এক কৃষকের খামারবাড়ির পেছনে তৈরি হয়েছে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র। তবে সেখানে যেতে গেলে দুর্ভোগ পোহাতে হয়। তাই স্থানীয়দের অনুরোধে ওই কৃষক পরিবার নিজেদের খামারবাড়ির জমির চার ফুট জায়গা ছেড়ে দিয়েছিলেন রাস্তা নির্মাণের জন্য। তবে তাতে খুশি নন ওই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের সহায়িকার স্বামী তথা স্থানীয় তৃণমূল নেতা। উঠছে দাদাগিরিরও অভিযোগ। ওই নেতার দাবি, যাতায়াতের সুবিধার জন্য সাত ফুট জায়গা ছাড়তে হবে। কৃষক পরিবারের জমির বেশ কিছু অঞ্চল বাঁশের কাঠামো দিয়ে ঘেরাওয়ের অভিযোগ তাঁর বিরুদ্ধে। আরও অভিযোগ, নিজেদের জমি থেকে সেই কাঠামো সরাতে গেলে জমির মালিকের বাড়িতে দলবল নিয়ে গিয়ে হুমকি দেন ওই নেতা। পূর্ব বর্ধমানের ভাতারের ঘটনা। যদিও তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ভাতার থানার মাহাচান্দা গ্রামপঞ্চায়েতের আড়া গ্রামের বাসিন্দা রথীন ভট্টাচার্য ও রমেন ভট্টাচার্য। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, তাঁর খামারবাড়ির পিছনে ছয় বছর আগে সরকারি খাসজমিতে ৩২৯ নম্বর অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের ঘর তৈরি হয়েছিল কিন্তু ওই কেন্দ্রে যাতায়াতের জন্য তেমন রাস্তা ছিল না। রাস্তার পাশেই খামারবাড়ি ভট্টাচার্য পরিবারের। অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে সকলের যাতায়াতের জন্য তাই নিজেদের জমির চার ফুট ছেড়েছিলেন ভট্টাচার্য পরিবারের সদস্যেরা। ওই খামারবাড়িতে তাঁদের তিনটি ও দু’টি হারভেস্টর মেশিন থাকে। সেই খামারবাড়ির প্রবেশ পথেই বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড করে ঘেরাও করেছেন তৃণমূল নেতা কৃষ্ণগোপাল মণ্ডল। ফলে প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে নিজেদের জমিতেই যেতে পারছেন না ভট্টাচার্য পরিবারের সদস্যেরা। ওই নেতার দাবি, সকলের যাতায়াতের সুবিধার জন্য সাতফুট জমি দিতেই হবে। নিজেদের জমি থেকে সেই বাঁশের কাঠামো সরাতে গেলে নিজের অনুগামীদের নিয়ে গিয়ে ওই কৃষক পরিবারের বাড়িতে চড়াও হয়ে হমকি দেন তৃণমূল নেতা।
রথীন বলেন, ‘‘গ্রামের পঞ্চায়েত সদস্য ও দলের কর্মীরা আমাদের জানিয়েছিলেন, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের সামনে যাতায়াতের রাস্তা না থাকার কথা। সর্বসাধারণের স্বার্থে নিজেদের জমির কিছুটা অংশ ছেড়ে দিয়ে চার ফুট চওড়া রাস্তা তৈরি করার অনুমতি দিয়েছি। গত বছর ডিসেম্বর মাসে পঞ্চভদ্রের সামনে সাদা কাগজে লিখিত ভাবে ওই জায়গা ছেড়ে দিতে রাজি হয়েছিলাম। তবে ওই অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের সহায়িকার স্বামী কৃষ্ণগোপাল আমাদের উপর চাপ সৃষ্টি করছিলেন সাত ফুট চওড়া রাস্তার জন্য জায়গা ছাড়তে হবে। এ ছাড়া রাস্তার জন্য কুড়ি বস্তা সিমেন্ট দিতে হবে। পাশাপাশি দায়িত্ব নিয়ে রাস্তাও তৈরি করে দিতে হবে। এই শর্ত না মানার কারণে আমাদের খামারবাড়ির দুটি গেট বাঁশের ব্যারিকেড করে দু’সপ্তাহ ধরে কৃষ্ণগোপাল বন্ধ করে রেখেছে। খামারবাড়ির কাছাকাছি গেলেই মারধর করতে আসছে। বিষয়টি পার্টির ব্লক নেতৃত্বকে জানিয়েছিলাম। তাঁদের অনুমতি নিয়ে বাঁশ সরিয়ে খামারে ঢোকার চেষ্টা করলে কৃষ্ণগোপাল বাড়িতে লোকজন নিয়ে চড়াও হয়।’’
রথীনবাবুর স্ত্রী সায়নীদেবী অন্তঃসত্ত্বা। তিনি বলেন, ‘‘গত শনিবার রাতে কৃষ্ণগোপাল বেশ কিছু লোকজন নিয়ে আমাদের বাড়িতে চড়াও হয়ে ভাঙচুর করেছে। আমার স্বামী ও দেওরের পাশাপাশি আমাকেও চূড়ান্ত হেনস্তা করেছে। আমরা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি।’’ ভট্টাচার্য পরিবারের পক্ষ থেকে বাড়িতে ভাঙচুর চালানোর অভিযোগও তোলা হয়েছে।
ভাঙচুর ও হামলার অভিযোগ মানতে চাননি অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা। তবে তিনি খামারবাড়ির গেট অবরূদ্ধ করে রাখার কথা স্বীকার করে নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘‘অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের রাস্তা ওরা আটকে রেখেছে। এই সমস্যা নিয়ে ওই পরিবারকে বারবার আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসার কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু ওরা রাজি হচ্ছে না। আলোচনায় বসে মিটিয়ে নিলেই বাঁশের ব্যারিকেড তুলে দিয়ে গেট খুলে দেওয়া হবে।’’
ঘটনা প্রসঙ্গে স্থানীয় বিজেপি নেতা সৌমেন কার্ফা বলেন, ‘‘শাসকদলের গোষ্ঠী কোন্দলের শিকার ভট্টাচার্য পরিবার। বিধায়ক গোষ্ঠীর লোকজন চড়াও হয়ে এসব করছে। তৃণমূল আসলে টাকা ছাড়া চলে না। তাই এই সব বেপরোয়া নেতারা পার পেয়ে যায়। প্রশাসনের কাছে দাবি জানাচ্ছি অবিলম্বে ব্যবস্থা নিয়ে সঠিক বিচারের।’’
তৃণমূল কংগ্রেসের মাহাচান্দা অঞ্চল সভাপতি সুরজিৎ হালদারের বক্তব্য, ‘‘বাঁশ দিয়ে খামারবাড়ির গেট আটকে রাখার বিষয়টি নিয়ে আমার কিছু জানা নেই। তবে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রের রাস্তার সমস্যার বিষয়টি নিয়ে আমরা আলোচনায় বসব বলে ঠিক হয়েছে। ব্লক নেতৃত্ব বিষয়টি দেখছেন।’’
জেলা তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র প্রসেনজিৎ দাস অবশ্য বলেন, ‘‘বাঁশ দিয়ে ঘেরা ঠিক হয়নি। কোনও বেনিয়ম হলে প্রশাসন আছে। সুতরাং প্রশাসনের উপর ভরসা করতে হবে। তবে শুনেছি স্থানীয় দলীয় নেতৃত্ব বিষয়টি নিয়ে বসে তা মিটমাট করবে।’’