সব ঠিক থাকলে তিনিই পেশ করতেন রাজনৈতিক খসড়া প্রতিবেদন। কিন্তু সব ঠিক নেই। তিনি প্রয়াত হয়েছেন। সেই সীতারাম ইয়েচুরির নামেই মাদুরাই শহরের নামকরণ করেছে সিপিএম। সেই সীতানগরেই সীতাহীন সিপিএমের পার্টি কংগ্রেস শুরু হচ্ছে বুধবার। চলবে আগামী রবিবার পর্যন্ত। যে পার্টি কংগ্রেস সিপিএমের পলিটব্যুরো এবং কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রজন্মের বদল ঘটাবে। যা করতে গিয়ে নেতৃত্বের সঙ্কটও অনুভব করছে সিপিএম। যে সঙ্কট কাটাতে লিখিত নিয়মের বাইরে গিয়ে কয়েকটি ক্ষেত্রে ‘ব্যতিক্রমী’ সিদ্ধান্ত নিতে পারেন প্রকাশ কারাটেরা।
দলের প্রতিটি কমিটি স্তরেই বয়সের ঊর্ধ্বসীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে সিপিএম। সেই সূচকে বর্তমান পলিটব্যুরো থেকে সাত নেতা-নেত্রীর বাদ পড়ার কথা। তালিকায় রয়েছেন প্রকাশ এবং বৃন্দা কারাট, সুভাষিণী আলি, ত্রিপুরার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার, কেরলের মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন, তামিলনাড়ুর নেতা জি রামকৃষ্ণন এবং বাংলার সূর্যকান্ত মিশ্র। কিন্তু এই বদল পুরোপুরি বাস্তবায়িত করা সম্ভব কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে সিপিএমের অন্দরে।
গত পার্টি কংগ্রেসেই বিজয়ন বয়সের ঊর্ধ্বসীমা পার করে গিয়েছিলেন। কিন্তু একমাত্র বামশাসিত রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসাবে তাঁর জন্য ‘ব্যতিক্রমী’ সিলমোহর দিয়ে তাঁকে কেন্দ্রীয় কমিটি এবং পলিটব্যুরোয় রেখে দেওয়া হয়েছিল। কেন্দ্রীয় কমিটিতে বয়সের ঊর্ধ্বসীমা ৭৫ বছর। রাজ্য কমিটিতে ৭২। ইতিমধ্যেই কেরল রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীতে রাখা হয়েছে বিজয়নকে। যেমন মানিককে রাখা হয়েছে ত্রিপুরা রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীতে। ফলে এই দুই নেতাকে কেন্দ্রীয় কমিটি ও পলিটব্যুরোয় আবার রেখে দেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে কৌতূহল রয়েছে। প্রসঙ্গত, কেরলে আগামী বছর বিধানসভা ভোট।
সামগ্রিক ভাবে এই বিষয়গুলিকেই ‘নেতৃত্বের সঙ্কট’ হিসাবে বর্ণনা করছেন দলের অনেকে।
আরও পড়ুন:
পরবর্তী সাধারণ সম্পাদক কে হবেন, তা নিয়েও জল্পনা তৈরি করেছে পার্টি কংগ্রেসের শেষে অনুষ্ঠিতব্য প্রকাশ্য সমাবেশের বক্তাতালিকা। যেখানে নাম রয়েছে বিদায়ী পলিটব্যুরোর চার সদস্যের। প্রকাশ, বৃন্দা, বিজয়ন এবং তামিলনাড়ুর রামকৃষ্ণনের। এ ছাড়াও মহিলা নেত্রী ইউ বাসুকির নাম রয়েছে সেই তালিকায়। সভাপতিত্ব করবেন তামিলনাড়ু সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক পি ষন্মুগম। এই তালিকা নিয়েই কৌতূহল এবং জল্পনা। কারণ, এ নিয়ে বিশেষ সন্দেহ নেই যে, সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক যিনি হবেন, তিনি পার্টি কংগ্রেসের প্রকাশ্য সমাবেশে বক্তৃতা করবেনই। সিপিএমে কৌতূহল, তার মানে কি ওই চার জনের মধ্য থেকেই কাউকে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন শীর্ষ নেতৃত্ব? কিন্তু বয়সবিধিতে আবার ওই চার জনেরই বাদ পড়ার কথা।
আনুষ্ঠানিক ভাবে পার্টি কংগ্রেসের প্রতিনিধিরা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করেন। বিজয়ন কেরলের মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর দলীয় দায়িত্ব নেওয়ার সুযোগ নেই বললেই চলে। তা হলে কি প্রকাশকেই আবার দায়িত্ব দেবে সিপিএম? সিপিএমের একটি অংশ যেমন বিষয়টিকে উড়িয়ে দিচ্ছেন না, তেমনই অনেকের বক্তব্য, মহিলা হিসাবে বৃন্দাকে দায়িত্ব দিতে পারে দল। কিন্তু এই চার জনের মধ্যে যাঁকেই সিপিএম দায়িত্ব দিক, তাতে সিপিএমকে বয়সবিধি ভেঙে ‘ব্যতিক্রমী’ সিদ্ধান্তেই সিলমোহর দিতে হবে। যেমন বিজয়নকে কেরলে এবং প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তথা পলিটব্যুরোর সদস্য মানিককে ত্রিপুরার রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীতে রেখে ‘ব্যতিক্রম’ ঘটিয়ে ফেলেছে সিপিএম।
আবার অনেকের বক্তব্য, নতুন কাউকেও দায়িত্ব দিতে পারে দল। সে ক্ষেত্রে নতুন সাধারণ সম্পাদকের নাম বক্তার তালিকায় যুক্ত হয়ে যাবে। সীতারামের মৃত্যুর পরে কারাটেরা চেয়েছিলেন বাংলার রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম সর্বভারতীয় দলের ‘অন্তর্বর্তী দায়িত্ব’ নিন। কিন্তু সেলিম রাজি হননি। তার ফলে কারাটকে ‘সমন্বয়ক’ (কো অর্ডিনেটর) করেছিল সিপিএম। তবে সেলিমের উপর থেকে সেই ‘চাপ’ যে পুরোপুরি সরে গিয়েছে, তা নয়। কারণ, দিল্লির নেতৃত্বের অনেকেই মনে করেন, বিভিন্ন ভাষায় সেলিমের অনর্গল বক্তৃতা করার যে ‘দক্ষতা’ রয়েছে, তা দলের অন্দরে বিরল। দক্ষিণী নেতাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হিন্দি ভাষা নিয়ে। মধ্যবর্তী সময়ে এমএ বেবিকে নিয়েও আলোচনা চলেছে সিপিএমের অন্দরে। কিন্তু বেবি যে রাজ্য থেকে উঠে এসেছেন, সেই কেরলের বড় অংশই তাঁর নামে এখনও সায় দিচ্ছেন না বলে খবর।