বিধানসভা ভোটের এখনও বছরখানেক বাকি। খাস কলকাতার ভবানীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের লড়াইয়ের জন্য তাল ঠোকা শুরু হয়ে গেল শাসক তৃণমূল কংগ্রেস ও বিরোধী বিজেপির। সলতে পাকানো শুরু করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী।
নন্দীগ্রামে ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটে মমতা ও শুভেন্দুর সরাসরি লড়াই দেখেছিল বাংলা। ভোটের কয়েক মাস আগে শুভেন্দু তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেওয়ায় তাঁর পুরনো সতীর্থের নন্দীগ্রাম কেন্দ্রে নিজে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা করেছিলেন মমতা। নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত ১৯৫৬ ভোটে জয়ী হয়েছিলেন শুভেন্দুই। পরে ভবানীপুর থেকে উপনির্বাচনে জিতে বিধানসভায় গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। এ বার শুভেন্দু হুঙ্কার দিচ্ছেন, ভবানীপুরেও মমতাকে হারিয়ে দেখাবেন! বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদারও পত্রপাঠ বলে দিয়েছেন, শুভেন্দু দলের কাছে ভবানীপুরে প্রার্থী হওয়ার প্রস্তাব দিলে তাঁরা স্বাগত জানাবেন। বিজেপি সভাপতির এই কৌশলকে ‘বাঘ মারতে শক্র পাঠানো’র কৌশল হিসেবেই দেখছেন অনেকে!
জল্পনা শুরু হয়েছে, তা হলে কি নন্দীগ্রামের যুদ্ধের দ্বিতীয় পর্ব ভবানীপুরে হবে? স্বয়ং বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অবশ্য তাতে আপাতত জল ঢালছেন। তাঁর বক্তব্য, ভবানীপুরের পরিস্থিতির নিরিখে বিজেপি জেতার জায়গায় আছে, তিনি এই কথাই বলেছেন। নিজে প্রার্থী হয়ে দাঁড়াবেন, এমন কিছু বলেননি। অন্য দিকে, গুজরাতি ডান্ডিয়া থেকে পঞ্জাবি ভাঙড়া— ‘দোলযাত্রা এবং হোলির মিলন উৎসবে’ সব সম্প্রদায়ের উপস্থিতিতে নাচে পা মিলিয়ে বুধবার ভবানীপুরকে বার্তা দিতে চেয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতাও।
বিধানসভা থেকে বিরোধী দলনেতা-সহ পাঁচ বিধায়ককে নিলম্বিত করার প্রতিবাদে এ দিন বাইরে বিক্ষোভ চলছিল বিজেপির। বিধানসভার ভিতরে বিরোধী দলনেতা শুভেন্দুর নাম না-করে তাঁকে আক্রমণ করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। এমনকি, দলবদলের কথা তুলেও শুভেন্দুকে খোঁচা দিয়ে বলেছিলেন, ‘‘কংগ্রেস ছেড়ে তৃণমূলে এসেছেন। তৃণমূলকে ঘেঁটে দিয়ে বিজেপিতে গিয়েছেন। এ বার কি লাল জামা গায়ে তুলবেন?’’ বাইরের বিক্ষোভে এর জবাব দিতে গিয়ে শুভেন্দু বলেছেন, ‘‘আসলে ২০২১ সালে নন্দীগ্রামে ১৯৫৬ ভোটে আমার কাছে হারের কথা এখনও ভুলতে পারেননি উনি। তাই এ সব কথা বলছেন!’’ তাঁর আরও দাবি, ‘‘ভবানীপুরেও ওঁকে হারাব। আরও পাঁচ বছর হারের জ্বালা বয়ে বেড়াতে হবে!’’
বিরোধী দলনেতার এমন দাবি সংক্রান্ত প্রশ্নেই দিল্লিতে বসে বিজেপির রাজ্য সভাপতি সুকান্ত বলেছেন, ‘‘উনি (শুভেন্দু) যদি ভবানীপুর থেকে লড়ার প্রস্তাব দেন, দল সাদরে গ্রহণ করবে। আমার বিশ্বাস, শুভেন্দুবাবু ভবানীপুরে প্রার্থী হলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হারবেন। নন্দীগ্রামের থেকে বড় ব্যবধানেই শুভেন্দুবাবু তাঁকে হারাবেন।’’ যদিও তৃণমূলের এক নেতার কটাক্ষ, ‘‘ভবানীপুরে শুভেন্দুর দাঁড়ালে তাঁর পরাজয় নিশ্চিত। হারলে রাজ্য রাজনীতিতে আরও গুরুত্ব হারাবেন শুভেন্দু। আর সুকান্ত তা-ই চান!’’
দোল উপলক্ষে কলকাতায় বিজেপির পুর-প্রতিনিধি মীনা দেবী পুরোহিতের আয়োজিত মিলন উৎসবে সন্ধ্যায় উপস্থিত ছিলেন শুভেন্দু। সেখানে ছিলেন বিজেপি নেতা তাপস রায়, উত্তর কলকাতা সাংগঠনিক জেলার সভাপতি তমোঘ্ন ঘোষ প্রমুখও। সেখানেও ফের এক বার ওঠে ভবানীপুর থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধে শুভেন্দুর প্রার্থী হওয়ার প্রসঙ্গ। সেখানেই শুভেন্দুর ব্যাখ্যা, ‘‘ বিজেপি জাতীয় দল। কে কোথা থেকে প্রার্থী হবেন, সেটা প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে সংসদীয় বোর্ড ঠিক করে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘নন্দীগ্রামে ৪৬% হিন্দু ভোট থাকা সত্ত্বেও আমি জিতেছি। ভবানীপুরে ৮০% সনাতনী ভোট। ওখানে এমন অনেক মানুষ আছেন, যাঁরা জাতীয়তাবাদী, রাষ্ট্রবাদী। ওখানে আমার দাঁড়ানোর প্রয়োজন হবে না। যে দাঁড়াবেন, তিনিই জিতবেন!’’
ধনধান্যে প্রেক্ষাগৃহে ‘মিলন উৎসবে’ আবার বিশেষ তৎপরতা দেখা গিয়েছে কলকাতার ৭০ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল পুর-প্রতিনিধি অসীম বসুর গতিবিধিতে। ঘটনাচক্রে, সেই ওয়ার্ডটি ভবানীপুরের মধ্যে। সেই এলাকায় গুজরাতি এবং শিখ সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করেন উল্লেখযোগ্য সংখ্যায়। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিলেন তাঁরা। আগামী ভোটে মমতার জয় নিয়ে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি এবং উত্তরবঙ্গ চেম্বার অব কমার্সের প্রতিনিধিরা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন। গুজরাতি এডুকেশন সোসাইটির তরফে মীরজ শাহ বলেন, “সকলের জীবনে রং ভরে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। আমাদের গোটা বছরই দোল-হোলি।” আর মমতা বলেছেন, “সব সম্প্রদায়ের থেকে বন্ধুরা এসেছেন। এ বার দোল-হোলি একই দিনে। রমজানও এ মাসেই। সবাই মিলেমিশে থাকুন। অন্য কেউ কিছু বললে কান দেবেন না।’’
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)