—প্রতীকী ছবি।
পশ্চিমবঙ্গে কোনও দল ভোট পায় কিসের জোরে, ব্যক্তি না সংগঠন? বাম আমলে সংগঠনের জোরে প্রতিটি মানুষের সঙ্গে যে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তার প্রতিলিপি একমাত্র কোনও ক্যাডারভিত্তিক রাজনৈতিক দলই নিখুঁত ভাবে গড়ে তুলতে পারে। এই সম্পর্কের সুবাদে নিবিড় দেনাপাওনা-নির্ভর সম্পর্ক স্থাপিত হতে পারে, যাকে বলা হয় পেট্রন-ক্লায়েন্ট রিলেশন। বাম আমলে সেটা হয়েছিল। পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘ দিন ধরেই ক্লায়েন্টেলিজ়ম বা দেওয়া-নেওয়ার রাজনীতি প্রাধান্য পেয়েছে। হাসপাতাল থেকে শ্মশানঘাট, রাজনৈতিক আনুগত্য থাকলে সর্বত্রই বাড়তি সুবিধা পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
দেওয়া-নেওয়ার সম্পর্ক যদি পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে, অধুনা তৃণমূল সরকারের দরাজ ভাতা দান তা হলে কি ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলেছে ব্যাপক ভাবে? সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন ওঠে, কেন্দ্রীয় সরকারের যে সকল প্রকল্প, তার সুফল বিজেপি কি পেল না? মনে রাখা প্রয়োজন যে, দেনা-পাওনার রাজনীতিকে সঠিক ভাবে চালনা করতে দরকার সর্ব স্তরের সুদৃঢ় সংগঠন। কোনটা দিদি দিচ্ছেন আর কোনটা মোদী দিচ্ছেন, সেটা বোঝাবে তো সংগঠন। প্রচার হোক আর অপপ্রচার হোক, মানুষ সারা বছর যে নেতৃত্বকে কাছে পান, যাঁর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধেন, তাঁদেরই বিশ্বাস করেন বইকি!
সুযোগসুবিধার অভাবে শহরের তুলনায় গ্রামের মানুষ আরও বেশি নির্ভরশীল রাজনৈতিক নেতাদের উপরে। শহর ও শহরতলির গল্প একটু আলাদা। হাজার ঢেউয়ের মাঝে, হাজার মতাদর্শের মাঝে, হাজার বৈচিত্রের কেন্দ্রে, শহরের মানুষ এক জটিল জীবনযাপনে অভ্যস্ত হয়েছেন। সাধারণ পরিষেবায় যেমন সরকার নির্ভরতা, কাজকর্মে তেমনই বিপুল ভাবে বেসরকারি নির্ভরতা শহরের মানুষকে ভোটের ময়দানে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার ঘূর্ণিতে এনে হাজির করেছে। খালি ভাতা দিয়ে মন জয়ের চেষ্টা তাই অনেকাংশে সফল হয় না। সরকারের অর্থাভাবে পরিকাঠামাগত বিনিয়োগ যত কমেছে, বিপুলসংখ্যক মধ্যবিত্ত (যাঁরা অনেকেই কোনও ভাতার আওতায় আসেন না) সরকারবিমুখ হচ্ছেন। শহরে তো চাষবাস হয় না যে, বেকার ছেলেকে সেখানে লাগিয়ে দেওয়া যাবে। বেকারত্ব থেকে অপরাধমূলক কার্যকলাপ বেড়েছে। আর তার প্রভাব পড়ছে শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের উপরে। রাস্তা-জল-নিকাশি-পরিবহণ পরিষেবার চাহিদা যত বাড়ছে, সরকারের সঙ্গে দূরত্ব তত বাড়ছে। ভাতার টানে সরকার যতই নিম্নবিত্ত মানুষের স্বার্থে অর্থ বরাদ্দ করে, এক শ্রেণির শহুরে মানুষ ততই বিমুখ হন। এই পরস্পরবিরোধী ভাবনার মধ্যে একটা সাযুজ্য আনা বড় কঠিন কাজ। পাশাপাশি সমাজমাধ্যমের অপপ্রচারের কথাও মনে রাখা ভাল। এখনও শহরাঞ্চলেই সমাজমাধ্যমের ব্যবহার বেশি, ফলে তার অপপ্রচার বেশি বিভ্রান্তি তৈরি করেছে এখানেই।
প্রশ্ন উঠবে যে, মহাসমারোহে যে রামমন্দির প্রতিষ্ঠা হল, যে হিন্দুত্ব নিয়ে এত চর্চা হল, তার কোনও প্রভাব কি ভোটবাক্সে পড়ল না? ধর্ম বা মতাদর্শভিত্তিক রাজনীতি— যা আইডেন্টিটি পলিটিক্স নামে বেশি পরিচিত— পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির ইতিহাসে এক নতুন সংযোজন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে এর কিছুটা প্রচার ও প্রসার হয়েছে বলে আন্দাজ করা যায়। কিন্তু মতাদর্শভিত্তিক রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের দেনাপাওনার রাজনীতির চালচিত্রে কতটা দাগ কাটতে পারবে, এবং কতটা সাহায্য করবে, এটাই হল মুখ্য প্রশ্ন। ভোটের প্রচারে টিভির পর্দায় নেতা-নেত্রীদের মন্দির দর্শন ও ব্যাপক ধর্মের উপমা টানার মধ্যে এটা স্পষ্ট যে, ধর্মীয় ভাবাবেগের একটা স্রোত ভোটারদের মনে প্রবেশ করেছে। তবে এই স্ফুলিঙ্গ দাবানলের মতো ছড়াতে পারত যদি সুদৃঢ় সাংগঠনিক ক্ষেত্র প্রস্তুত থাকত। উত্তরবঙ্গে বিজেপির বিজয়রথ মালদহ সীমান্তে কেন থেমে গেল? গত নির্বাচনে উত্তরবঙ্গে যে চমকপ্রদ ফল হয়েছিল, তাতে অনেকে মনে করেছিলেন যে, ‘আগে রাম পরে বাম’ এই হাওয়া তুলে বামপন্থী ভোট বিজেপির পালে হাওয়া জুগিয়েছে। এখানেও সংগঠনের গুরুত্বের কথা ভুললে চলবে না— উত্তরবঙ্গে দীর্ঘ দিন ধরে বিজেপি যে ভাবে সংগঠনকে মজবুত করেছে, তাতে ভোটারের মনে তারা গ্রহণযোগ্য বিকল্প হয়ে উঠতে পেরেছে।
আর্থসামাজিক রাজনৈতিক চর্চার ভাষায় বলতে হয়, মতাদর্শগত রাজনীতির সঙ্গে সংগঠন দেনাপাওনার রাজনীতিকে এক সূত্রে বেঁধে রেখেছে। উত্তরবঙ্গ তুলনামূলক ভাবে অনুন্নত হওয়ার কারণে ভাতা নির্ভরশীলতা বেশি প্রকট হওয়া যেমন স্বাভাবিক, সে রকম সীমিত উন্মুক্ত মানবমনে মতাদর্শ প্রকট রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারও সম্ভব। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের সীমানা লাগোয়া জেলাগুলিতে হিন্দুদের সঙ্ঘবদ্ধ হওয়ার আহ্বানও ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলেছে। মোটের উপরে এ বারের লোকসভা নির্বাচন গ্রাম-শহরের রাজনৈতিক মানচিত্র যেমন কিছুটা হলেও পাল্টে দিয়েছে, উত্তরবঙ্গ-দক্ষিণবঙ্গের নির্বাচনী ফলাফলের যেমন ভিন্ন প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছে, সে রকম বৃহৎ পরিসরে মতাদর্শ-ভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে দেনাপাওনা-ভিত্তিক রাজনীতির এক মেলবন্ধন আবার এক সংঘাতের সাক্ষী থেকে গেল।
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy
We will send you a One Time Password on this mobile number or email id
Or Continue with
By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy