Advertisement
E-Paper

কেউ জোর দিয়েছেন শিক্ষায়, কেউ বা কর্মসংস্থানে, প্রথম বারের গ্রাম প্রধানদের পঞ্চায়েতে উন্নয়নের ছবি কেমন

বীরভূমের বাজিতপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় এটাই রোজকারের ছবি এখন বদলেছে। সৌজন্যে পঞ্চায়েত প্রধান শুভেন্দু মণ্ডল। ২০২৩ সালের ভোটে জিতে প্রথম বার প্রধান নির্বাচিত হন তিনি।

প্রতীকী চিত্র

প্রতীকী চিত্র

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২৫ ২১:২১
Share
Save

মজে গিয়েছে দ্বারকা নদী। আগের মতো আর ঠিক করে স্নানও করা যায় না। নদীর জল ঢাললেই সারা গা বালি বালি হয়ে যায়! তার পরেও বাধ্য হয়ে গ্রামবাসীদের নদীতেই স্নান করতে যেতে হত। কাপড় বদলাতে গাছের আড়াল খুঁজতে হত গ্রামের মহিলাদের। শৌচকর্মের জন্যও ছুটতে হত জঙ্গলে বা ঝোপের আড়ালে। বীরভূমের বাজিতপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় এটাই রোজকারের ছবি ছিল। যা এখন বদলেছে।

সৌজন্যে পঞ্চায়েত প্রধান শুভেন্দু মণ্ডল। ২০২৩ সালের ভোটে জিতে প্রথম বার প্রধান নির্বাচিত হন তিনি। এর পরেই স্থানীয়দের দীর্ঘ দিনের দাবি মেনে গড়ে তুলেছেন ‘কমিউনিটি স্যানিটারি কমপ্লেক্স’, যেখানে আলাদা ব্যবস্থাও রয়েছে মহিলা এবং পুরুষদের জন্য। শুখা মরসুমে স্নানের ব্যবস্থাও রয়েছে সেখানে। যাতে জলের অভাব না হয়, তার জন্য তৈরি হয়েছে দু’টি ট্যাঙ্ক। সাবমার্সিবল পাম্প ব্যবহার করে তাতে জল ধরে রাখা হয়। শুভেন্দু বলছেন, ‘‘এলাকার মানুষের দীর্ঘ দিনের দাবিদাওয়া ছিল। কিন্তু পঞ্চায়েতের সামান্য আয়ে তা পূরণ করা যাচ্ছিল না। এ বার সুযোগ এসেছিল। স্বচ্ছ ভারত মিশনের টাকাও এসেছে। প্রায় সাড়ে চার লক্ষ টাকা খরচ করে শিউলিয়া পীরস্থানে কমিউনিটি স্যানিটারি কমপ্লেক্স তৈরি করা হয়েছে।’’

শুধু বাজিতপুর নয়, রাজ্যের এ রকম বহু গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাতেই উন্নয়নের ছোঁয়া চোখে পড়ার মতো। এককালে সে সব এলাকায় রাস্তা, বিদ্যুৎ, পানীয় জল-সহ কোনও কিছুরই বন্দোবস্ত ছিল না। কিন্তু গত কয়েক বছরে সেই অবস্থা বদলেছে। শহরের সঙ্গে গ্রামকে জুড়তে ঢালাই রাস্তা, পানীয় জলের পাইপ লাইন, বিদ্যুতের খুঁটি পোঁতা, পুকুরের সংস্কার হয়েছে। এ সব কাজের বাইরেও পঞ্চায়েত প্রধানদের কেউ শিক্ষায় জোর দিয়েছেন। কেউ আবার গুরুত্ব দিয়েছেন গ্রামবাসীদের কর্মসংস্থানে।

গ্রামজীবনের উন্নয়নে সক্রিয় ছিলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী। চালু করেছিলেন ‘পিএম টু ডিএম’। যাতে কেন্দ্রের টাকা সরাসরি গ্রামে পৌঁছতে পারে। সেই উদ্যোগকে ‘যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোর পরিপন্থী’ বলে দাগিয়ে দিয়ে তার বিরোধিতা হয়েছিল। তার পর রাজনীতির জল বহু দূর গড়িয়েছে। কেন্দ্র এবং রাজ্যে সরকার বদলেছে। এখন অবশ্য সব পক্ষই মনে করে, দেশের সার্বিক উন্নয়নের জন্য গ্রামীণ পরিকাঠামো উন্নয়ন ভীষণ ভাবেই জরুরি। তাই কেন্দ্র থেকে এখন সরাসরি পঞ্চায়েতে টাকা আসে। রাজ্যও নিজের মতো করে অর্থ বরাদ্দ করে। যাতে দ্রুত কার্যকর করা যায় উন্নয়নের রূপরেখা।

সেই পথেই হেঁটেছেন পুরুলিয়ার রামচন্দ্রপুর-কোটালডি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান কনকলতা মণ্ডল। তাঁর এলাকায় চাল, ডাল, সব্জির মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস সহজলভ্য নয়। পাঁচ-ছ’কিলোমিটার পথ উজিয়ে বাজারে যেতে হয় গ্রামবাসীদের। তাঁদের কথা ভেবেই এলাকায় বাজার কমপ্লেক্স তৈরি করছেন প্রথম বারের প্রধান কনকলতা। তিনি বলেন, ‘‘স্কুল চত্বরে কিছুটা ফাঁকা জায়গা ছিল। সেখানে কয়েকটা দোকান তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। এ বার থেকেই সেখানেই অনেক জিনিস পাওয়া যাবে আশা করছি।’’ কনকলতা নিজে দিনমজুর পরিবারের মেয়ে। তাঁর স্বামীও পেটের টানে কখনও আসানসোলে, কখনও মেজিয়ার স্পঞ্জ আয়রন কারখানায় কাজে যান। শুধু কনকলতার স্বামীই নন, গ্রামের আরও অনেককেই কাজের জন্য বাইরে যেতে হয়। তাঁদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাও তাঁর লক্ষ্য বলে জানান পঞ্চায়েত প্রধান।

নিজের এলাকায় বাজার কমপ্লেক্স তৈরি করেছেন বাঁকুড়ার কুশিদ্বীপ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান সুমিত্রা মুর্মুও। কনকলতার মতো তাঁর বয়স ৫০ নয়। মাত্র ২৫। কিন্তু ভাবনা একই। তিনি বলেন, ‘‘আমার অনেক স্বপ্ন ছিল। কিন্তু অভাবে সে সব পূরণ হয়নি। বই-খাতা সরিয়ে সংসারের দায়িত্ব নিতে হয়েছিল। আমি যুব সমাজের কষ্টটা বুঝি। গ্রামের ছেলেমেয়েদের কথা ভেবেই মার্কেট কমপ্লেক্স তৈরি করেছি। শুরুতে অন্তত ৫০ জনের কর্মসংস্থার হবে।’’

কুশিদ্বীপের মতো কর্মসংস্থার অভাব নেই বাঁকুড়ার মেজিয়া গ্রামে। এক দিকে কালীদাসপুর কয়লা খনি, অন্য দিকে মেজিয়া শিল্পাঞ্চল গড়ে গ্রামের পুরুষ-মহিলারা সেখানেই কাজে যান। অভাব ছিল একটি কমিউনিটি হলের। বিয়ে, অন্নপ্রাশনে বেসরকারি হল ভাড়া করতে গিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা গুনতে হত গ্রামবাসীদের। তাঁদের দাবি মেনে সম্প্রতি এলাকায় একটি কমিউনিটি হল তৈরি করে দিয়েছেন পঞ্চায়েত প্রধান বিশ্বজিৎ গোপ। প্রধান বলেন, ‘‘গ্রামের মানুষেরাই ভাড়া নেন। যাঁদের আর্থিক অবস্থা ভাল নয়, তাঁদের এমনিই দেওয়া হয়। আমাদের কমিউনিটি হলে শৌচালয়, জল-বিদ্যুতের ব্যবস্থাও আছে।’’

আদিবাসী সংস্কৃতি বাঁচিয়ে রাখতে নিজের এলাকায় একটি কমিউনিটি সেন্টার তৈরি করেছেন বাজিতপুরের শুভেন্দু। বাজিতপুরে ৩০ শতাংশেরও বেশি আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষের বাস। তাঁরা যাতে নিজস্ব লোকসংস্কৃতির চর্চা করতে পারেন, তার জন্য কমিউনিটি সেন্টার তৈরি করেছেন শুভেন্দু। তাঁর উদ্যোগে এলাকায় আর্থিক ভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের ছেলেমেয়েদের জন্য তৈরি হয়েছে টিউশন সেন্টারও।

নিজের এলাকায় শিক্ষার বিকাশে গুরুত্ব দিয়েছেন পূর্ব মেদিনীপুরের নন্দীগ্রামে খোদামবাড়ি-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান গোপাল জানা। তিনি বলেন, ‘‘স্কুলছুটদের স্কুলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি আমরা। প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে নাবালিকাদের পড়াশোনা বন্ধ করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। সেটা আটকানোর চেষ্টা করি।’’ প্রধানের অনুযোগ, ‘‘এলাকার ২৩টি আইসিডিএস সেন্টারে পর্যাপ্ত শিক্ষিকের অভাব রয়েছে। এক এক জনকে তিন-তিনটে সেন্টারের দায়িত্ব সামলাতে হয়। বিডিও-র কাছে দরবার করেছি। দেখা যাক।’’

নদিয়ারময়ূরহাটি গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান দেবব্রত দাসের অবশ্য এ রকম কোনও অভিযোগ নেই। বরং, এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে নির্দ্ধিধায় যোগাযোগ করেছেন ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ (তৃণমূলের ‘দিদিকে বলো’র কর্মসূচির পর টেলিফোনে সাধারণ মানুষের অভাব-অভিযোগ জানানোর জন্য সরকারি ভাবে চালু হয়েছে ‘সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী’ কর্মসূচি)-তে। দেবব্রত বলেন, ‘‘হাঁসখালিতে একটি ধর্ষণের ঘটনা নাড়িয়ে দিয়েছিল আমাকে। প্রধান হয়ে সর্বত্র সোলার লাইট বসিয়েছি। বাচ্চাদের স্কুলমুখো করতে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্লিপার, রাউন্ডার তৈরি করেছি। বাচ্চাদের হাসিমুখগুলো দেখলে কী যে ভাল লাগে!’’

যদিও গোটা রাজ্যে এমন পরিস্থিতি নয়। বিভিন্ন পরিষেবা নিয়ে বার বার বিতর্ক হয়েছে। যদিও শাসকদলের পাল্টা দাবি, সেই সব ক্ষোভ থেকে শিক্ষা নিয়ে কর্মসূচিতে গতি আনা হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশেরও মত, গ্রামের উন্নয়নে যোগদানে দেশের সার্বিক উন্নয়ন সম্ভব হয়। সেই উন্নয়নের কাজে রাজ্যের কিছু অঞ্চল এখন অগ্রণী। কিছু ক্ষেত্রে অভাব অভিযোগ অবশ্যই রয়েছে। তবে সে সব রাজ্যেই আছে। তার পরেও দল ও দুর্নীতির উপরে উঠে কিছু গ্রাম প্রধান উন্নয়নকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।

যে সব গ্রাম পঞ্চায়েত প্রধানদের হাত ধরে গ্রামের সর্বাঙ্গীন ও পরিকাঠামোগত বিকাশ হচ্ছে, তাঁদের মধ্যে থেকে আল্ট্রাটেক সিমেন্ট পরিবার বেছে নেবে ‘আল্ট্রাটেক যশস্বী প্রধান’। আল্ট্রাটেক সিমেন্ট দেশ জুড়ে এই বিকাশ ও নির্মাণকার্যে সহযোগিতা করে চলেছে। নিজেদের এই অভিজ্ঞতা, গুণমান এবং বিশ্বস্ততাকে পাথেয় করে পশ্চিমবঙ্গেও সকল গ্রাম প্রধানদের সার্বিক উন্নয়নের প্রচেষ্টাকে সহায়তা করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই সংস্থা। বিস্তারিত জানতে চোখ রাখুন আনন্দবাজার ডট কমে।

Devlopment village Gram Pradhan

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or Continue with

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy

{-- Slick slider script --}}