Advertisement
E-Paper

সন্তানের পরীক্ষা, পিছিয়ে যায় ‘আত্মহত্যার’ দিন

প্রণয় এবং প্রসূন পুলিশকে জানিয়েছেন, প্রথমে তাঁরা ভেবেছিলেন যে সন্তানদের পরীক্ষা শেষ হলে তবেই সবাই আত্মহত্যার পথ বেছে নেবেন। দু’টি পরীক্ষাও দিয়েছিল প্রিয়ম্বদা। কিন্তু পাওনাদারেরা বাড়িতে এসে ঝামেলা করতে পারেন, এই আশঙ্কায় আর সন্তানদের পরীক্ষা শেষের অপেক্ষা করেননি তাঁরা।

গ্রাফিক: আনন্দবাজার অনলাইন।

নিজস্ব সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৬:০৭
Share
Save

এ যেন সন্তানদের অজান্তেই তাদের ‘শেষ ইচ্ছা’ পূরণ! তবে শেষমেশ পাওনাদারের ‘চাপে’ তা আর হয়ে ওঠেনি দে পরিবারের।

পুলিশ সূত্রের খবর, সন্তানদের এই ‘ইচ্ছা পূরণেই’ সপরিবার আত্মহত্যার সব পরিকল্পনা করেও হাতে কয়েক দিন সময় নিয়েছিলেন ট্যাংরার দে পরিবারের দুই ভাই প্রণয় এবং প্রসূন। লালবাজার সূত্রের দাবি, দে পরিবারের দুই ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলে এমনই জানতে পেরেছেন তদন্তকারীরা। পুলিশ জানতে পেরেছে, পড়াশোনা বিশেষ পছন্দ ছিল তাঁদের দুই সন্তানের। পাড়ায় সে ভাবে কারও সঙ্গে মেলামেশা না করলেও স্কুলে যেতে, বন্ধু-বান্ধবীদের সঙ্গে সময় কাটাতে বিশেষ পছন্দ করত প্রিয়ম্বদা। বাড়িতে থাকলে তিন তলার পড়ার ঘরেই বেশি সময় কাটত তার। গল্পের বই পড়া থেকে শুরু করে পড়াশোনা— সবই চলত ওই ঘরে বসে। বছর শেষের পরীক্ষা এসে যাওয়ায় গত কয়েক সপ্তাহ ধরে জোর কদমে তার প্রস্তুতি নিচ্ছিল দুই ভাইবোন। তাই পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে চাননি প্রসূন এবং প্রণয়। তাঁদের কাছ থেকেই জানা গিয়েছে, ১২ ফেব্রুয়ারি সব পরিকল্পনা করে স্ত্রীদেরও আত্মহত্যার জন্য রাজি করালেও, বাস্তবে তা করতে কয়েক দিন সময় নিয়ে নেন।

প্রণয় এবং প্রসূন পুলিশকে জানিয়েছেন, প্রথমে তাঁরা ভেবেছিলেন যে সন্তানদের পরীক্ষা শেষ হলে তবেই সবাই আত্মহত্যার পথ বেছে নেবেন। দু’টি পরীক্ষাও দিয়েছিল প্রিয়ম্বদা। কিন্তু পাওনাদারেরা বাড়িতে এসে ঝামেলা করতে পারেন, এই আশঙ্কায় আর সন্তানদের পরীক্ষা শেষের অপেক্ষা করেননি তাঁরা। ১৭ ফেব্রুয়ারি রাতে পায়েসের সঙ্গে ঘুম এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ মিশিয়ে মেয়েকে খাওয়ান এবং নিজেরাও খেয়ে নেন। স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে পুলিশ জানতে পেরেছে, দু’টি পরীক্ষা দিয়েছিল প্রিয়ম্বদা। সোমবার পদার্থবিদ্যার পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি ফিরেছিল। বুধবার জীববিদ্যার পরীক্ষা থাকলেও তার আর স্কুলেযাওয়া হয়নি।

পুলিশের একটি সূত্র জানাচ্ছে, মোট ছ’জন পাওনাদারকে চেক দিয়েছিলেন দুই ভাই। সব মিলিয়ে তাঁদের পাওনার অঙ্ক ছিল প্রায় এক কোটি টাকা। গত সপ্তাহেই সকলকে ব্যাঙ্কে চেক জমা করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু পাওনাদারদের চেক বাউন্স হবে নিশ্চিত বুঝতে পেরে বাড়িতে এসে ঝামেলার আশঙ্কা করছিলেন দুই ভাই।

তবে পুলিশের একাংশের সন্দেহ, সেই রাতে আদৌ দুই ভাই কি ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন? অভিষিক্তা মোড়ে দুর্ঘটনার পরে জখম অবস্থায় ই এম বাইপাসের ধারে একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হন তাঁরা। সেখানে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার পরে শরীরে ঘুমের ওষুধের প্রভাব সে ভাবে মেলেনি বলেই হাসপাতালের একটি সূত্রের খবর। যদিও ফরেন্সিক মেডিসিনের চিকিৎসকদের অনেকে জানান, ওষুধ খাওয়ার ১২ ঘণ্টা পর থেকে শরীরে তার প্রতিক্রিয়া কমতে থাকে। এ ক্ষেত্রে ঘুমের ওষুধ খাওয়ার ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পরে দুর্ঘটনা হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাই কিছু প্রশ্নের উত্তর না-ও মিলতে পারে। ফরেন্সিক মেডিসিনের বিশেষজ্ঞ এবং আর জি কর মেডিক্যাল কলেজের পয়জ়ন ইনফরমেশন সেন্টারের প্রাক্তন ভারপ্রাপ্ত চিকিৎসক সোমনাথ দাসের কথায়, ‘‘কী ধরনের ঘুমের ওষুধ খেয়েছিলেন, কতটা খেয়েছিলেন— সব কিছু হিসেব করতে হয়। তা না-হলে স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছনো কঠিন।’’

বাইপাসের ধারের ওই হাসপাতালে ভর্তি থাকাকালীন পরিবারের কেউ প্রসূন-প্রণয়দের দেখতে আসেননি। শনিবার রাত আটটা নাগাদ প্রণয়কে বেসরকারি হাসপাতাল থেকে এন আর এস হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছে। এন আর এস সূত্রের খবর, অস্থি রোগ বিভাগের সাধারণ শয্যাতেই রাখা হয়েছে প্রণয়কে। রয়েছে পুলিশি নজরদারি। গাড়ি দুর্ঘটনার ফলে প্রণয়ের ডান দিকের হিপ-জয়েন্ট পুরো ভেঙে গিয়েছিল। সেই হাড় জোড়ার জন্য বেসরকারি হাসপাতালে ‘স্কেলেটাল পিন ট্র্যাকশন’ দেওয়া হয়েছিল। সেই অবস্থাতেই তাঁকে এন আর এসে ভর্তি করানো হয়েছে। এখন শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল। অস্থি চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, স্কেলেটাল ট্র্যাকশন হল, কোনও অঙ্গের উপর বিক্ষিপ্ত শক্তি প্রয়োগ করে ভাঙা হাড়কে জোড়া লাগানোর বা স্থিতিশীল করার একটি পদ্ধতি। এই অবস্থায় রোগীকে শয্যাশায়ী থাকতে হয় এবং কড়া পর্যবেক্ষণে ও সঠিক পরিচর্যার মধ্যে রাখতে হয়। যাতে সংক্রমণ, দীর্ঘ দিন শয্যাশায়ী থাকার বেডসোরের সমস্যা তৈরি না হয়। তাই প্রণয়কে চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে রাখতেই এন আর এস-এর অস্থি রোগ বিভাগে ভর্তি করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।

বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি প্রসূনের রবিবার সিটি স্ক্যান করা হয়। চলে আরও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা। আজ, সোমবার বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি থাকা প্রসূন এবং কিশোরকে ছুটি দিয়ে দেওয়া হতে পারে বলে জানা যাচ্ছে। পরিবারের কেউ এগিয়ে না এলে কিশোরকে কোথায় পাঠানো হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সে ক্ষেত্রে কিশোরকে হোমে পাঠানো ছাড়া আর উপায় থাকবে না বলে পুলিশের একাংশের দাবি। সূত্রের খবর, ইতিমধ্যেই দফায় দফায় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছেন তদন্তকারীরা। সোমবার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

পুলিশ কার্যত নিশ্চিত, পূর্ব পরিকল্পনা করেই সপরিবার আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ট্যাংরার দে পরিবার। সেই মতো বাড়ির নিয়মিত পুরোহিত থেকে শুরু করে গাড়ি ধোয়ার লোক— সকলকেই আসতে বারণ করা হয়েছিল। দে বাড়িতে নিয়মিত পুজো করা স্থানীয় এক পুরোহিত দাবি করেছেন, প্রতিদিন ওই বাড়িতে পুজো করতে যেতেন। গত সোমবার তিনি শেষবারের মতো ওই বাড়িতে গিয়েছিলেন। মঙ্গলবার তাঁর আসার কথা থাকলেও, খবর পাঠিয়ে তাঁকে ওই দিন যেতে নিষেধ করা হয়। বুধবার তাঁর যাওয়ার কথা ছিল। যদিও বুধবার সকালে তিনি গোটা ঘটনার কথা জানতে পারেন। এক তদন্তকারী আধিকারিক বলেন, ‘‘কেন এত টাকা ঋণ হল, তা-ও দেখা হচ্ছে। ব্যাঙ্কের লেনদেনের তথ্যও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Tangra Murder Case Tangra police investigation

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or Continue with

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy

{-- Slick slider script --}}