শহরের পথের ধারে পাতাহীন শিমুল, পলাশের আবিররাঙা রূপ, কখনও আবার বাড়ির বাগানে লতিয়ে ওঠা ভেনেস্তা, নীলমণি লতা, বুগেনভিলিয়া, কসমস জানান দিচ্ছে, বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।
বসন্তে ফুল গাঁথল
সারা বছর ফুল হলেও বসন্তে সবচেয়ে বেশি ফুলে ভরে ওঠে নানা রঙের বুগেনভিলিয়া। গাছ ভরে থাকা লাল, বেগুনি, সাদা, কমলা, হলুদ ইত্যাদি একাধিক রঙের বুগেনভিলিয়ার দিক থেকে চোখ ফেরানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই সময়ে আবহাওয়া শুষ্ক থাকলেও বুগেনভিলিয়া গাছে বেশি জল দিয়ে ফেললে পাতার পরিমাণ বেড়ে যায়, ফুল আসে কম। ফুলের পরিমাণ বাড়াতে গেলে গাছের মাটি শুকিয়ে যাওয়ার পরেই জল দিতে হবে। মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর রঙিন হয়ে থাকে সাদা, গোলাপি, রানি, লাল... নানা রঙের করবী। বাড়ির পাঁচিল, দেওয়াল, ছাদ, গেটের ক্যানোপির উপর দিয়ে নীলমণি বা ভেনেস্তা লতার বাড়বাড়ন্তের পথ করে দিলে ফুলের সৌন্দর্যে বাড়ির চেহারাই বদলে যায়। এই সব গাছের ক্ষেত্রে খুব বেশি পরিচর্যার প্রয়োজন নেই। যদিও এ ধরনের গাছের সৌন্দর্য অনেকটাই নির্ভর করে ঠিক মতো প্রুনিং বা ছাঁটাইয়ের উপরে।

লিলি। ছবি: সংগৃহীত।
মার্চ-এপ্রিলে আবার সেজে ওঠে গোলাপি, সাদা, লাল রঙের মুসান্ডা বা পত্রলেখা।এ ছাড়া বাগানের এক কোণে বেগুনি ও সাদা কসমস ফুলের গুচ্ছ বসন্তকালে দেখতে বেশ লাগে। শীতের গোলাপও ময়দান ছাড়ার আগে তার বাহার দেখায়। শিমুল, পলাশ, মান্দার ফুলের সৌন্দর্য দেখতে বসন্তে পুরুলিয়া, ঝাড়খণ্ড, বীরভূম ছুটে যান অনেকে। বাড়ির বাগানেও এ সব গাছ করা যায়, এমনকি টবেও। এখন তো নার্সারিতে হলুদ পলাশের চারাও পাওয়া যাচ্ছে, যা এক সময়ে ছিল বিরল। বছরের এই সময়টায় প্রায় সব ধরনের লেবু গাছে ফুল আসে। তাই যত্ন একটু বাড়াতে হবে। জল ও খাবারের ঘাটতি হলে লেবু ফুল ঝরে যায়। আম গাছেও মুকুল আসে বসন্তে। কলমের আম গাছ হলে খেয়াল রাখতে হবে, চড়া রোদেমুকুল যাতে ঝরে না যায়। তাই বিকেলের দিকে গাছে জল স্প্রে করতে পারলে ভাল।
আগামী মরসুমের জন্য
বসন্ত এলেও চড়া হচ্ছে রোদের তেজ। সময় এসেছে বাগানে শুকিয়ে যাওয়া চন্দ্রমল্লিকা, পিটুনিয়া, প্যানজি, ডালিয়ার গাছ ফেলে আগামী মরসুমের জন্য বাগান প্রস্তুত করা। আসন্ন গ্রীষ্ম ও তারপরে বর্ষার কথা চিন্তা করে বাগানে রোপণ করতে পারেন সূর্যমুখী, নাইন ও’ক্লক, দোপাটি, কলাবতী, বোতাম ফুল, জারবেরা, লিলি, গন্ধরাজ, জবা, বেলি, জুঁই, চাপা, রঙ্গন, কাঠগোলাপ ইত্যাদি ফুলের গাছ।

কাঠগোলাপ। ছবি: সংগৃহীত।
পুরনো টবে নতুন গাছ
মার্চ মাসে নতুন গাছের চারা রোপণের জন্য প্রয়োজন নেই নতুন মাটি কিংবা নতুন টবের। শুকিয়ে যাওয়া শীতের গাছগুলি ফেলে পুরনো টব থেকেই মাটি বার করে ফেলুন। টবের মাটি এক জায়গায় জড়ো করে চালুনি দিয়ে চেলে কয়েক দিন রোদে দিয়ে রাখতে হবে। গ্রীষ্মকালীন গাছের মাটি এমন ভাবে তৈরি করতে হবে যাতে আর্দ্রতা ধরে রাখতে পারে। ৫০ শতাংশ রোদ খাওয়ানো মাটির সঙ্গে ২৫ শতাংশ কোকোপিট, ২৫ শতাংশ এক বছরের পুরনো গোবর সার বা পাতাপচা সার, অল্প করে শিং কুচি, হাড় গুঁড়ো, নিমখোল ও সরষের খোল মিশিয়ে মাটি তৈরি করে নিতে হবে নতুন গাছের জন্য। জবা, টগর, অ্যাডেনিয়াম, অপরাজিতা, গন্ধরাজ, বেলি, অলকানন্দা, কাঠগোলাপ ইত্যাদি গাছ বাগানে থাকলে তাদের ডরম্যান্ট পিরিয়ড থেকে এখন জেগে ওঠার পালা। তাই তাদের প্রয়োজন বিশেষ পরিচর্যারও, যেমন, প্রুনিং, রি-পটিং, মাটিতে সার দেওয়া ইত্যাদি। ফেব্রুয়ারি-মার্চে ঠিকমতো প্রুনিং করলে ফুল ভাল হবে। ছেঁটে দেওয়া ডালের মুখে ছত্রাকনাশক লাগাতে পারেন। এই সময়ে গাছগুলিকে দিতে হবে নাইট্রোজেন সমৃদ্ধ সার, যা গাছকে পাতায় ভরিয়ে দেবে। প্রয়োজনে করতে হবে রি-পটিং। যে গাছগুলো পুরনো হয়েছে, তাদের বছরে একবার রি-পটিং করা উচিত।

পলাশ। ছবি: সংগৃহীত।
যে সব গাছের রুট বাউন্ড হয়েছে বা টব ফেটে শিকড় বেরিয়ে যাচ্ছে, রি-পটিং করার আগে সেই সব টবের মাটি শুকিয়ে নিতে হবে। গাছ টব থেকে বার করে মাটি জড়িয়ে থাকা শিকড় ও সংলগ্ন মাটি বেশ অনেকটা ফেলে দিতে হবে। এ বার নতুন বা পুরনো টবে খোলামকুচি, পাথর, বালি ও মাটির স্তর দিয়ে প্রতিস্থাপন করতে হবে। অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, জলনিষ্কাশনের ব্যবস্থা যেন ঠিক থাকে। রি-পটিং করার সময়ে টবের মাটিতে মিশিয়ে দিতে পারেন মিশ্র সার, নিমখোল। তা হলে আর এক-দেড় মাস গাছকে কোনও খাবার না দিলেও চলবে। বেশ কিছু গাছ শীতে একেবারে পাতাহীন হয়ে যায়। বসন্তের আগমনে সেখানেও নতুন পাতা আসে। সেই সব গাছে এ বার শুধু জল নয়, পরিমিত সারও প্রয়োগ করতে হবে। সম্ভব হলে নতুন পাতা গজাচ্ছে এমন টবগুলো আধো ছায়ায় রাখা যেতে পারে। কচি পাতা খেতে পোকার উপদ্রব বাড়ে এ সময়ে। তাই প্রয়োজন মতো জৈব কীটনাশক স্প্রে করা যেতে পারে।
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)