অন্যান্য দিনের চেয়ে একেবারে ভিন্ন ছবি। রবিবার বাহারি আলোকসজ্জা এবং প্যান্ডেল দিয়ে সেজে উঠে ছিল মুর্শিদাবাদের কান্দি থানা। ভেসে আসছিল সানাইয়ের সুর। সারাদিন নির্জলা উপোস করে কন্যা সম্প্রদান করলেন খোদ থানার বড়বাবু। পাত পেড়ে খেলেন জেলা পুলিশের একাধিক শীর্ষকর্তা। ‘অনাথ’ কন্যার বিয়েতে জেলা পুলিশের ভূমিকায় প্রশংসায় পঞ্চমুখ এলাকার সাধারণ মানুষ।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মুর্শিদাবাদের কান্দি থানায় বিয়ের আসর বসানোর প্রস্তুতি শুরু হয় প্রায় দিন ১০-১২ দিন আগে থেকে। ওই দিন কান্দি থানার টহলদারিতে থাকা কয়েক জন আধিকারিক লক্ষ করেন কিছু ব্যক্তি কান্দির বিভিন্ন দোকানে ঘুরে ঘুরে এক অনাথ মেয়ের বিয়ে দেওয়ার জন্য অর্থ সাহায্য চাইছেন। থানার বড়বাবুর কানে ঘটনার খবর যেতেই ডেকে পাঠান তাঁদের সকলকে। গোটা ঘটনা শোনার পর মৃণাল সিংহ সিদ্ধান্ত নেন ‘অনাথ’ মেয়ের বিয়েতে তিনি কন্যা সম্প্রদান করবেন। বিয়ের আসর বসবে তাঁর কর্মক্ষেত্র কান্দি থানায়। বিষয়টি নিজের ঊর্ধ্বতন আধিকারিকদের জানাতেই মিলে যায় তাঁদের অনুমোদন। এর পরেই শুরু হয় বিয়ের প্রস্তুতি।
খড়গ্রাম থানার সুরখালি এলাকার বাসিন্দা সারজিনা খাতুন। মাত্র চার বছর বয়সে হারিয়েছিলেন নিজের মাকে। তার পর থেকে বাবা ভিক্ষে করে সংসার চালাতেন। বছর তিনেক আগে বাবাও মারা যান। মা-বাবা হারা সারজিনা নিজের পিসির বাড়িতেই থাকতেন। সুন্দরপুরের এক যুবকের সঙ্গে সারজিনার বিয়ে ঠিক হয়। বিয়ে ঠিক হলেও অর্থের অভাবে তাঁর পরিবারের লোকজন বিয়ের আয়োজন করতে পারছিলেন না। গ্রামবাসীরা এই বিয়ে দেওয়ার জন্য বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করছিলেন। কান্দি থানার বড়বাবু গোটা বিষয়টি জানার পর তিনি তাঁদের পাশে এসে দাঁড়ান। মৃণাল বলেন, “সারজিনার বাবা হয়ে তিনি বিয়ের সমস্ত আয়োজন করবেন এবং কন্যাদান করবেন।”
আরও পড়ুন:
সদ্য পিতার দায়িত্ব গ্রহণ করা বড়বাবু বিয়ের জন্য রবিবার সকাল থেকে খাকি পোশাক ছেড়ে জরির কাজ করা পাঞ্জাবি এবং ধুতি পরে ঘুরে ঘুরে মেয়ের শ্বশুরবাড়ির লোকেদের সব কিছু নিজে তদারকি করলেন। বিয়ের আসরে হাজির হয়েছিলেন মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার অতিরিক্ত সুপার মজিদ ইকবাল খান, কান্দির বিধায়ক অপূর্ব সরকার, কান্দি পুরসভার চেয়ারম্যান জয়দেব ঘটক-সহ পুলিশ প্রশাসনের আরও একাধিক শীর্ষ আধিকারিকেরা। সকলেই দু’হাত তুলে আশীর্বাদ করে গেলেন নবদম্পতিকে আর আকুন্ঠ প্রশংসা করলেন এই অভিনব উদ্যোগের। রবিবার ‘বাবা’ হিসাবে ‘মেয়ের’ বিয়েতে নতুন জামাইকে উপহারও দিলেন মৃণাল। উপহারে ছিল নতুন খাট, বিছানা, আসবাবপত্র, টিভি, ফ্রিজ, আলমারি এবং বেশ কিছু সোনার গয়না। বিয়ের সকালে আমন্ত্রিতদের জন্য ছিল কচুরি, মিষ্টি, আলুর দম। দুপুরে ছিল ভাত, খাসির মাংস, চিংড়ি মাছের মালাইকারি, দই, মিষ্টি, আইসক্রিম-সহ একাধিক পদ।
‘কন্যা’কে বিদায় দেওয়ার পর আলাদা করে কিছু বলতে রাজি হননি মৃণাল। কান্দির বিধায়ক অপূর্ব সরকার বলেন, “আমরা নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করলাম। তাঁদের যে কোনও অসুবিধায় পুলিশ প্রশাসন এবং আমরা সর্বদা পাশে থাকব।”
বিয়ের পর সারজিনা বলেন, “কান্দি থানার আইসি আজ আমার ‘বাবা’হিসাবে কন্যাদান করেছেন। বিয়েতে উপহার দিয়ে ভরিয়ে দিয়েছেন। স্বপ্নেও কোনও দিন ভাবিনি এত বড় করে আমার বিয়ে হবে।” মুর্শিদাবাদ পুলিশ জেলার অতিরিক্ত সুপার মাজিদ ইকবাল বলেন, “সামাজিক কাজে পুলিশের এই অংশগ্রহণ সাধারণ মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করবে।”