লোকসভা এবং রাজ্যসভায় ওয়াকফ (সংশোধনী) বিলের বিরুদ্ধে একযোগে ভোট দেবেন বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র সাংসদেরা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় জোটের বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত হয়েছে। বৈঠকের পরে কেরলের আরএসপি সাংসদ এনকে প্রেমচন্দ্রন বলেন, ‘‘ঐকমত্যের ভিত্তিতে আমরা ওয়াকফ বিলের বিরুদ্ধে ভোটদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’’ কংগ্রেস সাংসদ কেসি বেণুগোপাল বলেন, ‘‘সর্বসম্মত ভাবে সিদ্ধান্ত হয়েছে, ‘ইন্ডিয়া’র সাংসদেরা সমমনোভাবাপন্ দলগুলিকে সঙ্গে নিয়ে ঐক্যবদ্ধ ভাবে বিলের বিরোধিতা করবে।’’
আগামী বুধবার (২ এপ্রিল) লোকসভায় পেশ হতে চলেছে ওয়াকফ (সংশোধনী) বিল ২০২৫। রাজ্যসভায় পেশ হবে বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল)। ওই দু’দিন সংশ্লিষ্ট দুই কক্ষের দলের সব সাংসদকে হাজির থাকার জন্য মঙ্গলবার দুপুরে বিজেপি সংসদীয় দলের তরফে হুইপ জারি করা হয়েছে। যা দেখে মনে করা হচ্ছে, যে কোনও ভাবে নতুন বিল পাশ করাতে সক্রিয় হবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকার। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে কংগ্রেস সংসদীয় দলের তরফে বুধবার লোকসভার সাংসদদের অধিবেশনে যোগ দেওয়ায় বিষয়ে হুইপ পাঠানো হয়েছে। এনসিপি (শরদ পওয়ার) সাংসদ সুপ্রিয়া সুলেও জানিয়েছেন, তাঁর সকলে লোকসভায় হাজির হয়ে একযোগে বিলের বিরুদ্ধে বিতর্ক ও ভোটাভুটিতে অংশ নেবেন।
বিরোধীদের প্রবল আপত্তি ও হট্টগোলের মধ্যে গত ৮ অগস্ট লোকসভায় ওয়াকফ সংশোধনী বিল পেশ করেছিলেন কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। বিলটি ‘অসাংবিধানিক এবং মুসলিমদের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপকারী’ বলে অভিযোগ তুলে বিরোধীরা একযোগে তা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন। কংগ্রেস, তৃণমূল-সহ বিরোধীদের অভিযোগ, ৪৪টি সংশোধনী এনে ওয়াকফ বোর্ডের উপর সরকারি কর্তৃত্ব নিরঙ্কুশ করতে চাইছে নরেন্দ্র মোদী সরকার। দীর্ঘ বিতর্কের শেষে ঐকমত্যের লক্ষ্যে বিলটি জেপিসির কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছিল কেন্দ্র।
বিজেপি সাংসদ জগদম্বিকা পালের নেতৃত্বাধীন ৩১ সদস্যের জেপিসি বিরোধীদের আপত্তি উপেক্ষা করেই কার্যত একতরফা ভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে গত ৩০ ডিসেম্বর ১৪টি সংশোধনী-সহ বিলটি সংসদে পেশ করার জন্য সরকারের কাছে জেপিসি সুপারিশ করে। সরকার পক্ষের তরফে ২৩ এবং বিরোধীদের তরফে ৪৪টি সংশোধনী প্রস্তাব কমিটিতে জমা পড়েছিল সরকার পক্ষের সাংসদদের আনা ১৪টি সংশোধনী গৃহীত হলেও বিরোধীদের সবক’টি সংশোধনী প্রস্তাবই জেপিসিতে খারিজ হয়ে যায়।
বিজেপি নেতৃত্বাধীন জোট এনডিএর দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বৃহত্তম দল টিডিপি এবং জেডি(ইউ) বিলের বিষয়ে কী অবস্থান নেবে তা এখনও স্পষ্ট নয়। টিডিপি প্রধান তথা অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডু মুসলিমদের পাশে দাঁড়িয়ে ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষার ডাক দিয়েছেন গত সপ্তাহেই। অন্য দিকে, বিহারের মুখ্যমন্ত্রী তথা জেডিইউ সভাপতি নীতীশ কুমারের ঘনিষ্ঠ নেতা তথা সে রাজ্যের বিধান পরিষদের সদস্য গুলাম ঘাউস মঙ্গলবার সরাসরি নতুন ওয়াকফ বিলকে ‘মুসলিম বিরোধী’ বলে চিহ্নিত করে তা প্রত্যাহারের দাবি তুলেছেন। এই আবহে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা জেডিইউ নেতা লল্লন সিংহ মঙ্গলবার বলছেন, ‘‘ওয়াকফ বিল নিয়ে আমাদের দলের অবস্থান কী হবে, বিলের খসড়া পর্যালোচনার পরে সে বিষয়ে নেতৃত্ব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন।’’ সংসদীয় পাটিগণিতের হিসেব বলছে, টিডিপি এবং জেডিইউর সমর্থন না পেলে লোকসভায় বিল পাশ করাতে বিপাকে পড়তে পারে মোদী সরকার। শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবার রাতে টিডিপি এবং জেডিইউ সংসদীয় দল ওয়াকফ বিল সমর্থনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আরও পড়ুন:
তবে অনেকে মনে করছেন, রাজ্য রাজনীতি তথা সংখ্যালঘু ভোট ধরে রাখার স্বার্থে শরিকেরা নিজেদের রাজনীতি করলেও শেষ পর্যন্ত বিলের বিরোধিতার ঝুঁকি নেবে না। উত্তেজনার এই আবহেই ওয়াকফ বিল নিয়ে বুধবার লোকসভায় অশান্তি ছড়াতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সংসদের দুই কক্ষে পাশ হওয়ার পরে ওই বিলে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন মিললে ১৯৯৫ সালের ওয়াকফ আইনের নতুন নাম হবে ‘ইউনিফায়েড ওয়াকফ ম্যানেজমেন্ট, এমপাওয়ারমেন্ট, এফিশিয়েন্সি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অ্যাক্ট’। কিন্তু বিল পাশ করাতে গিয়ে মোদী সরকারকে সংসদের দুই কক্ষেই বিরোধীদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মুখে পড়তে হতে পারে।
প্রসঙ্গত, বর্তমান ওয়াকফ আইনের ৪০ নম্বর ধারা অনুযায়ী, যে কোনও সম্পত্তিকে ওয়াকফ হিসাবে ঘোষণার অধিকার এত দিন ছিল ওয়াকফ বোর্ডের হাতেই। ফলে ওয়াকফ বোর্ডের বিরুদ্ধে বার বার বহু গরিব মুসলিমের সম্পত্তি, অন্য ধর্মাবলম্বীদের ব্যক্তির সম্পত্তি অধিগ্রহণের অভিযোগ উঠেছে। নতুন সংশোধনীতে ওয়াকফ বোর্ডের সেই একচ্ছত্র অধিকার কেড়ে নিয়ে কোনও সম্পত্তি ওয়াকফ কি না, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হবে জেলাশাসক বা সমপদমর্যাদার কোনও আধিকারিকের হাতে। সরকারের যুক্তি, বর্তমানে যে আইন রয়েছে, তাতে ওয়াকফের দখল করা জমি বা সম্পত্তিতে কোনও ভাবেই পর্যালোচনা করার সুযোগ থাকে না। কারও আপত্তি সত্ত্বেও জমি বা সম্পত্তি দখল করতে পারে ওয়াকফ বোর্ড। তাতে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ থাকে না সরকারের। নতুন বিলে তার বন্দোবস্ত রয়েছে।
এর পাশাপাশি আপত্তি উঠেছে নতুন বিলে ওয়াকফ বোর্ডে দুই অমুসলিম সদস্যের অন্তর্ভুক্তির বন্দোবস্ত নিয়েও। এ ছাড়া রয়েছে, একটি কেন্দ্রীয় পোর্টালের মাধ্যমে ওয়াকফ সম্পত্তির নথিভুক্তিকরণ নিয়ন্ত্রণ করার প্রস্তাব। প্রসঙ্গত, ১৯৫৪ সালে প্রথম ওয়াকফ আইন পাশ হয়েছিল। ১৯৯৫ সালে ওয়াকফ আইনে সংশোধনী এনে ওয়াকফ বোর্ডের ক্ষমতা বাড়ানো হয়েছিল। তার পর থেকেই বিজেপির তরফে বার বার প্রশ্ন তোলা হয়েছে ‘বোর্ডের একচ্ছত্র অধিকার’ নিয়ে। বিজেপির দাবি, ওয়াকফ সম্পত্তির সমস্ত সুবিধা ভোগ করছে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী। বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মুসলিমরা। নতুন আইন কার্যকর হলে সাধারণ মুসলিমরা উপকৃত হবেন।