‘কৃষকদের মন জিততে বাজেটে একগুচ্ছ প্রকল্প অর্থমন্ত্রীর’ (২-২) শীর্ষক লেখাটি পড়লাম। কৃষকদের মন জয় না করলে কোনও দলই ভোটে জিততে পারে না। ফলে প্রতি বাজেটই ‘কৃষকের স্বার্থে’ প্রচার করে সরকার কৃষকদের মন জয় করার চেষ্টা করে। কৃষকদের এই মন জেতার কাজটিতে সাহায্য করে কিছু প্রচারমাধ্যম। কিন্তু আমরা জানি, প্রচার এবং বাস্তবের মধ্যে কতখানি ফারাক। সংবাদে প্রকাশ, বর্তমানে দেশে গড়ে প্রতি ১২ মিনিটে এক জন কৃষক আত্মহত্যা করেন। ‘কৃষক-মুখী’ বাজেট হলে কৃষকদের এই চরম পদক্ষেপ করতে হত না। অথচ, বছর পরের বছর দেখা যায়, কৃষকদের মৃত্যুর হার কিছুটা হলেও বেড়ে চলে, বহু চাষি পরিবার জমি-ভিটে বিক্রি করে শহরে বা ভিন রাজ্যে পাড়ি দেন।
ফাঁকা প্রতিশ্রুতির দ্বারা চাষিদের জীবনে উন্নতি হবে না। উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা, গুদামে ফসল রাখার, সেচের, ঋণের, বিদ্যুতের, উন্নত মানের বীজের ব্যবস্থা— এই কথাগুলি কি আজ নতুন? স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার এই কথাগুলোই তো বার বার বলে আসছে। তা সত্ত্বেও চাষিদের জীবনযাত্রায় আরও অবনতি হচ্ছে দিন দিন। সার-বীজ-বিদ্যুৎ-কীটনাশক ইত্যাদির দাম কি চাষি ঠিক করেন? তেমনই উৎপাদিত ফসলের দামও নির্ধারণ করতে পারেন কি চাষি? তা হলে চাষি টিকে থাকবেন কী করে? মাঝেমধ্যেই কৃষকদের তাঁদের উৎপাদিত ফসল জমি থেকে তুলে সেখানেই পচিয়ে ফেলতে দেখা যায়। আবার যে আনাজ বাজারে চড়া দামে ক্রেতা কিনতে বাধ্য হন, ফড়েদের কারণে তার সিকি দামও পান না চাষিরা। প্রসঙ্গত, আন্দোলনরত কৃষকদের অন্যতম দাবি ছিল ফসলের ন্যূনতম সহায়ক দামের আইনি স্বীকৃতি। বাজেটে সেই বিষয়টা সতর্ক ভাবে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
চাষি-দরদি সরকার থাকবে, আইন থাকবে, কৃষিমন্ত্রী থাকবেন, কৃষি দফতর থাকবে, টাস্ক ফোর্স থাকবে, এর জন্য সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচও হবে। কিন্তু চাষির জীবনে কোনও উন্নতি হবে না।
নিখিল কবিরাজ, শ্যামপুর, হাওড়া
সার্বিক উন্নতি
সম্পাদকীয় ‘অন্য দিকে দেখুন’ (৩-২) প্রসঙ্গে কিছু কথা। এ বার, অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন তাঁর বাজেট-ঘোষণার মাধ্যমে মধ্যবিত্ত শ্রেণির একটি বৃহৎ অংশকে কেবল খুশিই করেননি, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও আশার সঞ্চার করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হল, এই পদক্ষেপ কি সত্যিই প্রত্যাশা অনুযায়ী খরচ বাড়াবে? কর অব্যাহতির এই সিদ্ধান্তটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে এর সময়ের কারণে। অতিমারি সম্পর্কিত বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পর ঋণ-নেতৃত্বাধীন ভোগ বৃদ্ধির চক্র যখন শেষ হতে চলেছে, এটি তখন ঘোষিত হল।
এই পরিস্থিতিতে, খরচ বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় দ্বিতীয় ধাক্কা এই পদক্ষেপের মাধ্যমে প্রদান করা যেতে পারে। যদিও বাস্তব চিত্রটি হল, সকল প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, প্রকৃত আয় এখনও অতিমারি পূর্ববর্তী স্তরে পৌঁছয়নি। এই বাজেটেও মানবকল্যাণ ও পরিকাঠামো খাতে বরাদ্দ গত বছরের মতোই রাখা হয়েছে। স্পষ্টতই, প্রকৃত আয় বৃদ্ধি এবং ভোগের প্রত্যাশা বেশি রাখা যাবে না। ভারতে আয়কর রিটার্ন দাখিলকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে দশ কোটি, যার মধ্যে মাত্র তিন কোটি মানুষ মূলত কর প্রদান করেন। সর্বশেষ শিথিলকরণের পর, এই সংখ্যা আরও কমবে। আয়করদাতাদের সংখ্যা হ্রাসের অর্থ সরাসরি জিএসটির উপর চাপ বৃদ্ধি। এর মানে হল, জিএসটি হার হ্রাস করা কঠিন হবে এবং জনসংখ্যার তুলনামূলক ভাবে দরিদ্র অংশ কোনও স্বস্তি পাবে না। মনে রাখতে হবে, জনসংখ্যার এই অংশকে যে ত্রাণ দেওয়া হয়েছে তা ভোগবৃদ্ধিতে আরও বেশি অবদান রাখে। এই সিদ্ধান্তের ফলে করদাতার সংখ্যা হ্রাস পাওয়ায় সরকারের ব্যয় ক্ষমতার উপর প্রভাব পড়বে। যে-হেতু সাম্প্রতিক বছরগুলিতে সরকারি রাজস্বে প্রত্যক্ষ করের অংশ বৃদ্ধির কারণেও রাজস্ব শক্তি বৃদ্ধি পেয়েছে, তাই স্বাভাবিক ভাবেই এই দিকটি মনে রাখা প্রয়োজন হবে। সামগ্রিক ভাবে, কর অব্যাহতি নিশ্চিত ভাবেই একটি ভাল পদক্ষেপ, তবে এর থেকে সর্বাধিক সুবিধা নিশ্চিত করার জন্য প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি এবং স্থবির মজুরির কারণে মধ্যবিত্ত শ্রেণি বছরের পর বছর ধরে নিপীড়িত এবং আর্থিক ভাবে চাপের মধ্যে ছিল। বিনিয়োগ-নেতৃত্বাধীন প্রবৃদ্ধির কৌশল অনুসরণ করে, সরকার ভোগ-নেতৃত্বাধীন প্রবৃদ্ধির দিকে নীতিগত পরিবর্তন এনেছে বলে মনে হচ্ছে। অর্থনীতিতে ধীরগতির প্রবৃদ্ধির পিছনে মন্থর উপভোক্তা চাহিদা একটি প্রধান কারণ ছিল। তবে, টেকসই আয় বৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, একটি সম্প্রসারিত কর ভিত্তি এবং একটি বিস্তৃত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা মধ্যবিত্ত শ্রেণির আর্থিক অবস্থার উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় পূর্বশর্ত। আয়কর ছাড়ের ফলে ব্যয়যোগ্য আয় বৃদ্ধি পাবে এবং প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের উপর বহুমুখী প্রভাব পড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে, এর মূল্য নির্ভর করবে অতিরিক্ত আয়ের কতটা অংশ আসলে ভোগ্যপণ্য, আবাসন ইত্যাদিতে ব্যয় করা হচ্ছে, তার উপর। এটি অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনার প্রতি উপভোক্তাদের আস্থার উপরও নির্ভর করে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যা এখনও সমাধান করা হয়নি তা হল স্ট্যান্ডার্ড ডিডাকশনের পরে ১২ লক্ষ থেকে ১২.৭৫ লক্ষ টাকা আয়কারী ব্যক্তিদের উপর করের বোঝা। ১২ লক্ষ টাকা আয়কারী কোনও কর দেন না, কিন্তু ১২.০১ লক্ষ টাকা আয় করলে ৬০,১৫০ টাকা কর দিতে হয়। করের এই তীব্র বৃদ্ধি অন্যায্য বলে মনে হয়, বিশেষ করে যখন লক্ষ্য হল প্রতিটি নাগরিককে ব্যয়ের জন্য ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত রাখতে সাহায্য করা। আয়ের উৎসের জন্য অভিন্ন কর ব্যবস্থা থাকা উচিত।
অভিজিৎ রায়, জামশেদপুর
নজরদারি চাই
অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে এত দিন মোদী সরকার পরিকাঠামোয় বিপুল খরচের নীতি নিয়ে চলছিল। কিন্তু সরকারের তৃতীয় দফার শুরু থেকেই অর্থনীতির হালের উদ্বেগ স্পষ্ট হয়েছে অর্থনৈতিক বিভিন্ন সমীক্ষাতে। এ বার মোদী সরকার আয়করে ছাড় দিয়ে মধ্যবিত্ত মানুষের হাতে বাড়তি নগদ টাকা তুলে দেওয়ার পথ নিল।
এমনিতেই পরিসংখ্যানে ধরা পড়েছিল যে, গ্রাম ও শহর— উভয় অঞ্চলেই মানুষের ভোগবাবদ খরচে মন্দা দেখা দিয়েছিল। ফলে টান পড়ে বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির বিক্রিবাটায়। তাই মোদী সরকারের সিদ্ধান্ত, মধ্যবিত্তের সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত পরিবারের হাতে কর ছাড়ের মধ্য দিয়ে কিছু অতিরিক্ত অর্থ তুলে দেওয়া। তাঁদের তত্ত্বটি হল, এই অতিরিক্ত অর্থ মধ্যবিত্ত জিনিসপত্র কেনাকাটার জন্য খরচ করবে। ফলে, বাড়বে চাহিদা, বিনিয়োগ এবং সর্বোপরি কর্মসংস্থান।
নতুন প্রস্তাবিত কর-কাঠামোয়, বার্ষিক ১২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত যাঁদের আয় (চাকরিজীবীদের ক্ষেত্রে তা ১২ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা) তাঁদের আর কোনও আয়কর দিতে হবে না। তবে, এক শ্রেণির সংবাদমাধ্যম এবং রাজনৈতিক দল আয়করের এই ছাড়কে ‘এক লাখি বেতনকে ছাড়’ বলে কটাক্ষ করেছে। এত দিন যে কোনও স্তরের নির্দিষ্ট বেতনভোগী কর্মচারীদের থেকেই আয়কর আদায়ে কড়াকড়ি ছিল। ‘রাঘব বোয়াল’-দের দিকে নজর না দিয়ে, সামান্য ‘দশ-বিশ’ টাকা কম আয়কর দেওয়া নিয়ে নজরদারি চালাতেই এত কাল বিপুল অর্থ ও সময় ব্যয় করে এসেছে আয়কর দফতর। অথচ, ব্যবসায়ী এবং অন্য বিভিন্ন স্তরের রাঘব বোয়াল ও চোরাকারবারিরা বিপুল পরিমাণ আয় করলেও যে নানা কায়দায় এত কাল আয়কর ফাঁকি দিয়ে এসেছে, তার প্রচুর প্রমাণ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রেই যা হয়েছে আয়কর দফতরের সঙ্গে যোগসাজশে। নির্দিষ্ট বেতনভোগী না হয়েও যাঁরা কর ফাঁকি দেন, সে দিকে আয়কর দফতরের কঠোর নজরদারি করা জরুরি।
নিকুঞ্জ বিহারী ঘোড়াই, কলকাতা-৯৯
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)