শিল্পায়নের সম্ভাবনা ছিল সীমিত। প্রতিকূলতা থাকা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুর নিজেকে গড়ে তুলেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে। জীবনযাত্রার মানের নিরিখে সিঙ্গাপুরের অবস্থান এখন এশিয়ায় দেশগুলির মধ্যে প্রথম এবং বিশ্বে নবম।
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০১ এপ্রিল ২০২৫ ১০:২০
Share:Save:
এই খবরটি সেভ করে রাখার জন্য পাশের আইকনটি ক্লিক করুন।
০১১৯
ছিল অজ গ্রাম। সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদ, লোকবলের অভাব সত্ত্বেও কী ভাবে একটি বিশ্বমানের শহর গড়ে উঠতে পারে, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ কলকাতা থেকে মাত্র চার ঘণ্টার বিমান দূরত্বের একটি শহর। সিঙ্গাপুর। গত শতকের ষাটের দশক পর্যন্ত সিঙ্গাপুর ছিল মূলত মৎস্যজীবীদের বাসস্থান। একসময় এই সিঙ্গাপুরে ছিল মাত্র ১২০টি জেলে পরিবারের বসবাস। মাত্র কয়েক বছরের অক্লান্ত ও পরিকল্পিত চেষ্টায় সিঙ্গাপুর পরিণত হয়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রে।
০২১৯
এক শহরের দেশ। দ্বীপরাষ্ট্র। ফলে শিল্পায়নের সম্ভাবনা ছিল সীমিত। প্রতিকূলতা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুর নিজেকে গড়ে তুলেছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে। জীবনযাত্রার মানের নিরিখে সিঙ্গাপুরের অবস্থান এখন এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে প্রথম এবং বিশ্বে নবম। দুর্নীতিমুক্ত যে কয়টি দেশ আছে, সিঙ্গাপুর তার মধ্যে অন্যতম।
০৩১৯
এশিয়ার তো বটেই, ইউরোপ, আমেরিকার বহু বড় বড় বাণিজ্যিক সংস্থা তাদের প্রধান কেন্দ্র সরিয়ে তা স্থাপন করেছে সিঙ্গাপুরে। গুগ্ল, মেটা থেকে শুরু করে বৈশ্বিক অনেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানের আঞ্চলিক সদর দফতর বা কার্যালয় রয়েছে সিঙ্গাপুরে।
০৪১৯
এই কাজটি খুব একটা সহজসাধ্য ছিল না ছোট্ট দেশটির পক্ষে। রাতারাতি ভোলবদল হয়নি দ্বীপরাষ্ট্রটির। নাগরিক পরিষেবাকে বিশ্বমানের করতে হয়েছে। ঘটাতে হয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের উন্নতি। শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্যায়ন নয়, সিঙ্গাপুর জোর দিয়েছিল নাগরিক পরিকাঠামো গঠনের উপরেও।
০৫১৯
বাহ্যিক এবং মানবসম্পদ পরিকাঠামোকে বৈশ্বিক মানদণ্ডের নিরিখে গড়ে তুলে এশিয়ার মধ্যে নজির তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে একমাত্র সিঙ্গাপুরই। সারা বিশ্বের ব্যবসায়িক মহলে সিঙ্গাপুরের অর্থনীতি সবচেয়ে প্রশংসিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত। ২০২৪ সালে বিশ্ব ব্যাঙ্কের তালিকায় এটি জায়গা করে নেয়। ব্যবসা পরিচালনার ক্ষেত্রে বিশ্বে প্রথম স্থানে রয়েছে এই দেশটি।
০৬১৯
সিঙ্গাপুর এমন ছিল না বরাবর। মাত্র ৫০ বছর আগেও দেশটি চরম দারিদ্রের মধ্যে দিন কাটাত। দীর্ঘ উপনিবেশবাদ ও দখলদারি শাসনের কুফল ভোগ করে আসছিল এই ক্ষুদ্র দ্বীপরাষ্ট্রটি। ভাঙা ঘরবাড়়ি, রাস্তাঘাট, নিয়ন্ত্রণহীন যানবাহন, রুগ্ন, দরিদ্র মানুষে ভর্তি, অপরাধ, অশিক্ষা ও দূর্নীতিপূর্ণ একটি দেশ।
০৭১৯
একটা সময় সিঙ্গাপুরের পরিচয় ছিল অবৈধ কাজকর্মের মুক্তাঞ্চল হিসাবে। আফিমের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকতেন এখানকার অধিবাসীরা। জুয়ার ঠেক ছিল অলিতে গলিতে। বিশ্বের সবচেয়ে কঠোর মাদকবিরোধী আইন প্রণয়নকারী হিসাবে সিঙ্গাপুর পরিচিতি পেলেও আগে এখানে মাদকের রমরমা চলত।
০৮১৯
আধুনিক ঝাঁ চকচকে সিঙ্গাপুরের আইন বা নগর সভ্যতার চেহারা দেখলে কেউ হয়তো কল্পনাও করতে চাইবেন না যে, আজ থেকে মাত্র কয়েক দশক আগে এখানে রমরমিয়ে চলত দাসব্যবসাও। বন্দরনগরী হওয়ার কারণে মানুষ কেনাবেচা খুবই স্বাভাবিক বলে মনে করা হত।
০৯১৯
সিঙ্গাপুরের মতো দ্বীপকে একসময় বাণিজ্যিক যৌনতার বড় কেন্দ্র হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছিল ব্রিটিশ শাসনকালে। ব্রিটিশদের আগমনের পর, চিন থেকে বিপুল সংখ্যক শ্রমিক আমদানি করে সিঙ্গাপুর। এর ফলে লিঙ্গ অনুপাত ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। এই ভারসাম্যহীন লিঙ্গ অনুপাতের ফলে যৌনকর্মীদের চাহিদা বেড়ে যায়।
১০১৯
সিঙ্গাপুর স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৬০ থেকে ১৯৮০-এর দশকের মধ্যে অর্থনৈতিক উত্থানের ফলে বহু শত কোটি ডলারের যৌনশ্রম শিল্পের সম্প্রসারণের জন্য নারীদের ক্রমাগত পাচার করা হচ্ছিল। দক্ষিণ এশিয়া থেকে নারীদের প্রায়শই সিঙ্গাপুরে পাচার করা হত। এই রকম একটি অপরাধ ও দারিদ্রপীড়িত একটি ছোট বন্দর শহরকে এশিয়ার সবচেয়ে সমৃদ্ধ দেশে পরিণত করা খুব সহজ কাজ ছিল না।
১১১৯
১৯৫৯ সালে ব্রিটিশ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হয়ে স্বায়ত্তশাসন লাভ করার পর ১৯৬৩ সালে মালয়েশিয়ার সঙ্গে যোগ দিয়েছিল সিঙ্গাপুর। কিন্তু আদর্শগত কারণে সেই বন্ধুত্ব বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ১৯৬৫ সালে সম্পূর্ণ স্বাধীন হয় দেশটি। ১৯৬০-’৭০ সালে সিঙ্গাপুরের কাছে প্রাকৃতিক সম্পদ বলে কিছুই ছিল না। না ছিল পর্যাপ্ত জনবল, না ছিল বিস্তৃত ভূখণ্ড।
১২১৯
সিঙ্গাপুর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মালয়েশিয়ার ঠিক দক্ষিণে উপকূলসংলগ্ন অঞ্চলে অবস্থিত একটি দ্বীপরাষ্ট্র বা নগররাষ্ট্র। আয়তনে এটি নিউইয়র্কের চেয়েও ছোট। জনসংখ্যা প্রায় ৬০ লক্ষ। মূল ভূখণ্ড হিসাবে সামান্য জায়গা এবং তুলনামূলক ভাবে কম জনবল থাকা সত্ত্বেও সিঙ্গাপুর বিশ্বের ৩৩তম বৃহত্তম অর্থনীতি।
১৩১৯
স্বাধীনতা অর্জনের ৪০ থেকে ৫০ বছরের মধ্যে সিঙ্গাপুর বিশ্বের প্রথম সারির ধনী দেশ হিসাবে পরিচিতিলাভ করেছে। বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত ও পরিচ্ছন্ন দেশের তকমা পেয়েছে সিঙ্গাপুর। স্মার্ট সিটি ইন্ডেক্সে এই বছরেও বিশ্বে সবার প্রথমে রয়েছে সিঙ্গাপুর। ‘এশিয়ার সবুজতম শহর’ বলেও খ্যাতি আছে সিঙ্গাপুরের।
১৪১৯
পরিকাঠামোগত সুরক্ষার বিষয়ে ২০১৯ সালে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশকে নিয়ে একটি সমীক্ষা চালিয়েছিল দ্য ইকনমিস্ট। এর মধ্যে পড়ে দেশের বিমানবন্দর, হাইওয়ে, রেলপরিবহণ, হাসপাতাল, সেতু, যোগাযোগ ব্যবস্থা, পানীয় জল ও বিদ্যুৎ পরিষেবা-সহ অন্যান্য সুযোগসুবিধা। দ্য ইকনমিস্টের সমীক্ষা অনুযায়ী এই সূচকে সবার উপরে ছিল সিঙ্গাপুরের স্থান। ব্যক্তিগত সুরক্ষার সূচকগত তালিকার প্রথমেও ছিল সিঙ্গাপুরেরই নাম।
১৫১৯
সিঙ্গাপুরের আরও একটি বিষয় যা দেশটিকে আরও এগিয়ে নিয়ে চলেছে তা হল এর শিক্ষাব্যবস্থা। দেশটির স্বাক্ষরতার হার ৯৭ শতাংশ। আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা পরিকাঠামোর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে সিঙ্গাপুরের শিক্ষাব্যবস্থা। আর এটি সম্ভব হয়েছে স্বাধীনতার পর পরই দেশটির শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে সাজানোর মধ্য দিয়ে।
১৬১৯
সিঙ্গাপুরে দরিদ্র নাগরিক নেই। বরং সেখানে ধনকুবেরদের ছড়াছড়ি। এইচএসবিসির সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশটির প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকদের ৩০ শতাংশের বেশি শতকোটিপতি হবেন। ২০২২ সালের হিসাব অনুযায়ী, দেশটিতে মাথাপিছু আয় ৬৭ হাজার ৩৫৯ ডলার। ভারতীয় মুদ্রায় সেই হিসাব দাঁড়ায় ৫৮ লক্ষ টাকারও বেশি। মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ১ লক্ষ ২৮ হাজার ডলার।
১৭১৯
সিঙ্গাপুরের পরিবহণ ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হল উন্নত গণপরিবহণ ব্যবস্থা। সিঙ্গাপুরের বাস ও মেট্রো-সহ বিভিন্ন ধরনের সরকারি পরিবহণ ব্যবস্থা শুধু সর্বাধুনিকই নয়, বিস্ময়করও বটে। আমেরিকা ও ইংল্যান্ডের যে কোনও শহরের তুলনায় এখানকার সরকারি পরিবহণে যাতায়াত তুলনায় সস্তা।
১৮১৯
সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি বিমানবন্দর টানা আট বার ‘স্কাইট্র্যাক্স’-এর বিশ্বের সেরা বিমানবন্দরের খেতাব অর্জন করেছে। অত্যাধুনিক নকশা, চমৎকার যাত্রী পরিষেবার সুবিধা এটিকে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত ও জনপ্রিয় বিমানবন্দরে পরিণত করেছে।
১৯১৯
এ সবই সম্ভব হয়েছে দেশটির সুশাসনের কারণে। একটা বিষয় অনস্বীকার্য যে কোনও দেশে সুশাসন না থাকলে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয় না। সঙ্গে ছিল উন্নত প্রযুক্তিভিত্তিক পরিকাঠামো, দক্ষ শ্রমিকের প্রাচুর্য, সিঙ্গাপুর সরকারের কঠোর অভিবাসন আইন ও নতুন নতুন ব্যবসার সুপরিকল্পিত উদ্যোগের বাস্তবায়ন।