রাখি গুলজ়ার... নাম শুনলেই তামাম দর্শকের চোখে ভেসে ওঠে শান্ত, স্নিগ্ধ এক নায়িকার মুখ। গোল মুখ ঘিরে লম্বা চুল, ধূসর চোখ, তুখোড় অভিনয়। এই দিয়েই এক সময় বলিউড থেকে বাংলা ছবির দুনিয়া মাতিয়ে রেখেছিলেন। তখন তিনি রাখি বিশ্বাস। বাংলাদেশের ‘উদ্বাস্তু’ মেয়েটিকে প্রথম আবিষ্কার করেছিলেন অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায়। নিজ দায়িত্বে অভিনেত্রী হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন। সেই রাখি পরবর্তী কালে বলিউডে পাড়ি দেন। অমিতাভ বচ্চন, শশী কপূর, সঞ্জীব কুমার-সহ সমকালীন খ্যাতনামী নায়কদের বিপরীতে পাল্লা দিয়ে অভিনয় করেছেন। বহু হিট ছবি উপহার দিয়েছেন জুটি বেঁধে। অমিতাভের সঙ্গেই তাঁর সফল ছবির সংখ্যা ১১টি।

অমিতাভ বচ্চন-রাখি গুলজ়ার এক ফ্রেমে।
অথচ, অমিতাভ-জয়া বচ্চন, অমিতাভ-রেখা বা অমিতাভ-পরভীন ববি জুটি হিসাবে যতটা চর্চিত অমিতাভ-রাখিকে নিয়ে কোনও চর্চা নেই! কেন?
১২ বছর পরে রাখি ফের বাংলা ছবিতে অভিনয় করলেন। উইন্ডোজ় প্রযোজনা সংস্থার গরমের ছুটির ছবি ‘আমার বস’-এ সম্প্রতি অভিনয় করেছেন। তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন ‘আমার বস’-এর টিমের প্রত্যেকে, ছবির সৃজনশীল প্রযোজক জ়িনিয়া সেনও। আনন্দবাজার অনলাইনের প্রশ্নে পেশায় কাহিনি-চিত্রনাট্যকারের দাবি, “প্রথমত, অমিতাভের সঙ্গে রাখির খুব ভাল বন্ধুত্ব ছিল। সেখানে কোনও গুঞ্জনের অবকাশ ছিল না। অন্য দিকে, জয়ার সঙ্গে প্রেমের গুঞ্জনের পরে তাঁর সঙ্গে বিয়ে। রেখার সঙ্গে বলিউড ‘শাহেনশা’র প্রেম সর্বজনবিদিত। একই ভাবে পরভীন ববির সঙ্গেও তাঁর নাম জড়িয়েছিল, যেটা রাখিজির সঙ্গে হয়নি। গুঞ্জন না থাকলে জুটি যতই হিট হোক, কেউ তাঁদের নিয়ে চর্চা করবে না।”
জ়িনিয়া এ-ও জানান, তত দিনে রাখি গুলজ়ারের বিয়ে হয়ে গিয়েছে। স্বামী বলিউডের খ্যাতনামী। এটাও গুঞ্জন বা চর্চা না হওয়ার একটা সম্ভাব্য কারণ।

‘আমার বস’ ছবিতে রাখি গুলজ়ার, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
মাঝে হিন্দি ছবিতে মায়ের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন বর্ষীয়ান অভিনেত্রী। সেটাও হাতেগোনা। এত বছর পরে তিনি বাংলা ছবিতে মুখ্য ভূমিকায়। ক্যামেরার সামনে আসার আগে কোনও জড়তা ছিল তাঁর? কাহিনি-চিত্রনাট্যকারের চোখে কোনও খুঁত ধরা পড়েনি। বলেছেন, “ক্যামেরার পিছনে এক রকম। ‘কাট’ বললেই নানা আবদার! আগের মুহূর্তেই হয়তো গায়ে শাল জড়াবেন না বলে আবদার জুড়েছেন। ক্যামেরা চালু হতেই রাখিজি ‘চরিত্র’ হয়ে উঠেছেন।” শুটিং ফুরোলেই বাকিদের সঙ্গে জমিয়ে আড্ডা। দলের প্রত্যেকের নাম দিয়েছিলেন তিনি। যেমন, অভিনেত্রী উমা বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি ‘নোলক’ বলে ডাকতেন। কারণ, তাঁর নাকের নোলক!
আরও পড়ুন:
আর ‘ব্যক্তি’ রাখি গুলজার? “ছোট্ট একটি ঘটনার কথা বলি। শুটিং শেষের আগের দিন রাখিদি জানিয়েছিলেন, সুন্দরবনে সকলকে নিয়ে চড়ুইভাতি করতে যাবেন। নিজেই রাঁধবেন। সবাই খুব ক্লান্ত থাকায় সেই আবদার রাখতে পারিনি। ছেলেমানুষের মতো মুখ ফুলিয়ে রেখেছিলেন”, বললেন জ়িনিয়া। তাঁর সময়ের শুটিং আর এখনকার শুটিংয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল ফারাক। এই পার্থক্য মাঝেমধ্যে হয়তো তাঁর ধৈর্যচ্যুতি ঘটাত। তখন তিনি হয়তো সামান্য মেজাজি। বাকি সময় নিপাট বঙ্গনারী। শাড়ি পরতে ভালবাসেন। এখনও জমিয়ে রাঁধতে পারেন। গত শীতে পিঠেপুলির মরসুমে মুম্বইয়ে তাঁর জন্য পাটিসাপটা নিয়ে গিয়েছিলেন কাহিনি-চিত্রনাট্যকার। “টিফিনবাক্স খুলতেই দেখি রাখিজির চোখে জল! আবেগ চেপে ধরা গলায় বলে উঠলেন, ‘তুমি যে মায়ের কথা মনে পড়িয়ে দিলে। আমার মা-ও এ ভাবে পাটিসাপটা বানাত।”’