কখনও বিরাট ‘সংসারের’ বড় দিদির আন্তরিকতায়, কখনও রাজ্যের প্রশাসনিক প্রধানের ভূমিকায়। লন্ডনে ভারতীয় দূতাবাসের বক্তৃতায়ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজস্ব অভিজ্ঞান ছুঁয়ে গেলেন পরতে পরতে।
উদ্দেশ্য বিনিয়োগ আনা। মঙ্গলবার লন্ডনেই শিল্প সম্মেলন করবেন। ইন্ডিয়া হাউসে (দূতাবাসে) তার নান্দীমুখ করে রাখলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। সংক্ষিপ্ত বক্তৃতা। আন্তরিকতায় ভরপুর। মমতা সর্বদাই বাঁধাধরা আনুষ্ঠানিকতা থেকে বেরিয়ে ব্যক্তিগত ঊষ্ণতার উপর জোর দিয়ে থাকেন। লন্ডনের এই সন্ধ্যাও তার ব্যতিক্রম হল না। একাধারে মুখ্যমন্ত্রী, অন্য দিকে ‘দিদি’। বক্তৃতার পরে কথোপকথনে বলেন, ‘‘আমরা কি এখানে একটা বিশ্ব বাংলার বিপণি খুলতে পারি? তা হলে এখানে কলকাতার দই, সন্দেশও পাওয়া যাবে। বিশ্ব বাংলা হল বাংলার পরিচিতি।’’

(বাঁ দিক থেকে) শিল্পসচিব বন্দনা যাদব, মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ব্রিটেনের ভারতীয় হাই কমিশনার বিক্রম দোরইস্বামী এবং ডেপুটি হাই কমিশনার সুজিত ঘোষ। ছবি: ফেসবুক।
ইন্ডিয়া হাউসের গান্ধী হলে সোমবার সন্ধ্যায় (লন্ডনের স্থানীয় সময় অনুযায়ী) মমতার ডান পাশে ছিলেন মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ, শিল্পসচিব বন্দনা যাদব। অন্য পাশে ছিলেন লন্ডনে ভারতীয় হাই কমিশনার বিক্রম দোরইস্বামী এবং ডেপুটি হাই কমিশনার সুজিত ঘোষ। ভারতীয় হাই কমিশনের আমন্ত্রণেই মমতা সোমবারের অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন। সূচনা বক্তৃতায় বিক্রম বিশ্বমানচিত্রে ভারতের পরিচিতি, আধুনিক শিল্পকলায় ভারতের ভূমিকা প্রভৃতির সঙ্গে বাংলা এবং ব্রিটেনের সেতুবন্ধনে ফুটবলের অবতারণা করেন। মমতাও তাঁর বলার সময়ে বলেন, ‘‘বাংলায় ফুটবল আছে ঠিক কথা, তেমন প্রাক্তন ক্রিকেটার সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়কেও ভুললে চলবে না। তিনি অক্সফোর্ডের অনুষ্ঠানে আমার সঙ্গে যোগ দেবেন। ওঁর মেয়েও এখানে পড়ে। সৌরভ বাংলার ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর।’’

গান্ধীই আদর্শ। ছবি: ফেসবুক।
গান্ধী হলে মমতা যেখানে বসেছিলেন, তার প্রেক্ষাপটে ছিল মহত্মা গান্ধীর পূর্ণাবয়ব প্রতিকৃতি। বক্তৃতার শুরুতেই মুখ্যমন্ত্রী ভারতের সেই ভিতের কথা উল্লেখ করেন যা গান্ধীর ভারতদর্শন। মমতার কথায়, ‘‘বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যই আমাদের শিকড়। ভারতে অনেক রাজ্য রয়েছে। কোনওটা ধনী, কোনওটা গরিব, কোনওটা বড়, কোনওটা ছোট। কিন্তু আমাদের বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্য রয়েছে।’’
গত শনিবার সকালে কলকাতা থেকে লন্ডনের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল মুখ্যমন্ত্রীর। কিন্তু হিথরো বিমানবন্দরের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে শয়ে শয়ে উড়ান বাতিল হয়ে যায়। ফলে সন্ধ্যার বিমানে রওনা হতে হয় মুখ্যমন্ত্রীকে। দুবাই হয়ে রবিবার (লন্ডনের স্থানীয় সময় অনুযায়ী সকাল ৭টা নাগাদ) বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠা হিথরোয় নামে মমতার উড়ান। হাই কমিশনের অনুষ্ঠানে সেই প্রসঙ্গও তোলেন মমতা। অনুযোগের সুরেই বলেন, ‘‘হিথরোর ঘটনার জন্য আমাদের শিডিউলটাই হচপচ হয়ে গেল। আট ঘণ্টার সফরে সময় লাগল ১৮ ঘণ্টা।’’ সেই সূত্র ধরেই হাই কমিশনার বিক্রমের মাধ্যমে মমতা আর্জি জানালেন, ব্রিটিশ এয়ারওয়েজ় যেন সরাসরি কলকাতা থেকে লন্ডন উড়ান চালু করে। একটা সময়ে কলকাতা থেকে লন্ডন সরাসরি উড়ান চলত। মমতা সেই প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, ‘‘আমরা সরকারে আসার আগেই তা বন্ধ হয়ে গিয়েছে।’’ অক্সফোর্ডের পাশাপাশি তাঁর আমন্ত্রণ রয়েছে লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্স, কুইনস্ ইউনিভার্সিটি এবং ম্যাঞ্চেস্টার ইউনাইটেড ফুটবল ক্লাবে। হাই কমিশনের অনুষ্ঠানে মমতা বিনয়ের সঙ্গেই জানিয়েছেন, পরের বার লন্ডনে এলে তিনি বাকি তিন জায়গায় যাবেন। হাই কমিশনার বিক্রমকে নিজের আঁকা ছবি উপহার দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের হাতে নিজের আঁকা ছবি তুলে দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী। ছবি: ফেসবুক।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে নিউ টাউনে বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের আসর বসেছিল। সেখানে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ব্রিটেনের শিল্পমহলের প্রতিনিধিরাও হাজির ছিলেন। লন্ডনে তাঁদের সঙ্গেই বৈঠক করবেন মমতা। মঙ্গলবার লন্ডনের স্থানীয় সময় দুপুর ২টোয় (ভারতীয় সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায়) সেন্ট জেমস কোর্ট হোটেলে ১ নম্বর এডওয়ার্ডিয়ান হলে বসবে বৈঠক। বাকিংহাম প্যালেসের অদূরে এই হোটেলেই রয়েছেন মমতা।
আরও পড়ুন:
কলকাতা থেকে মমতার সঙ্গে একই উড়ানে এসেছিলেন শিল্পপতি সত্যম রায়চৌধুরী এবং উমেশ চৌধুরী। দুবাই থেকে যোগ দেন শিল্পপতি উজ্জ্বল সিন্হা এবং মেহুল মোহানকা। আলাদা ভাবে লন্ডনে পৌঁছেছেন শিল্পপতি হর্ষ নেওটিয়া, বিলায়্যান্সের প্রেসিডেন্ট তরুণ ঝুনঝুনওয়ালা, শিল্পপতি সিকে ধানুকা, সঞ্জয় বুধিয়া, রুদ্র চট্টোপাধ্যায়ও। শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েন্কা আইপিএলের ব্যস্ততার কারণে লন্ডনে আসতে পারেননি, জানান মমতা। সঞ্জীব লখনউ সুপার জায়েন্টসের মালিক। সোমবার লখনউয়ের ম্যাচ ছিল আইপিএলে। মাঠে ছিলেন সঞ্জীব। হাই কমিশনের অনুষ্ঠানে হর্ষ বলেন, ‘‘আমাদের পরিবার ১২০ বছর কলকাতার বাসিন্দা। গত ১০-১৫ বছরে বাংলার যা উন্নতি হয়েছে, অভাবনীয়! ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নতির জন্য সিনার্জি (শিল্প বিষয়ক সমন্বয় কমিটি) গঠিত হয়েছে।’’ এ বারের বিজিবিএস থেকে বিনিয়োগে প্রশাসনের প্রক্রিয়াগত জটিলতা কাটাতেও বড় সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছিলেন মমতা। ওই মঞ্চ থেকেই মমতা ঘোষণা করেন, রাজ্য স্তরে সমস্ত দফতরের সঙ্গে সমন্বয় রাখার জন্য মুখ্যসচিবের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হবে। যার পোশাকি নাম ‘স্টেট লেভেল ইন্ডাস্ট্রি সিনার্জি কমিটি’। শিল্পস্থাপনে একাধিক দফতরের ছাড়পত্র প্রয়োজন হয়। দমকল, পরিবেশ, ভূমিরাজস্ব, অর্থ, আবাসন, শিল্প— সংশ্লিষ্ট এই সব দফতরের সঙ্গে সমন্বয় রেখে এই কমিটি দেখবে বিনিয়োগের জন্য ছাড়পত্র দিতে যেন সময় না লাগে। কোথাও কোনও বাধা থাকলে তা দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করবে। গত মাসেই সেই কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
তৃতীয় মেয়াদে শিল্পায়ন এবং বিনিয়োগ টানা যে তাঁর মূল লক্ষ্য হবে, মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে ২০২১ সালের মে মাসে শপথ নিয়েই স্পষ্ট করেছিলেন মমতা। চলতি মেয়াদে সেই লক্ষ্যেই পদক্ষেপ করছেন তিনি। হাই কমিশনের অনুষ্ঠানে মমতা বলেন, ‘‘স্বাধীনতার আগে বাংলা ছিল অবিভক্ত ভারতের সাংস্কৃতিক রাজধানী। আজও কলকাতা দেশের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র। কিন্তু তা ছাড়াও বাংলা এখন কর্মসংস্থানের গন্তব্য।’’
সিলিকন ভ্যালির আদলে তৈরি নিউ টাউনের তথ্যপ্রযুক্তি তালুক, দক্ষতা প্রশিক্ষণে তৈরি আইটিআই, পলিটেকনিক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, মহিলা ক্ষমতায়ণ এবং বাংলার মেধার কথা উল্লেখ করেন মমতা। তাঁর কথায়, ‘‘বাংলায় মহিলাদের ক্ষমতায়ণকে স্বীকৃতি দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকারও।’’ ব্রিটেনের প্রতিনিধিদের পরিবার, শিশুদেরও অভিনন্দন জানালেন মমতা। এবং বললেন, ‘‘আপনাদের লড়াই আপনারা লড়বেন। আমাদের লড়াই আমরা। কিন্তু বন্ডিং (বোঝাপড়া) যেন থাকে।”