সংসদের বাজেট অধিবেশনের দ্বিতীয়ার্ধে বিরোধী সমন্বয়ের ক্ষেত্রে প্রায় নিঃশব্দেই একটি বড় বদল ঘটে গেল। গত দু’বছরে অধিবেশন চলার সময়ে প্রায় প্রতিদিন সকালে রাজ্যসভার বিরোধী দলনেতা মল্লিকার্জুন খড়্গের ঘরে বসত কফি-সহযোগে বিরোধী দলের কৌশল তৈরির বৈঠক। বিরোধীদের রণকৌশল নিয়ে আলোচনায় কংগ্রেস নেতারা ছাড়াও যোগ দিতেন ডিএমকে, এসপি, উদ্ধবপন্থী শিবসেনা, এনসিপি (এসপি), আরজেডি, আপ ও বাম সাংসদেরা। কংগ্রেসের প্রতি দলের ‘অ্যালার্জি’র কারণে খড়্গের ডাকে তৃণমূলের রাজ্যসভা বা লোকসভার দলনেতারা প্রায়শ একেবারেই সাড়া দিতেন না। কখনও তৃণমূলের পক্ষ থেকে পাঠানো হত অপেক্ষাকৃত তরুণ সাংসদদের। চলতি অধিবেশনে খড়্গের ঘরের সেই বৈঠক বন্ধ হয়ে গিয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে কংগ্রেসের উদ্যোগে এই সংসদীয় যৌথ রণনীতি তৈরির বৈঠক বসবে না বলেই রাজনৈতিক সূত্রে জানা গিয়েছে। কেন বন্ধ হল খড়্গের কক্ষের এই সমন্বয় বৈঠক?
কংগ্রেস নেতৃত্বের যুক্তি, আপাতত যা ভোটের ক্যালেন্ডার, তাতে জাতীয় স্তরে একান্ত নিজের জোটসঙ্গী ছাড়া সার্বিক ভাবে সব আঞ্চলিক দলের সঙ্গে মাখামাখি করে তাদের লাভ নেই। বরং তাতে আগামী বছরের গোড়ায় বিধানসভা ভোটের আগে পশ্চিমবঙ্গ, কেরলের মতো রাজ্যগুলিতে কংগ্রেস নেতা ও কর্মীদের কাছে ভুল বার্তা যাবে। পশ্চিমবঙ্গে কংগ্রেস নেতৃত্ব এ বার তেড়েফুঁড়ে ভোটের আসরে নামার পরিকল্পনা করছেন। রাজ্যে তৃণমূলই প্রধান প্রতিপক্ষ। বুধবারই রাহুল বঙ্গের নেতাদের জানিয়ে দিয়েছেন, কারও বিরুদ্ধে লড়াইয়ে হাইকমান্ড বাধা দিচ্ছে না। এ বার কেরলেও কংগ্রেসের সরকার গড়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে বলে রাহুল মনে করছেন। রাজ্যের নেতাদের রাহুল নিজেই জানিয়েছেন, কেরলে গত দশ বছর বাম সরকারের পরে মানুষ বদল চাইছেন। ফলে কেরলের কংগ্রেস বনাম বামেদের লড়াইয়ের আঁচ গড়িয়ে আসছে দিল্লিতেও। কংগ্রেস নেতৃত্বের এখন প্রধান লক্ষ্য, রাজ্যে রাজ্যে নিজেদের শক্তি বাড়ানো। তাতে কোনও আঞ্চলিক দলের ক্ষতি হলে তার দায় কংগ্রেসের নয়। কারণ কংগ্রেসের জমি কেড়েই এই দলগুলি বড় হয়েছে। ২০২৫ সালে সংগঠনকে মজবুত করার লক্ষ্য নেওয়া কংগ্রেস মনে করছে, আগামী ২০২৯-এর লোকসভায় যদি বিজেপির বিরুদ্ধে সরকার গড়তে হয়, তা হলে কংগ্রেসকে একক ভাবে দেড়শোর বেশি আসন পেতে হবে।
অন্য দিকে তৃণমূল নেতৃত্বের বক্তব্য, ’২৪-এর লোকসভায় কংগ্রেস ১০০-র কাছাকাছি আসন পেলেও তার পরই হরিয়ানা, জম্মু-কাশ্মীর ও মহারাষ্ট্রে শোচনীয় ফলাফল করেছে। ফলে ‘ইন্ডিয়া’-র মধ্যে কংগ্রেসের কর্তৃত্ব মিইয়ে গিয়েছে। ডিএমকে বাদে প্রায় সব বিরোধী আঞ্চলিক দল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে ‘ইন্ডিয়া’র রাশ দেখতে চেয়ে প্রকাশ্যে বিবৃতি দিয়েছে। ভোটার কার্ড নিয়ে মমতার তোলা বেনিয়মের অভিযোগকে বিরোধীরা (এমনকি কংগ্রেসও) সমর্থন জানিয়েছে। এই অবস্থায় অন্যান্য বিরোধী দলের সংসদীয় নেতাদের নিজের ঘরে ডেকে পাঠানোর মতো নৈতিক জোর আর কংগ্রেসের নেই। তৃণমূলের দাবি, কংগ্রেস বুঝে গিয়েছে, একের পর এক পরাজয়ের পরে ডাকলেও কোনও বিরোধী দল তাদের ঘরে উঁকি মারতেও যাবে না।
রাহুল বুধবার বাংলার কংগ্রেস নেতাদের বলেছেন, প্রয়োজন মতো সংসদে তৃণমূলের সঙ্গে বোঝাপড়া হবে। তার জন্য রাজ্যে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়াইতে বাধা নেই। খড়্গে-রাহুল-প্রিয়ঙ্কা গান্ধী বঢরা পশ্চিমবঙ্গেও যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন। আজ তৃণমূলের কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘রাহুল গান্ধীর মধ্যে পরিণতমনস্কতার অভাব নরেন্দ্র মোদীর আরও দশ বছর ক্ষমতায় থাকা সুনিশ্চিত করে দিল। রাহুল আঞ্চলিক দলের সঙ্গে কলহ করে কিছু করতে পারবেন না। পশ্চিমবঙ্গে আসন বাড়াতে পারবেন না। সংসদে কক্ষ সমন্বয়ের জন্য রাহুল গান্ধীকে কী প্রয়োজন? তৃণমূল স্বতন্ত্র দল।’’
তৃণমূল সূত্র এ-ও বলছে, রাজ্যসভায় সনিয়া গান্ধী নিজে উপস্থিত থাকায় সেখানে কক্ষ সমন্বয় সহজ হয়ে গিয়েছে। বিরোধী দলনেতারা অধিবেশন কক্ষেই দ্রুত প্রয়োজনীয় আলোচনা সেরে নিতে পারছেন। খড়্গেও সেখানে থাকেন। কিন্তু লোকসভায় রাহুলকে কোনও বিষয় নিয়ে বলতে যাওয়াই কঠিন।
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)