বিরোধী রাজনীতির অন্যতম প্রধান দায়িত্ব, সরকারকে সর্বদা প্রশ্নের সম্মুখীন করা। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতির চালকরা সেই দায়িত্ব যথাযথ ভাবে পালন করেছেন কি? বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের বিষয়ে তাঁরা সরকারকে প্রশ্ন করেছেন। লগ্নি প্রস্তাব ঘোষণার আড়ম্বর এবং বাস্তব বিনিয়োগের সামঞ্জস্য কতটুকু, তাঁদের গভীর সংশয় তা নিয়েই। সামঞ্জস্যের প্রসঙ্গ তুচ্ছ নয়। এ বছরের বাণিজ্য সম্মেলন ছিল অষ্টম। এর আগের সাতটি সম্মেলনে মোট যত লগ্নি প্রস্তাব এসেছে, তার কত শতাংশ বাস্তবায়িত হয়েছে, এই প্রশ্নটি অবশ্যই করা প্রয়োজন, বিশেষত কেন্দ্রীয় শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রকের দেওয়া পরিসংখ্যানের নিরিখে। সেই পরিসংখ্যান অনুসারে, ২০২৪-এর জানুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে এ রাজ্যে যত শিল্পপ্রস্তাব আসে, বাস্তবায়িত হয়েছে তার মাত্র দশ শতাংশ। অনুপাতটি অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় কম। বাণিজ্য সম্মেলনের লগ্নি প্রস্তাব ও তার বাস্তবায়নের সঙ্গে এই পরিসংখ্যানের সরাসরি তুলনা চলে না বটে, কিন্তু প্রবণতাটি অনস্বীকার্য। সুতরাং, এ রাজ্যে কোন শিল্প প্রস্তাবের কত শতাংশ বাস্তবায়িত হল, কোন প্রকল্প এখন কোন স্তরে আছে, সেই সব বিষয়ে বিশদ তথ্য জানার অধিকার রাজ্যবাসীর আছে, এবং সেই অধিকার পূরণ করা রাজ্য সরকারের বিশেষ কর্তব্য।
কিন্তু রাজ্যের বিরোধী দলনেতারা যে ভাবে ও ভঙ্গিতে কার্যত বিশ্ব বঙ্গ বাণিজ্য সম্মেলনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন করেছেন, তার মধ্যে দৃশ্যত রাজনৈতিক ক্ষুদ্র স্বার্থেরই প্রাবল্য, রাজ্যের স্বার্থরক্ষার প্রকৃত সদিচ্ছা তুলনায় ক্ষীণ। প্রথমত, এই গোত্রের বাণিজ্য সম্মেলনে মোট যত লগ্নি প্রস্তাব আসে, বাস্তবায়ন হয় তার একটি অংশমাত্র। পশ্চিমবঙ্গে যেমন, ঝাড়খণ্ডে যেমন, গুজরাতেও তেমনই। বিরোধী নেতারাও কথাটি বিলক্ষণ জানেন। সুতরাং, এই বিষয়ে শ্বেতপত্রের দাবিটি নেহাতই রাজনৈতিক নয় কি? গভীরতর প্রশ্নটি রাজ্যের স্বার্থের প্রতি তাঁদের মনোভাব নিয়ে। শুধুমাত্র ভারত নয়, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে লগ্নিকারীরা যখন পশ্চিমবঙ্গে উপস্থিত, তখন দলনির্বিশেষে এই উদ্যোগ সম্পর্কে ইতিবাচক অবস্থান গ্রহণই কর্তব্য। তাতে এই বার্তাটি শিল্পমহলের কাছে পৌঁছবে যে, এ রাজ্যে বিনিয়োগ করলে রাজনৈতিক সহযোগিতার অভাব ঘটবে না। পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী রাজনীতিকদের কথা ও ভাবভঙ্গি তার বিপরীত ধারণা সৃষ্টি করতে পারে। এই বাস্তব দুর্ভাগ্যজনক।
সম্মেলনে মোট লগ্নি প্রস্তাব এসেছে ৪.৪ লক্ষ কোটি টাকারও বেশি। প্রথম সারির বেশ কয়েকটি শিল্পগোষ্ঠী ও সংস্থা সেই সব প্রস্তাবে শামিল। সেগুলি ষোলো আনা বাস্তবায়িত না হলেও রাজ্যবাসীর আশাবাদী হওয়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সম্পর্কে শিল্পবাণিজ্যের পরিচালকদের যে সদর্থক মনোভাব এই সব প্রস্তাবে প্রতিফলিত হয়েছে, তার মূল্য কম নয়। তবে, একই সঙ্গে বলা দরকার যে, এটি সূচনামাত্র। পশ্চিমবঙ্গকে শিল্পোন্নত করার যাত্রাপথটি বিবিধ কারণে দুর্গম। সম্মেলনে যে লগ্নি প্রস্তাব এসেছে, সেগুলিকে বাস্তবায়িত করতে গেলে এক দিকে যেমন সরকারের কর্তব্য সংশ্লিষ্ট শিল্পগোষ্ঠীগুলির সঙ্গে ধারাবাহিক ভাবে যোগাযোগ রাখা, তাদের প্রতিশ্রুতি-বিস্মৃত হতে না-দেওয়া; তেমনই প্রয়োজন রাজ্যে শিল্পের পরিবেশ তৈরি করা, তাকে বজায় রাখা। লক্ষণীয় যে, মুখ্যমন্ত্রী সাম্প্রতিক কালে একাধিক বার তাঁর দলের নেতা-মন্ত্রীদের মনে করিয়ে দিয়েছেন শিল্পমহলকে ‘বিরক্ত’ না-করার কথা। জমির জট কাটানো, প্রশাসনিক দীর্ঘসূত্রতার ফাঁদ এড়িয়ে যাওয়াও প্রয়োজন। আর চাই এমন একটি প্রশাসনিক ব্যবস্থা, যা শিল্পমহলের যে কোনও সমস্যা দূর করতে সক্ষম হবে— সমস্যায় পড়লে মুখ্যমন্ত্রীর দ্বারস্থ হওয়া ভিন্ন গতি নেই, এই পরিস্থিতিটি কাম্য নয়। নাগরিকরা আশা করবেন, সম্মেলনের পরে সরকার সেই কাজটিতে মন দেবে।
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)