উদ্বাস্তুদের সমস্যা নিয়ে পুরনো আন্দোলন এবং সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার দাবি নিয়ে রাস্তায় থাকা, এই জোড়া কৌশলেই উত্তরবঙ্গে হারানো জমি উদ্ধারের চেষ্টায় নামছে সিপিএম। দলের অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে, তৃণমূল কংগ্রেসের পাশাপাশি পরিচিতি সত্তার রাজনীতির জেরে বিজেপির কাছে উত্তরে জমি হারাতে হয়েছে তাদের। তবে সাম্প্রতিক কালে উত্তরবঙ্গে বিজেপির সাংগঠনিক দাপট কিছুটা কমছে বলে আন্দাজ করে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের আগে নিজেদের কর্মী-সমর্থকদের মরিয়া হয়ে মাঠে নামার বার্তা দিচ্ছেন সিপিএম নেতৃত্ব।
‘বেকারত্ব-বিরোধী দিবস’ উপলক্ষে আজ, শুক্রবার ‘উত্তরকন্যা অভিযানে’র ডাক দিয়েছে সিপিএমের যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআই। উত্তরবঙ্গের জেলাগুলি থেকে ভাল জমায়েত এনে শক্তি প্রদর্শন করতে চান মীনাক্ষী মুখোপাধ্যায়েরা। তার আগের দিন, বৃহস্পতিবার কোচবিহারে উত্তরবঙ্গের চার জেলার নেতাদের নিয়ে সাংগঠনিক বৈঠকে বসেছিলেন সিপিএম নেতৃত্ব। কোচবিহার, দার্জিলিং, জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলার নেতাদের সঙ্গে আলোচনায় ছিলেন সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্বের তরফে সুজন চক্রবর্তী, সুমিত দে-রা। সাম্প্রতিক কালে এমন বৈঠক এই প্রথম। সূত্রের খবর, উত্তরবঙ্গে সংগঠনের হাল নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি আন্দোলন, কর্মসূচি বাড়ানোর কথা হয়েছে। বিজেপি যত ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টা করবে এবং তৃণমূল কংগ্রেস তাতে মদত দেবে, তার বিপরীতে জীবন-জীবিকার সমস্যার কথা বলে পাল্টা সরব হওয়ার বার্তা দিয়েছেন সিপিএম নেতৃত্ব। বৈঠকের পরে সম্মিলিত কেন্দ্রীয় বাস্তুহারা পরিষদের (ইউসিআরসি) ৭৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আলোচনা-সভা এবং ব্রিগেড সমাবেশকে ‘সফল’ করার ডাক দিয়ে মিছিলও হয়েছে।
দলের শ্রেণি অভিমুখ ঠিক রেখে এ বার ২০ এপ্রিলের ব্রিগেড সমাবেশে শ্রমজীবী মানুষকে জড়ো করতে চাইছে সিপিএম। দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজনের কথায়, ‘‘ব্রিগেডের ডাক দিয়েছে সিটু, কৃষক সভা, খেতমজুর ইউনিয়ন ও বস্তি উন্নয়ন সমিতি। গরিব, বিপন্ন মানুষ, শ্রমজীবী ও কৃষকেরা সেখানে আসবেন। আমরা মনে করি, রাজ্যের যে কোনও মানুষ যাঁরা অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে, শ্রমজীবীদের পাশে তাঁদের দাঁড়ানো জরুরি।’’ তাঁর দাবি, ‘‘আগামী বছর জানুয়ারি মাসে ব্রিগেড হলে বলা হত নির্বাচনের জন্য হচ্ছে। এই ব্রিগেড সমাবেশের সঙ্গে ভোটের সম্পর্ক নেই। জীবন-জীবিকা বাঁচানোর জন্য এই আহ্বান।’’
তারই পাশাপাশি উদ্বাস্তু পরিষদের আলোচনা-সভায় উঠে এসেছে, উদ্বাস্তুরা আকাশ থেকে আসেননি। দেশ ভাগের সময়ে যাঁরা বাস্তুহারা হয়েছিলেন, বাংলার সেই পরিবারগুলিকে নিয়ে ছিনিমিনি করা হয়েছে। তৎকালীন দিল্লির সরকার তাদের যথাযথ দায়িত্ব পালন করেনি। সেই সময়ে বামেরা এই মানুষদের সংগঠিত করে উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। রাজ্যে বামফ্রন্ট সরকার আসার পরে তাঁরা নিঃশর্ত দলিল পেয়েছিলেন। এখন কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার উদ্বাস্তু পুনর্বাসন দফতর তুলে দিয়েছে। বামেদের দায়িত্ব স্মরণ করিয়ে সুজন বলেছেন, ‘‘সংখ্যাগুরু হলেই সংখ্যালঘুর উপরে দাপট দেখানোর বরাত পেয়ে যাবে, এই মনোভাব কখনওই ঠিক নয়। আসল সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেন শ্রমজীবী মানুষ। যে দু-চার জন দেশটাকে ভাগ করতে চায়, তারা সংখ্যালঘু। শ্রমজীবী, গরিব মানুষের ঐক্যকে সুদৃঢ় করতে হবে।’
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)