Advertisement
E-Paper

অনন্ত পথের যাত্রী

প্রতাপরুদ্রদেব এ বার যেন নেশা থেকে জেগে উঠলেন। রক্তবর্ণ চক্ষু মেলে বললেন, “তুমি কী বলতে চাইছ বিদ্যাধর?”

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

অবিন সেন

শেষ আপডেট: ৩০ মার্চ ২০২৫ ০৯:৩৫
Share
Save

পূর্বানুবৃত্তি: সাঁতরে পরিখা পার হওয়ার পর নৃসিংহর সামনে পড়ল একটি দেড় মানুষ উঁচু পাঁচিল। সেটি পেরিয়ে তিনি পৌঁছলেন রাজপ্রাসাদের পিছন দিকের উদ্যানের প্রান্তে। সেখানে রয়েছে একটি দেবালয়। সেখানে তাঁর সঙ্গে দেখা হল রাজকুমারী তুক্কা এবং তাঁর প্রিয়সখী শ্যামার সঙ্গে। রাজকুমারী শুকনো কাপড় দিয়ে ভিজে পোশাক বদল করে নিতে বললেন নৃসিংহকে। এর পর তাঁরা দীর্ঘ সময় কাটালেন পরস্পরের সঙ্গে। তাঁদের ব্যবহারে পরস্পরের প্রতি অনুরাগের আভাস। রাত নেমে এলে শ্যামা তাঁদের সম্বিৎ ফেরাল। সে নৃসিংহকে গোপন সুড়ঙ্গপথে পৌঁছে দিয়ে এল পরিখার ধারে। সেখানে অপেক্ষারত ঘোড়ার পিঠে উঠতে উঠতে নৃসিংহ দেখলেন ঝোপঝাড়ের মধ্যে দিয়ে কেউ দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে। কেউ হয়তো গোপনে তার উপর নজর রাখছিল। অন্য দিকে, নানা রাজনৈতিক টানাপড়েনে ক্লান্ত বোধ করছেন মহারাজ প্রতাপ রুদ্রদেব। তিনি এক দিন সার্বভৌম ভট্টাচার্যকে ডেকে খোঁজখবর করলেন নদিয়া থেকে আসা সেই আশ্চর্য সন্ন্যাসীর। সার্বভৌম জানালেন মহাপ্রভু আবার ফিরবেন নীলাচলে। মহারাজকে অনুরোধ করলেন মহাপ্রভুর থাকার ব্যবস্থা করে দিতে। মহারাজ রাজপণ্ডিত কাশী মিশ্রের বাড়িতে সেই সন্ন্যাসীর থাকার ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিলেন। তিনি নিজেও কৌতূহলী এই আশ্চর্য সন্ন্যাসীর সঙ্গে সাক্ষাত করতে। সার্বভৌম ভট্টাচার্য চলে যাওয়ার পর প্রহরী খবর দিল, প্রধান সেনাপতি গোবিন্দ বিদ্যাধর মহারাজের সাক্ষাৎপ্রার্থী।

মহারাজকে এই অবস্থায় দেখে গোবিন্দ বিদ্যাধরের মুখে ভাঙা চাঁদের মতো বাঁকা একটা হাসির আভাস খেলে গেল।

তিনি গলার ভিতরে একটি শব্দকে কিয়ৎক্ষণ লালিত করে হঠাৎ তাকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দেওয়ার মতো করে বললেন, “মহারাজের জয় হোক।”

নেশাতুর মহারাজ স্বভাবতই তাঁর প্রধান সেনাপতির এই শ্লেষ বুঝতে পারেননি। তিনি অতি কষ্টে নিমীলিত আঁখি মেলে বললেন, “কী বলতে এসেছ বিদ্যাধর, তাই বলো। বলে এখন যাও। দেখতেই পাচ্ছ এখন আমার বিশ্রামের সময়,” তাঁর গলায় গভীর বিরক্তি।

বিদ্যাধর মনে মনে এক মুহূর্ত ভাবলেন, এই সময়ে মহারাজকে কথাটা বলা কি ঠিক হবে? তার পরেই ভাবলেন, ‘এখনই বলার ঠিক সময়! চিন্তায় ডুবে থাকা মহারাজের মাথায় আরও একটু চিন্তার বোঝা চাপানো যাক।’

তার পর দু’-এক বার গলা পরিষ্কার করে বিদ্যাধর শুরু করলেন, “বলছিলাম মহারাজ, দক্ষিণের প্রদেশপাল মনে হয় ঠিকমতো শাসনকার্য চালাচ্ছেন না। তার উপরে লাগাতার যুদ্ধ।”

প্রতাপরুদ্রদেব এ বার যেন নেশা থেকে জেগে উঠলেন। রক্তবর্ণ চক্ষু মেলে বললেন, “তুমি কী বলতে চাইছ বিদ্যাধর?”

“আমি নতুন করে কিছুই বলতে চাইছি না মহারাজ। আপনি সবই অবগত আছেন। আর এক বার স্মরণ করিয়ে দিতে চাইছি মাত্র। রায় রামানন্দের রাজকার্যে তেমন মন নেই মহারাজ। তিনি শাস্ত্রচর্চা নিয়েই অধিক ব্যস্ত। তার উপরে ভেবে দেখুন, এই বৎসর বর্ষা ভাল না হওয়ায় ফসলের ক্ষতি হয়েছে। তার উপর যুদ্ধের জন্য নতুন কর বসেছে। দক্ষিণের প্রজারা এই নিয়ে বেশ বিক্ষুব্ধ। কিন্তু সে বিষয়ে প্রদেশপাল একেবারেই উদাসীন,” গোবিন্দ বিদ্যাধর একটানা বলে থামলেন।

মহারাজা বিরক্ত হলেন। তিক্ত কণ্ঠে তিনি বললেন, “তোমার মনোভাব স্পষ্ট করো বিদ্যাধর।”

বিদ্যাধর একটু ইতস্তত করলেন। তার পরই বেপরোয়া গলায় বললেন, “এখন দক্ষিণের প্রদেশপাল হিসেবে তরুণ কোনও শাসকের প্রয়োজন। এই ব্যাপারে আপনার ভ্রাতুষ্পুত্র বজ্রদেব যথেষ্ট উপযুক্ত। উনি বীর। বিবেচক। স্থিতধী।”

মহারাজা প্রতাপরুদ্রদেব স্থির দৃষ্টিতে বিদ্যাধরের দিকে তাকালেন। তাঁর মাথা থেকে সুরার সমস্ত আবেশ বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “আমার ভ্রাতুষ্পুত্রকে আমি তোমার চেয়ে ভাল করে চিনি বিদ্যাধর। এই বিষয়ে তুমি আর মাথা না ঘামালেই আমি খুশি হব।”

বিদ্যাধরের দুই চক্ষু মুহূর্তে অঙ্গারের মতো জ্বলে উঠল। তবে সে কেবল মুহূর্তের জন্যই। তিনি ভাল করেই জানেন, কখন সংযত হতে হয়। শান্ত গলায় তিনি মহারাজকে বললেন, “যথা আজ্ঞা মহারাজ।”

তার পরই একটু দায়সারা গোছের নমস্কার জানিয়ে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।

১৩

সে এক উৎসবের সূচনা যেন। জগন্নাথের স্নানযাত্রার তখনও কয়েক দিন দেরি আছে। তার পূর্বেই নীলাচলে মনুষ্যবেশে স্বয়ং ভগবান যেন নেমে এসেছেন লীলা রচনায়। ভোরের বাতাস যেন আরও বেশি খুশি হয়ে উঠল। কমলা রঙের রোদে লাগল যেন আরও বেশি সোনা রঙের ঐশ্বর্য। সমুদ্র থেকে যে বাতাস বয়ে এল, তাতে যেন মিশে গেল পারিজাতের স্বর্গীয় সুবাস।

পণ্ডিতচূড়ামণি সার্বভৌম ভট্টাচার্য যে কী ভাবে তাঁর প্রণাম নিবেদন করবেন, তা ভেবে পেলেন না। তিনি সবে সমুদ্রস্নান সেরে জগন্নাথ মন্দির হয়ে নিজগৃহে ফিরছিলেন। সহসা গৃহের সন্নিকটে উপস্থিত হয়ে অনুভব করলেন, দিনের আলোয় যেন ঐশ্বরিক বিভা। গৃহের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন সেই আশ্চর্য দীর্ঘ মানুষটি।

দিগ্বিদিকজ্ঞানশূন্য হয়ে তিনি দৌড়ে গিয়ে লুটিয়ে পড়লেন মহাপ্রভুর পায়ের নিকটে। মহাপ্রভু সেই ভুবনজয়ী হাসি হেসে জোর করে সার্বভৌমকে বুকে তুলে নিলেন, দক্ষিণ হস্ত তুলে বরাভয় দান করলেন। সার্বভৌমের বুকের ভিতর যেন বিদ্যুতের স্পর্শ খেলে গেল। মহাসমাদরে তিনি মহাপ্রভুকে গৃহের ভিতরে নিয়ে গেলেন।

মহাপ্রভু নীলাচলে ফিরে এসেছেন, এই সংবাদ ছড়িয়ে পড়তে সময় লাগল না। সকলে মহা আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন, কখন তাঁরা মহাপ্রভুর দর্শন পাবেন। পরদিন ভক্তদের দর্শন দিয়ে মহাপ্রভু জগন্নাথ দর্শনে গেলেন। সমুদ্রস্নানের পরে জগন্নাথদেবের সামনে গিয়ে মহাপ্রভু ভাবাকুল হয়ে পড়লেন। সকলে মিলে তাঁকে ঘিরে শুরু করলেন অপূর্ব কীর্তন। এ যেন ঈশ্বরের সামনে আর এক ঈশ্বরের উৎসবের জোয়ার। সেই ভক্তিরসধারায় সেখানে উপস্থিত সকলে প্লাবিত হয়ে গেলেন।

তার পর সার্বভৌম ভট্টাচার্য মহাপ্রভুকে নিয়ে গেলেন রাজগুরু কাশী মিশ্রের গৃহে। মহাপ্রভুর ভিতরে তিনি যেন এক দিব্যপুরুষকে দেখতে পেলেন। সাষ্টাঙ্গে তিনি প্রভুর চরণে লুটিয়ে পড়ে আত্ম বিত্ত সকল নিবেদন করলেন প্রভুর চরণে। প্রভু যেন ভাবের আবেশে সব কিছু আত্মগত করে কাশী মিশ্রকে ভূমি থেকে তুলে বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

কাশী মিশ্রের গৃহ দেখে মহাপ্রভু অশেষ প্রীত হলেন। সেখানে আসন গ্রহণ করে তিনি নিত্যানন্দ-সহ সকল ভক্তদের কুশল-সংবাদ জিজ্ঞাসা করলেন।

কাশী মিশ্র জোড়হাত করে নিবেদন করলেন, “মহাপ্রভু, এই গৃহে অধিষ্ঠান করে আমাদের কৃপা করুন। আজ থেকে এই গৃহ আপনার।”

মহাপ্রভু স্মিত মুখে বললেন, “আমি এক ক্ষুদ্র সন্ন্যাসী। সন্ন্যাসীর বিত্তে কী কাজ! এই দেহ তোমাদের সবার। তোমরা যা করো, সে
কর্তব্য আমার।”

মহাপ্রভুর ভাষ্য শুনে, সার্বভৌম-সহ উপস্থিত সকল ভক্ত অশেষ আহ্লাদিত হলেন। সার্বভৌম মহাপ্রভুর পাশে বসে একে একে সকল ভক্তের সঙ্গে মহাপ্রভুর পরিচয় করিয়ে দিতে লাগলেন। বললেন, “নীলাচলের ভক্তগণ চাতকের মতো আপনার দর্শনের অপেক্ষায় উৎকণ্ঠিত হয়ে ছিলেন।”

একে একে এগিয়ে এসে মহাপ্রভুর চরণে প্রণাম জানালেন, জগন্নাথ সেবক জনার্দন, কৃষ্ণদাস, শিখী মাহাতি, বৈষ্ণব প্রধান প্রদ্যুম্ন মিশ্র প্রমুখ।

সেই সময়ে সেখানে এসে উপস্থিত হলেন চার পুত্র-সহ ভবানন্দ রায়, রায় রামানন্দের পিতা। তাঁদের দেখে মহাপ্রভু যারপরনাই আনন্দিত হলেন। মহাপ্রভু জানালেন, শীঘ্রই রামানন্দ এখানে এসে উপস্থিত হবেন।

মধ্যাহ্নভোজন করে মহাপ্রভু তাঁর প্রিয় চার সখা, নিত্যানন্দ, জগদানন্দ, মুকুন্দ, দামোদরকে বললেন, “গৌড়ে এক জনকে পাঠিয়ে মাতাকে আমার নীলাচলে ফিরে আসার সংবাদ জানাতে চাই। গৌড়ের সমস্ত ভক্তগণের দর্শনের জন্য আমার মন আনচান করছে।”

নিত্যানন্দ ঈষৎ চিন্তা করে বললেন, “আমি বরং কৃষ্ণদাসকে গৌড়ে পাঠাই।”

মহাপ্রভু সায় দিয়ে বললেন, “তোমার যেমন ভাল মনে হয়, তা-ই করো। মাতাকে সংবাদ দিতে আমার মন বড়ই উতলা হয়ে উঠেছে।”

কাশী মিশ্রের গৃহে, নিভৃত এক কক্ষে মহাপ্রভু অধিষ্ঠান শুরু করলেন। গৃহের এই অংশে কোলাহল নেই। মানুষের কলরব নেই। শুধু মাঝে মাঝে এক ঝাঁক পাখি কোন নন্দনকানন থেকে উড়ে এসে গান শুনিয়ে যায়। একটি ক্ষুদ্র অলিন্দ দিয়ে মূল মন্দিরের চূড়া দেখা যায়। মহাপ্রভু সেই দিকে তাকিয়ে আত্মবিস্মৃত হয়ে যান। কৃষ্ণপ্রেমে ভাবে বিভোর হয়ে পড়েন। সর্বক্ষণের সেবক স্বরূপ দামোদর দিবারাত্র বিদ্যাপতি, চণ্ডীদাস, গীতগোবিন্দ থেকে গীত গেয়ে প্রিয় প্রভুর আনন্দ বিধান করে। অপূর্ব তার সঙ্গীতে পারদর্শিতা। সে যখন গান গায়, মনে হয় স্বর্গ থেকে গন্ধর্বরা নেমে এসে ভিড় করে দাঁড়িয়ে থাকে।

নগরের অন্য প্রান্তে নিভৃত এক কক্ষে ক্লান্ত শরীরে শুয়ে ছিলেন গোবিন্দ বিদ্যাধর। আজ আর কোনও সঙ্গীত, পায়েলের মূর্ছনা তাঁর ভাল লাগছে না। এই কিছু ক্ষণ আগে যে শারীরিক সংসর্গ হয়ে গেল, তাতেও শান্তি হল না তাঁর। এক শরীর থেকে আর এক শরীরে কিসের খোঁজ করেন তিনি? কিংবা কিছুই খোঁজেন না! শুধু শরীর থেকে শরীর, নানা শরীরের ভিতরে শরীর যাপন! পোশাকি দেহপসারিণীদের শরীরে তাঁর তেমন নেশা লাগে না আর। ফলে তাঁর ভোগের জন্য প্রান্তিক অন্ত্যজ শ্রেণির জনবসতি থেকে রমণীদের তুলে নিয়ে আসে তার অনুগত সেপাইরা। সেই সব আদিম রমণীর শরীর ছিঁড়েখুঁড়ে শান্তির অন্বেষণ করেন তিনি। কিন্তু শান্তি কি সত্যি খুঁজে পান? শরীরে তাঁর বড় দহন। সে দহন কেন কিছুতেই থামে না? সহসা তিনি চিৎকার করে উঠলেন।

পায়ের কাছে অবহেলায় পড়ে থাকা নারীটি হয়তো ক্লান্তিতে কিংবা ব্যথায় ঘুমিয়ে পড়েছিল। তাঁর সহসা চিৎকারে সে মুখের ভিতরে অস্পষ্ট এক ঘড়ঘড় শব্দ করে চিত হয়ে শোয়। মেয়েটির বয়স কতই বা হবে, সদ্যকৈশোরের ঘ্রাণ তার প্রস্ফুটিত শরীরে। গোবিন্দ বিদ্যাধর যেন একটু বিরক্ত হয়ে সেই কিশোরীটির দিকে তাকান। তার পর আবার চিৎকার করে প্রহরীকে ডাকেন। বাইরে দণ্ডায়মান প্রহরী দু’জন ঘরে এলে তিনি মেয়েটিকে যথাস্থানে রেখে আসার নির্দেশ দেন। তার পর জিজ্ঞেস করেন, “বটুক এসেছে?”

এক জন ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায়। অপর জন মেয়েটিকে পাঁজাকোলা করে বাইরে নিয়ে চলে যায়।

গোবিন্দ বিদ্যাধর পালঙ্কে আধশোয়া হয়ে বসেন। বটুকেশ্বরের দক্ষিণে যাওয়ার কথা ছিল আগেই। বিদ্যাধরই তাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন।

বটুকেশ্বর ঘরে ঢুকে অভিবাদন জানালে বিদ্যাধর বললেন, “নতুন কিছু খবর জানাতে চাও শুনলাম।”

“আজ্ঞে, সেনাপতি,” একটু থেমে সে আবার বলল, “দক্ষিণের রাজপাট ছেড়ে রায় রামানন্দ ফিরে আসছেন নীলাচলে।”

গোবিন্দ বিদ্যাধর অবাক হয়ে গেলেন। এই সংবাদ তাঁর কাছে অপ্রত্যাশিত। বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, “সে কী! এর কারণ?”

“নদের সেই সন্ন্যাসীর ডাকে তিনি রাজপাট ছেড়ে চলে আসছেন।”

“রাম রায় কি পাগল হয়ে গেল নাকি?”

“অনেকটা সেই রকমই, প্রভু। নদের সেই সন্ন্যাসী কয়েক দিন হল নীলাচলে ফিরে এসেছেন, আপনি শুনেছেন নিশ্চয়ই। সেই সন্ন্যাসীর আশ্চর্য ক্ষমতা। যে তাঁর দর্শন পাচ্ছে, সে ই তাঁর ভক্ত হয়ে পড়ছেন। এমনকি রাজগুরু কাশী মিশ্র পর্যন্ত তাঁর একান্ত অনুগত হয়ে পড়েছেন।”

বটুকেশ্বর লক্ষ করল, সেনাপতির চোখদুটো অঙ্গারের মতো জ্বলতে শুরু করেছে। কিন্তু মুখে তিনি কিছু বলছেন না।

বটুকেশ্বর একটু থেমে আবার শুরু করল, “শুনলাম, মহারাজের নির্দেশেই নাকি সেই সন্ন্যাসী কাশী মিশ্রের বাটীতে অধিষ্ঠান করছেন। সেখানেই থাকবেন। শুনেছি, মহারাজা স্বয়ং তাঁকে দর্শনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন।”

গোবিন্দ বিদ্যাধরের সারা শরীর দাউদাউ করে যেন জ্বলতে শুরু করে। তাঁর সমস্ত হিসাব তো গরমিল করে দিচ্ছে এই সন্ন্যাসী। তিনি শুনেছেন, সারা দিন সেই সন্ন্যাসী ছিঁচকাঁদুনের মতো চোখের জল ফেলে। আর রাজকর্মচারীরা কিনা তাঁরই অনুগত হয়ে পড়ছে! এ মোটেই ভাল লক্ষণ নয়। এই নিয়ে তাঁকে গভীর ভাবে ভাবতে হবে। আপাতত দূর থেকে লক্ষ করা ছাড়া উপায় নেই।

তাঁর মাথায় এখন ঘুরপাক খাচ্ছে, দক্ষিণের শাসনভার কার উপরে দিচ্ছেন মহারাজ? মহারাজ কি তাঁর প্রস্তাব ভেবে দেখবেন? আগামী কাল সকালেই তাঁকে এক বার মহারাজ প্রতাপরুদ্রদেবের সঙ্গে দেখা করতে হবে। মুখে বললেন, “শোনো বটুক, তুমি আরও কয়েক দিন পুরীতে থাকো। চোখ-কান খোলা রাখো। আর হ্যাঁ, রাজ-অন্তঃপুরের একেবারে ভিতরে তোমার কোনও চরকে কিঙ্করীর বেশে ঢুকিয়ে দাও।”

বটুকেশ্বরের ঠোঁটের কোণে শিকারি বিড়ালের মতো একটা হাসি খেলে গেল।

১৪

গজপতি মহারাজ প্রতাপরুদ্রদেব ইদানীং কনিষ্ঠা পত্নী ইলাদেবীর একটু অতিরিক্ত অনুগত হয়ে পড়েছিলেন। রানী শ্রীইলা উদ্ভিন্নযৌবনা, ছলাকলায় পটীয়সী। তাঁর গর্ভজাত রাজপুত্র কালুয়াদেব যেন মহারাজের নয়নের মণি। পুত্রটি সবে খেলাধূলা ছেড়ে গৃহপণ্ডিতের কাছে অধ্যয়ন শুরু করেছে। এই ক্ষুদ্র বয়সেই পুত্রের বুদ্ধি ও ধীশক্তি দেখে মহারাজা চমকিত। তাঁর মনের ভিতরে একটা সুপ্ত স্বপ্ন মাঝে মাঝে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। তিনি ভাবেন, এই পুত্রই এক দিন সমগ্র আর্যাবর্ত শাসন করবে।

এই বিষয়ে পুত্রের মাতা ইলাদেবীরও গর্বের সীমা নেই। ফলে, মহারাজের কাছে তাঁর নানাবিধ দাবি দিন দিন বাড়তেই থাকে। কিন্তু মহারাজের প্রধান মহিষী হিসাবে অন্তঃপুরের সমস্ত বিষয়ের প্রাধান্য এখনও মহারানি পদ্মাদেবীর হাতে। তাঁর পুত্র বীরভদ্রদেব এক দিন উৎকলের সিংহাসনে বসবেন, এমন একটি ধারণাও রাজকর্মচারীদের ভিতরে প্রচলিত হয়ে গিয়েছে।

ফলে এই নিয়ে রাজার মহিষীদের ভিতরে একটা চাপা বিবাদের ছায়া নিরন্তর বাতাসে কাঁপতে থাকে। সেই নিয়ে মাঝে মাঝে মহারাজাও বিব্রত হয়ে পড়েন। এই কারণে এমন কোনও বিবাদের আশঙ্কা দেখা দিলে, মহারাজ দু’-চার দিন অন্তঃপুর এড়িয়ে চলেন। চিরন্তন দাম্পত্যকলহের এই নিয়ম যেন কালের পর কাল একই ভাবে চলে আসছে।

পরিচারিকা পরিবৃত্ত মহারাজ বাহির মহলেই দু’দিন কাটিয়ে দিয়েছেন। তা ছাড়া গজপতির মন-মেজাজও ভাল যাচ্ছে না কয়েক দিন। দু’দিন রাজসভাতেও তিনি যাননি। সুরা আর নারীসঙ্গেই কাটিয়ে দিয়েছেন। দক্ষিণের প্রদেশপাল রায় রামানন্দের উপরে তিনি অনেকটা নির্ভর করতেন। ভরসা করতেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পেরেছেন রাম রায়ের রাজকার্যে আর মন নেই। রাম রায় সকালেই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসবেন। তিনি কী বলতে আসছেন তা মহারাজ অনুমান করতে পারছেন। তবু তিনি এক বার শেষ চেষ্টা করে দেখতে চান।

একটু বেলা বাড়তেই রায় রামানন্দ এসে রাজসমীপে উপস্থিত হলেন। এসে মহারাজকে প্রণাম জানালে প্রতাপরুদ্রদেব তাঁকে উপবেশন করতে বললেন। তার পর বললেন, “রামানন্দ, বলো কী সংবাদ? দক্ষিণের শাসনকার্য কেমন চলছে?”

রামানন্দ এ কথার প্রত্যক্ষ উত্তর না দিয়ে নতমুখে বললেন, “মহারাজ, মার্জনা করবেন। আমাকে এ বার রাজকার্য থেকে মুক্তি দিন...”

মহারাজ বললেন, “তুমি কি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেলেছ? একান্তই আর প্রদেশপাল থাকতে চাও না? আমি যে তোমার উপর অনেক ভরসা করেছিলাম!”

মহারাজের এমন বক্তব্যে রায় রামানন্দ যেন আরও সঙ্কুচিত বোধ করলেন। মৃদু স্বরে বললেন, “আমাকে ক্ষমা করুন মহারাজ। আমি বাকি জীবনটা ভগবানের সেবায় কাটিয়ে দিতে চাই।”

ক্রমশ

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Bengali Novel Novel

সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি:

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or Continue with

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy

{-- Slick slider script --}}