাবকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আগে তো পড়াশোনা করতে হবে। সারা দিন গান খেলা নিয়ে থাকলে পড়ার ক্ষতি হবে বলে কখনও বারণ করা হয়েছে।”
গত বুধবার স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সব অভিভাবকদের সার্বিক বৈঠক ছিল। প্রধান শিক্ষকের কথায়, “সেখানে কারও নাম করে কিছু বলা হয়নি, সবাইকে বলা হয়েছে বাচ্চাদের মনের ইচ্ছেকে অবহেলা না করতে। পড়াশোনার সঙ্গে গান-খেলাতেও উৎসাহ দিতে। এ বার নির্দিষ্ট ওই তিন পড়ুয়ার অভিভাবকদের ডেকে কথা বলা হবে এবং নজর রাখা হবে।”
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)