‘‘মেয়েরা সমাজের লেজ। ওরা নেতা হতে পারে না।’’— এ কথা তাঁদের অনেককেই শুনতে হয়েছে। তাঁরা শুনেছেন। শুনে শুনেই লড়াই করে গিয়েছেন তাঁরা। লড়েছেন পরিবার-সমাজের বিরুদ্ধে। সর্বোপরি নিজের সঙ্গে। লড়াই করেই আজ তাঁরা নেত্রী! কিন্তু নিজের শিকড় কেউই ভোলেননি। আজও তাঁদের কেউ সাইকেলে তিন কিলোমিটার উজিয়ে পঞ্চায়েতে আসেন। কেউ আবার শিশুসন্তান-সংসার সামলেই কাজ করে যাচ্ছেন। নিজের গ্রামে জল, পাকা রাস্তা, শৌচাগার, এমনকি ব্যাঙ্কও এনে দিয়েছেন।
এমন বহু মহিলা পঞ্চায়েত প্রধানই প্রতিকূলতার পাহাড় ডিঙিয়ে কাজ করে চলেছেন পশ্চিমবঙ্গে। রাজ্যে ত্রিস্তর পঞ্চায়েতে অর্ধেক আসনই এখন মহিলা সংরক্ষিত। সাধারণ, তফসিলি জাতি, জনজাতি— সব সম্প্রদায়ের মহিলা প্রতিনিধিত্ব রয়েছে সেখানে। সকলের উন্নয়নেই কাজ করছেন মহিলা প্রধানেরা। তাঁদের হাত ধরে পঞ্চায়েত এবং সেই সূত্রে রাজ্য ও দেশের সার্বিক বিকাশও হচ্ছে।
সংসারের হাজার ঝক্কি সামলেও প্রতি দিনই পঞ্চায়েত অফিসে যান বাঁকুড়ার দুন্দার গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান রূপা রায়। ২০২৩ সালে ভোটে জেতার পর প্রধান হতে হবে শুনে প্রথমে খানিক ভয়ই পেয়েছিলেন তিনি। তবে দ্রুত নিজেকে সামলেও নিয়েছিলেন। এলাকায় উন্নয়নই এখন তাঁর মূল লক্ষ্য। রূপার কথায়, ‘‘অনেকে দূর দূর থেকে পঞ্চায়েত অফিসে আসেন। আমি না-থাকার কারণে যদি তাঁদের এক জনকেও ফিরে যেতে হয়, আমার কষ্ট হয়। সে জন্য যতই সমস্যা থাকুক, সবটা সামলে পঞ্চায়েতে আসার চেষ্টা করি আমি।’’
সাইকেল চালিয়ে পঞ্চায়েতে যান পশ্চিম মেদিনীপুরের গোয়ালতোড়ের জিরাপাড়া পঞ্চায়েতের প্রধান সুখুমণি হাঁসদা। গত বার প্রথম জিতেছেন রাজ্যের শাসকদল তৃণমূলের টিকিটে। সাইকেলেই গ্রামে ঘোরেন সুখুমণি। তাঁর এলাকায় রাস্তা, জল, বিদ্যুৎ, উপ-স্বাস্থ্যকেন্দ্র, প্রতি পরিবারের জন্য বাড়িতে শৌচালয় হয়েছে। প্রথম বার প্রধান হয়ে পূর্ব মেদিনীপুরের ইটামগরা-১ গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ এনেছেন প্রীতিকণা জানা। তিনি বলেন, ‘‘পঞ্চায়েতে জল নিকাশি ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজাটাই আমাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। শহরাঞ্চল হওয়ায় এখানে রাস্তার উপর প্রচুর বাড়িঘর তৈরি হয়ে গিয়েছে। অথচ নিকাশির সুষ্ঠু ব্যবস্থা অনেক জায়গায় নেই। এটা ঠিক করতে হবে।’’
শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদের অন্তর্গত ফাঁসিদেওয়া ব্লকের বিধাননগর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতে প্রথম বার প্রধান হয়েছেন জ্যোতি খালখো। দায়িত্ব পাওয়ার পরেই গ্রামের রাস্তা পাকা করার কাজ শুরু করেন তিনি। এ ছাড়া আইসিডিএস সেন্টার পুনর্নির্মাণ এবং পরিশ্রুত পানীয় জলের ব্যবস্থাও তাঁর হাত ধরেই হয়েছে। জ্যোতি বলেন, ‘‘আমি নিজে চা-বাগান এলাকার মেয়ে। চা-বাগানে নানা সমস্যা রয়েছে। সেগুলোর সমাধান করতে চাই।’’
তবে জ্যোতির মতো স্বাধীন ভাবে কাজ করতে পারেন না অনেক মহিলা প্রধান। উত্তর দিনাজপুরে প্রায় ৩০টি, শিলিগুড়ি মহকুমার ১০টি পঞ্চায়েতে মহিলা প্রধান। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁদের স্বামী, ছেলে বা নিকটাত্মীয় পুরুষেরা বকলমে পঞ্চায়েত সামলান বলে অভিযোগ রয়েছে। মহিলা প্রধানদের এলাকায় ঠিকাদারদের ‘সিন্ডিকেট’ অনেক জোরদার, এমন অভিযোগও মেলে। কারণ, তাঁরা পঞ্চায়েত আইন সম্পর্কে অবগত নন। পড়াশোনাও কম। বহু মহিলা প্রধানেরই কাজ সই (কোথাও টিপসই) করায় সীমিত। প্রধানের ফোন ধরেন অন্য কেউ!
যেমন বাঁকুড়ার ইঁদপুরের হাটগ্রাম পঞ্চায়েতে দু’বারের প্রধান, তৃণমূলের কবিতা লায়েক। এলাকাবাসীর দাবি, ‘‘ওঁর স্বামীই পঞ্চায়েত চালান।’’ বিজেপি পরিচালিত বীরভূমের সাঁইথিয়ার দেরিয়াপুর পঞ্চায়েতের বুলু পাহাড়িয়া ‘নামেই’ প্রধান। তাঁর স্বামী, দলের বুথ সভাপতি গোকুল পাহাড়িয়া মানছেন, ‘‘স্ত্রী স্বল্পশিক্ষিত। যা করার আমাকেই করতে হয়।’’
প্রথম বার পঞ্চায়েত প্রধান হওয়ার পর ‘এইট পাশ’ বলে কটাক্ষ শুনতে হয়েছিলেন নদিয়ার করিমপুর-২ ব্লকের নন্দনপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের গীতা পত্তনদারকেও। বিরোধী দল পরিচালিত পঞ্চায়েতের প্রধান হওয়ায় শুরুতে নানা রাজনৈতিক সমস্যারও সম্মুখীন হতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু অল্প দিনেই গ্রামবাসীদের মন জয় করেছেন নম্র স্বভাবের গীতা। তাঁর প্রশংসা করেন শাসকদল তৃণমূলের সদস্যেরাও। গীতা বলেন, ‘‘বিরোধী দলের প্রধান হওয়ায় দায়িত্ব অনেক বেশি। নিজে বেশি দূর পড়াশোনা করতে পারিনি। কিন্তু সুযোগ যখন পেয়েছি, গ্রামের স্কুলগুলির উন্নয়ন করতে চাই। আরও স্বনির্ভর করে তুলতে চাই গ্রামের মহিলাদের।’’ নদিয়ার জেলাশাসক অরুণ প্রসাদ বলেন, ‘‘প্রধান হিসেবে মহিলাদের পারফরম্যান্স যথেষ্ট ইতিবাচক। অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ হলে আরও ভাল কাজ করবেন ওঁরা।’’
নিজের গ্রামে সকলের ‘দিদি’ হয়ে উঠেছেন মুর্শিদাবাদ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত করিমপুর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের সুপর্ণা মুখোপাধ্যায়ও। এক অর্থবর্ষে চার কোটি টাকার কাজ শেষ করে ‘রেকর্ড’ করেছেন সুপর্ণা।
দুই ২৪ পরগনা, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহারেও অধিকাংশ মহিলা পরিচালিত পঞ্চায়েতের বাসিন্দাদের মতে, দলমত নির্বিশেষে মহিলারা ভাল কাজ করছেন। তাঁদের নতুন চিন্তাভাবনা পঞ্চায়েতকে কিছু ক্ষেত্রে দিশাও দেখাচ্ছে। এই প্রধানদের মধ্যে থেকে আল্ট্রাটেক সিমেন্ট পরিবার বেছে নেবে ‘আল্ট্রাটেক যশস্বী প্রধান’। আল্ট্রাটেক সিমেন্ট দেশ জুড়ে এই বিকাশ ও নির্মাণকার্যে সহযোগিতা করে চলেছে। নিজেদের এই অভিজ্ঞতা, গুণমান এবং বিশ্বস্ততাকে পাথেয় করে পশ্চিমবঙ্গেও গ্রাম প্রধানদের সার্বিক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই সংস্থা।