উদ্যোগী হয়েছিলেন স্বয়ং রাষ্ট্রপতি। ফলে তৎপর হয়ে প্রকল্প ঘোষণা করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। ১৪০ কোটির দেশে যে সব জনগোষ্ঠী কয়েক হাজার বা লাখখানেক জনসংখ্যায় সীমাবদ্ধ, তাদের পাশে দাঁড়াতে ‘পিএম জনমন’ প্রকল্প ২০২৩-’২৪ অর্থবর্ষ থেকেই চালু হয়ে গিয়েছে। ওই প্রকল্পে ক্ষুদ্র বা বিপন্ন জনগোষ্ঠীর প্রত্যন্ত বা দুর্গম গ্রামগুলিকে সব রকমের বুনিয়াদি সুযোগসুবিধায় সাজিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত রয়েছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের কোথাও এখনও কার্যকর হয়নি ‘পিএম জনমন’। পুরুলিয়ার বিজেপি সাংসদের প্রশ্নের উত্তরে সংসদে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার।
কেন্দ্রের উত্তর পেয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে তোপ দাগতে শুরু করেছে বিজেপি। পাল্টা জবাবে রাজ্যের মন্ত্রী বলছেন, ‘‘যা করার মুখ্যমন্ত্রী নিজেই করছেন। রাজ্যের জনজাতির উন্নয়নের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকার কেন্দ্রের মুখাপেক্ষী নয়।’’
প্রকল্পের পুরো নাম ‘প্রধানমন্ত্রী জনজাতি আদিবাসী ন্যায় মহা অভিযান’। সংক্ষেপে ‘পিএম জনমন’। ওই প্রকল্প চালুর নেপথ্যে একটি সংক্ষিপ্ত ঘটনাক্রম রয়েছে। নয়াদিল্লির রাইসিনা হিল্সে রাষ্ট্রপতি ভবনে এক কর্মসূচিতে হাজির ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু তাঁর সঙ্গে দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন জনজাতির উন্নয়নের বিষয় নিয়ে আলোচনা করছিলেন। নয়াদিল্লির একটি সূত্রের দাবি, জনজাতি সমাজের জন্য মোদী সরকারের নানা প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রপতি সন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু পাশাপাশিই উল্লেখ করেছিলেন এমন কিছু জনগোষ্ঠীর কথা, বিশেষ সরকারি উদ্যোগ না নেওয়া হলে যারা কালক্রমে লুপ্ত হয়ে যেতে পারে। কারণ, পৃথিবীর সর্বোচ্চ জনসংখ্যার দেশে সে সব জনগোষ্ঠীর কোনওটির জনসংখ্যা খুব জোর লাখখানেক, কোনওটির মেরেকেটে হাজারখানেক। ওই সব জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ উদ্যোগ নিতে প্রধানমন্ত্রীকে সে দিন অনুরোধ করেন রাষ্ট্রপতি। তার পরে ২০২৩ সাল থেকেই চালু হয়ে যায় ‘পিএম জনমন’ প্রকল্প।
আরও পড়ুন:
ওই প্রকল্পের আওতায় বেশ কিছু জনগোষ্ঠীকে ‘বিশেষ ভাবে বিপন্ন জনজাতি গোষ্ঠী’ হিসেবে চিহ্নিত করে কেন্দ্রীয় সরকার। ওই সব জনগোষ্ঠী সাধারণত কোনও গ্রাম বা মহল্লায় দল বেঁধে বাস করে। তাই প্রত্যেক পরিবারের পাশাপাশি ওই সব গ্রাম বা মহল্লার সামগ্রিক পরিকাঠামো উন্নয়নের বন্দোবস্তও রাখা হয়েছিল ওই প্রকল্পে। প্রত্যেক পরিবারের জন্য পাকা বাড়ি, পাকা শৌচালয়, গ্রামে পাকা রাস্তা, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, সমগ্র শিক্ষার আওতায় ছাত্রাবাস ইত্যাদি তৈরির ব্যবস্থা হয় ‘পিএম জনমন’ প্রকল্পে। রাজ্য সরকারকে কোনও খরচ করতে হয় না। ১০০ শতাংশ খরচই করে কেন্দ্রীয় সরকার।
বিরহর, রাভা এবং টোটো— পশ্চিমবঙ্গে এই তিন জনগোষ্ঠী ‘বিশেষ ভাবে বিপন্ন জনজাতি গোষ্ঠী’ হিসেবে চিহ্নিত। কেন্দ্রীয় জনজাতি বিষয়ক মন্ত্রক সংসদে যে তথ্য দিয়েছে, সেই অনুযায়ী বাংলায় এই তিন জনজাতির সম্মিলিত জনসংখ্যা ৬৭,৪৩১। তার মধ্যে টোটোরা সংখ্যায় সবচেয়ে কম। ১,৬০০-র কিছু বেশি। ওই জনগোষ্ঠী মাদারিহাটের টোটোপাড়া ছাড়া দেশের আর কোথাও নেই। বিরহর এবং লোধা মহল্লাও রাজ্যে পাওয়া যায় শুধু ঝাড়গ্রাম, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং পুরুলিয়ায়। কেন্দ্রীয় সরকার বৃহস্পতিবার লোকসভায় জানিয়েছে, দেশের অন্যান্য রাজ্য এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ‘পিএম জনমন’-এর কাজ চললেও পশ্চিমবঙ্গে কোথাও এখনও ওই প্রকল্প কার্যকর করা যায়নি। কেন্দ্র বার বার চাওয়া সত্ত্বেও পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘পিএম জনমন’ কার্যকর করার কোনও প্রস্তাব পাঠায়নি বলে জনজাতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দুর্গাদাস উইকে লোকসভায় জানিয়েছেন।
যাঁর প্রশ্নের উত্তরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ওই তথ্য লোকসভায় পেশ করেছেন, পুরুলিয়ার সেই বিজেপি সাংসদ জ্যোতির্ময় মাহাতো সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে দায়ী করেছেন। তাঁর কথায়, ‘‘বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শুধুমাত্র নিজের রাজনৈতিক স্বার্থ নিয়ে চিন্তিত। বিপন্ন জনজাতির স্বার্থ তাঁর কাছে গৌণ। এই প্রকল্পে যে হেতু ১০০ শতাংশ টাকা কেন্দ্র দিচ্ছে, সে হেতু মুখ্যমন্ত্রী কোনও কৃতিত্ব পাবেন না। তাই বিপন্ন জনজাতি আরও বিপন্ন হলেও মুখ্যমন্ত্রী ওই প্রকল্প এখানে কার্যকর হতে দেবেন না।’’
বিজেপি সাংসদের মন্তব্যকে অবশ্য গুরুত্ব দিচ্ছেন না রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ ও জনজাতি উন্নয়ন মন্ত্রী বুলু চিক বরাইক। এই সব জনগোষ্ঠীর জন্য রাজ্য সরকার অনেক আগে থেকেই কাজ শুরু করেছে বলে তাঁর দাবি। বরাইকের কথায়, ‘‘মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশে আমাদের দফতর আদিবাসী উন্নয়নের প্রতিটি ক্ষেত্রে কাজ করছে। যে টোটো, লোধা এবং বিরহরদের কথা বলা হচ্ছে, তাদের নিয়েও আলাদা করে আমরা কাজ করছি।’’ কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বিরোধিতা করে কোনও মন্তব্য অবশ্য রাজ্যের মন্ত্রী করেননি। তাঁর কথায়, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকারের প্রকল্প নিয়ে যে সব অভিযোগ করা হচ্ছে, তা নিয়ে আমি বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়ার আগে কিছু বলতে পারব না। তবে এটুকু বলতে পারি, পশ্চিমবঙ্গের আদিবাসী সমাজের উন্নয়নের জন্য আমরা কেন্দ্রীয় সরকারের মুখাপেক্ষী হয়ে বসে নেই।’’