মিঠুন চক্রবর্তী, অঞ্জন দত্ত। বয়সে এগিয়ে থেকেও দ্বিতীয় অভিনেতাকে প্রথম অভিনেতার ‘দাদা’ সম্বোধন! পথিকৃৎ বসুর ‘শ্রীমান ভার্সেস শ্রীমতী’ ছবিতে নাকি ‘মহাগুরু’কে প্রেমের দৃশ্যে টেক্কা দিয়েছেন অঞ্জন? খুব চেষ্টা করেও নায়িকা অঞ্জনা বসুর মন পেলেন না মিঠুন। আনন্দবাজার ডট কমের মুখোমুখি হয়ে ‘আনকাট’ দু’জনেই।
প্রশ্ন: ‘সন্তান’ ছবিটি দেখার পর আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি...
মিঠুন: কেঁদেছিস তো?
প্রশ্ন: ছবিতে চোখের জল বড় হয়ে উঠেছে…
মিঠুন: জানি তো। বলেই নিয়েছিলাম, সবাইকে কাঁদাব। এ বার বলছি, অনেক কান্না হয়েছে। পথিকৃৎ বসুর ছবি ‘শ্রীমান ভার্সেস শ্রীমতী’ দেখে, আমায় দেখে, সবাই হাসবেন। হাসাতে আসছি...
কথোপকথন শুনতে শুনতে অঞ্জন দত্তের ঠোঁটে চিলতে হাসি।
প্রশ্ন: দর্শক হাসবে কেন?
মিঠুন: এখন যে ছবিগুলো করি সেগুলো গল্পপ্রধান। ২৭ বছর ধরে চলতে থাকা একটি বিচ্ছেদকে নিয়ে ছবি। বিচারক কিছুতেই রায় দিতে পারছেন না। স্ত্রী বিচ্ছেদ চাইছেন। স্বামী বলছেন, আমার বৌ এত সুন্দরী, বিচ্ছেদ দেব না! সুযোগ বুঝে দাম্পত্য কলহে ঢুকে পড়বেন স্ত্রীর কলেজের পুরুষ বন্ধু। এ ভাবে গল্প এগোতে এগোতে ক্লাইম্যাক্স, বিচ্ছেদ হবে কি হবে না? বহু দৃশ্যেই হাসি আছে।
প্রশ্ন: সেই এক নারী দুই পুরুষ। এই গল্প ২০২৫-এ নতুন কী কথা বলবে?
মিঠুন: ২০০০ সালে এই গল্প বললে দর্শক মেনে নিত না। বলত, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কেন তৃতীয় ব্যক্তি ঢুকবে? যদিও বরাবর ভালবাসাই জিতেছে। তবুও, ২৫ বছর আগে আমরা এতও উদার ছিলাম না যে, সম্পর্কে তৃতীয় ব্যক্তির উপস্থিতি মেনে নেব। তৃতীয় ব্যাক্তির অবস্থান বরাবর ছিল থাকবে। কিন্তু তা নিয়ে খোলাখুলি কথা বলা আজ সম্ভব।
প্রশ্ন: বলতে চান মানসিকতার বদল ঘটেছে?
আরও পড়ুন:
মিঠুন: কিছুটা হলেও ঘটেছে। গল্পনির্ভর ছবি দেখতে চাইছেন দর্শক। অভিনয় দেখতে চাইছেন। শুধুই তারকাদের দেখে ভুলছেন না। প্রেমের গল্প, ত্রিকোণ প্রেমের গল্প আজও দর্শক দেখতে চান।
প্রশ্ন: এখনও প্রেমে পড়েন? অন্য নারীকে বিয়ে করতে ইচ্ছে করে?
মিঠুন: না, বিয়ে নয়। যোগিতা আমার খুবই ভাল বৌ। ওকে ছাড়ার কোনও প্রশ্নই নেই। কিন্তু অন্য কাউকে ভালবাসতে বা প্রেমে পড়তে সমস্যা কোথায়? এই নিয়ে আপনারা সাংবাদিকরা কম খুঁচিয়েছেন? অমুক অভিনেত্রী মারা গিয়েছেন, তাঁর সঙ্গে প্রেম ছিল? আরে, আমার সময়ের ৯৮ শতাং নায়িকা আমার প্রেমে পাগল! এমন নায়ক পাবে কোথায়? বলিউড পুরো জ্বালিয়ে দিয়েছিলাম। (আবার হাসি)
অঞ্জন: এটা অভিনেতাদের জীবনযাপনের অঙ্গ!
মিঠুন: (হাসতে হাসতে) এই যে দেবীর মতো দেখতে অঞ্জনা আমার নায়িকা হলেন, এমন সুন্দরীর প্রেমে পড়ব না? পড়েছি। খুব চেষ্টা করেছি। কিছুতেই রাজি করাতে পারলাম না! নির্ঘাৎ বুঝেছিল, আমি অঞ্জনার প্রেমে পড়তে পারি। তাই আগেভাগে ছেলেকে সামনে এনেছে! (বাকিরা অট্টহাসিতে ফেটে পড়েছেন)। ওকে তো আমিই বেছেছি। পথিকৃৎকে বলেছিলাম, বৌ সুন্দর হতে হবে। পরিচালক তিন জনের ছবি দেখিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে বললাম, ওকেই নিতে হবে। খুব ভাল মেয়ে। দুর্দান্ত অভিনেত্রী। কী সুন্দরী! কিন্তু দুঃখের কথা কী বলব, প্রথম দিনেই ছেলেকে দেখিয়ে দিল! আর এগোতেই পারলাম না।(হাসি)
প্রশ্ন: বাস্তবে আপনাদের দাম্পত্যে তৃতীয় পুরুষ এলে কী করবেন?
মিঠুন: (টান টান হয়ে বসে) মানবই না! ছেলে একাধিক প্রেম করতে পারে। মেয়েরা সেটা করলে বায়োলজিক্যাল সমস্যা।
অঞ্জন: ছবির গল্প বাস্তব থেকেই তো উঠে আসে। এমন ঘটনাও ঘটে। তার পরেও বলব, ভালবাসা থাকলে দাম্পত্য টিকে যায়। যতই তৃতীয় ব্যক্তি আসুক। এই যেমন আমি। আমার প্রায় সব বন্ধু ডিভোর্সি। আমি এত বছর ধরে বৌয়ের সঙ্গে। তার মানে কি আমার আর কাউকে ভাল লাগেনি? আমি কি কাউকে ডোবাইনি? না, কেউ আমাকে ডোবায়নি? ডুবেছি, ডুবিয়েওছি। এটা না হওয়াই অস্বাভাবিক।
প্রশ্ন: গল্পে তৃতীয় ব্যক্তি আর বিবাহিত মহিলার সম্পর্ক কেমন?
মিঠুন: ভাল লাগা ছিল, ভালবাসা ছিল না। এটা আমার মনে হয়। আমার মনে হয় অঞ্জনদা এটা ভাল বলতে পারবেন।
অঞ্জন: সেই উত্তরে যাওয়ার আগে আমার কিছু বক্তব্য আছে। এই প্রথম আমি আর মিঠুন একসঙ্গে কাজ করছি। মিঠুন পাশে বসে আমায় কেন ‘দাদা’ সম্বোধন করছেন, ভগবান জানেন! আমরা কিন্তু একই গুরুর শিষ্য, মৃণাল সেনের ছবি দিয়ে আমাদের অভিনয় জীবন শুরু।
প্রশ্ন: অথচ, এক ছবিতে অভিনয় করতে এত বছর লেগে গেল!
মিঠুন: সেটাই....
অঞ্জন: কেন হবে না? পরিচালক বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের একটি ছবিতে একবার মিঠুনের সঙ্গে কাজ করতে চেয়েছিলাম। বুদ্ধদা ভারী গলায় বলেছিলেন, হবে না! আমাকেও তখন যা দেখতে, বিচ্ছিরি! তখনকার বাণিজ্যিক ছবিতে আমার মতো চেহারার কেউ তারকা হতে পারতেন না। আমিও শুরু থেকেই জানতাম, আমার দ্বারা হবে না। আমি তাই মন দিয়ে অভিনয় করে অভিনেতা হতে চেয়েছি। আমাকে অন্য ধারার পরিচালকেরা দেখেছেন। ৪৫ বছরের পেশাজীবনে ছবির সংখ্যা মাত্র ২৫। লোকে ধরে নিল, আমি বুঝি খুবই বাছবিচার করি! এখন অবশ্য লোকে একটু আধটু চেনে, গান, ছবি পরিচালনার দৌলতে। আজ এই জায়গায় পৌঁছে মনে হল, বাণিজ্যক ধারার অন্তত একটি ছবিতে আমার কাজ করা উচিত। তাই মিঠুন চক্রবর্তীর সঙ্গে কাজ হল। আমাদের দেশে এই একজন অভিনেতা একাধারে তারকা, অভিনেতাও। এই সুযোগ ছাড়া যায়? উনি না থাকলে হয়তো রাজি হতাম না।

অঞ্জন দত্ত, মিঠুন চক্রবর্তী প্রথম এক ছবিতে। ছবি: সংগৃহীত।
প্রশ্ন: কাজ করে কেমন লাগল?
অঞ্জন: দারুণ। মিঠুন চক্রবর্তীর তামঝাম, হাঁকডাক, এটা ওটা— কত কিছু দেখলাম! ওঁর মেকআপ ভ্যানটা কত বড়! আমারটা ছোট....। সব দেখলাম। ব্যাপারস্যাপারই আলাদা!
মিঠুন হাসতে হাসতে পরিচালকের দিকে তাকিয়ে বললেন, দ্যাখ, কী সব বলছে!
অঞ্জন: (মৃদু হেসে) এটা সেটের বাইরে। সেটে পা দিলেই অন্য মানুষ। এই বয়সেও অন্য স্বাদের চরিত্র পেলে নিমেষে নিজেকে বদলে ফেলেন। অভিনয় নয়, চরিত্র হয়ে যান।এই কাজ একটা মজার ব্যাপার হল। আমি একজন তারকার সঙ্গে কাজ করেছি। অভিনয় করেছি একজন পোড়খাওয়া অভিনেতার সঙ্গে। তিনি এখানে পত্নীনিষ্ঠ ভদ্রলোক। আর এত দিন বাণিজ্যিক ঘরানার ছবিতে মিঠুন যা যা করেছেন, নাচ, গান, রোম্যান্স, মারপিট— এই ছবিতে সে গুলো আমি করেছি। কতটা পেরেছি কে জানে...। এই ছবিতে আমার রোম্যান্স বা ভালবাসা অনেকটাই লোকদেখানো, ফিল্মি। ওঁর মতো করে অবশ্য নাচতে পারিনি। এমনিতেই ট্যুইস্টের বাইরে কিচ্ছু পারি না। ও সব ওঁর দখলে (হাসি)।
মিঠুন: কিন্তু গানটা তুমি যা গেয়েছ গুরু... ওতেই মাত।
অঞ্জন: হ্যাঁ, ওটুকুই।
প্রশ্ন: মিঠুন চক্রবর্তী যখন মধ্যগগনে তখন বিনোদন দুনিয়ায় তারকার স্থান আগে, পরে অভিনেতা। এখন সেটাই যেন বদলেছে। অভিনেতাদের সময় এসেছে।
অঞ্জন: সবাই সেটা পারেন না। অমিতাভ বচ্চন পেরেছেন। আর আমাদের মিঠুন চক্রবর্তী।তাঁরা তারকা এবং অভিনেতা।
প্রশ্ন: এই বদলটা কেমন লাগে?
অঞ্জন: এই বদলটাই তো মিঠুন অনেক আগে করে দেখিয়েছেন। ওঁর ঝুলিতে তাই ‘ডিস্কো ডান্সার’ বা ‘প্রেম প্রতিজ্ঞা’ আছে। আবার ‘তাঁহাদের কথা’ ‘কাশ্মীর ফাইল্স’ও আছে।
মিঠুন: আমি একটু বলি? বিষয়টা এত সহজ ছিল না। মৃণাল সেনের ‘মৃগয়া’ করার পর আমায় আর কেউ কাজ দেয় না। যেন আমি অস্কার পাওয়া অভিনেতা।
অঞ্জন: (মিঠুনকে থামিয়ে দিয়ে) মস্ত ভুল। ওই চেহারা, পেটানো পেশি... তখন কী দেখতে ওঁকে!
মিঠুন: ওই যে, ফর্সা নই! বলিউডে তখন টুকটুকে ফর্সা নায়কদের দাপট। আমায় মেকআপ দিয়ে ফর্সা করা হত, ঠোঁটে লাল লিপস্টিক! তখনই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, তারকা হওয়া না পর্যন্ত সমান্তরাল ছবিতে অভিনয় করব না। কথা রেখেছি। সাল ১৯৯৩। আমি নম্বর ওয়ান। সাদা কাগজে কিছু লিখে সই করে দিলে সেটাই শেষ কথা ছিল। এমন সময় বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত এলেন। বললেন, আমার ছবিতে কাজ করবে? ৫ লক্ষ টাকার বেশি দিতে পারব না। তাতেই রাজি। থাকার জায়গা নেই। বারিপোদায় সার্কিট হাউসে বৌকে নিয়ে উঠেছি। যোগিতা তখন তৃতীয় বার অন্তসত্ত্বা। দিনেও মশারি খাটাতে হত, এত বড় বড় মশা। রাত আড়াইটেয় দেবী হালদার মেকআপে বসাতেন। সাড়ে চারটেয় শেষ হত। তার পর শুট শুরু। একই ভাবে রামকৃষ্ণ দেবের চরিত্রে আমায় যখন বাছা হয়েছিল, আঁতকে উঠেছিলাম। বলেছিলাম, আমি ‘ডিস্কো ডান্সার’! আর কোথায় ঠাকুর। জোর করে আমায় মেকআপ করানো হল। আয়নায় নিজেকে দেখে হতবাক। আমার মধ্যে ঠাকুর লুকিয়ে ছিলেন? এটাই আমি। এক দিনে ৬৫টি শিফ্টে শুট করেছি। আবার অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কারও।

অঞ্জন দত্ত কি অঞ্জনা বসুকে মিঠুন চক্রবর্তীর থেকে ছিনিয়ে নিতে পারলেন? ছবি: আনন্দবাজার ডট কম।
প্রশ্ন: বদলে যাওয়া পরিবেশে বাংলায় কাজ করতে ভাল লাগছে?
মিঠুন: শুধু বাংলায় কেন? হিন্দিতেও তো করছি। ‘কাশ্মীর ফাইল্স’ করেছি। ‘দিল্লি ফাইল্স’-এর শুট শেষ করলাম। তবে ঠিক করেছি, যা পাব তা-ই আর করব না। আরও বেছে ছবি করব।
প্রশ্ন: কাজই আপনাকে বাঁচিয়ে রেখেছে?
মিঠুন: হ্যাঁ। এখনও মাঝরাত, ভোররাত পর্যন্ত শুট করি। মাঝে শুট করতে করতে হাত ভাঙল। আমি বাড়তি সময় শুট করে পুষিয়ে দিয়েছি। যাতে কেউ বদনাম করতে না পারে, মিঠুন চক্রবর্তী ডুবিয়ে দিয়েছে। আমার ভাই পরিষ্কার কথা, এই সময় থেকে এই সময় পর্যন্ত কাজ করব। তার বাইরে নয়।
অঞ্জন: তোমার নির্ধারিত কাজের সময় কখন?
মিঠুন: ধরো, সন্ধে থেকে রাত বারোটা।
অঞ্জন: আমার তো রাত ৯টার প্যাক আপ রাত বারোটায় হয়! স্বাভাবিক, আমি তো আর মিঠুন চক্রবর্তী নই... (বলেই হাসি)।
মিঠুন: এখানেও গল্প আছে। রাত ৯টা বাজলে আশপাশে পথিকৃৎ ঘুরঘুর শুরু করে। হাত কচলাতে কচলাতে বলে, দাদা, আমি বলছিলাম , একটা ছোট্ট শট। একটা দৃশ্য। তুমি চুপচাপ বসে থাকবে। তা হলেই হবে।
আবার সকলের মিলিত হাসি...