একনাথ শিন্দে। — ফাইল চিত্র।
মহারাষ্ট্রে শিবসেনা ভেঙে সরকার উল্টে দেওয়ার ঘটনার পরে এখনও বছর ঘোরেনি। এ বার এনসিপি-তে ভাঙন ধরল। যে অজিত পওয়ার-সহ এনসিপি নেতাদের বিরুদ্ধে মাত্র কয়েক দিন আগেও দুর্নীতির অভিযোগের কামান দেগেছিলেন নরেন্দ্র মোদী, সেই অজিত পওয়ারই এখন মহারাষ্ট্রের উপমুখ্যমন্ত্রী। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনুমান যদি ঠিক হয়, তা হলে হয়তো বিধানসভার স্পিকারের হঠাৎই চৈতন্য উদয় হতে পারে যে, একনাথ শিন্দে যে ভাবে শিবসেনা ভেঙেছিলেন, তা অসাংবিধানিক— ফলে, তাঁর বদলে অজিত পওয়ার মুখ্যমন্ত্রীর কুর্সিতে অধিষ্ঠিত হতে পারেন। লক্ষণীয় যে, শিন্দের ক্ষেত্রে বিজেপির সরকার দখলের জন্য শিবসেনার ‘বিদ্রোহী’ বিধায়কদের প্রয়োজন ছিল; অজিত পওয়ারের ক্ষেত্রে সেই প্রয়োজন নেই। এনসিপি-র ৩৬ জন বিধায়ক ছাড়াই মহারাষ্ট্র বিধানসভায় এনডিএ সরকারের সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনটি তাৎক্ষণিকের নয়, ভবিষ্যতের। প্রথমত, বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব সম্ভবত এত দিনে বুঝেছেন যে, দলবদলের ক্ষেত্রে তাঁরা শিন্দেকে যে দর দিয়েছিলেন, তা রাজ্য রাজনীতিতে তাঁর প্রভাবের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অজিত পওয়ারের আগমনে শিন্দের উপর চাপ বাড়বে। কিন্তু তার চেয়ে বড় প্রয়োজন শরদ পওয়ারকে ধাক্কা দেওয়া। মহারাষ্ট্রের রাজনীতির বাতাসে একটি কথা ভাসছে: অজিত পওয়ারের এই ‘বিদ্রোহ’-র পিছনে তাঁর খুল্লতাতের আশীর্বাদ রয়েছে— এটা দুর্নীতির অভিযোগ থেকে রক্ষা পাওয়ার খিড়কি। প্রফুল্ল পটেলের করজোড়ে শরদ পওয়ারকে অনুরোধও সংশয় বাড়িয়েছে। সে সম্ভাবনা সত্য হলেও যেমন পওয়ারের শক্তিক্ষয় ঘটবে, না হলে আরও বেশি। ৮৩ বছর বয়সে পায়ের নীচের জমি পুনরুদ্ধার করা মুখের কথা নয়।
রাজ্য রাজনীতির সমীকরণে শরদ পওয়ারের গুরুত্ব যতখানি, এই মুহূর্তে তার চেয়েও বেশি বিরোধী মহাজোটের কারণে। অজিত পওয়ারের দলবদলের সময়টি তাৎপর্যপূর্ণ— মহাজোটের প্রথম ও দ্বিতীয় বৈঠকের মাঝামাঝি। মহারাষ্ট্রে এই মুহূর্তে কংগ্রেসের এমন কোনও নেতা নেই, বিজেপি-বিরোধী রাজনীতির মঞ্চে যিনি শরদ পওয়ারের তুল্য। ফলে, পওয়ারকে দুর্বল করা সম্ভব হলে মহারাষ্ট্রে জোটের সাফল্যের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরেই বহুলাংশে বিনাশ করা যায়। কিন্তু, বিজেপির এই কৌশলটি সম্ভবত শুধুমাত্র মহারাষ্ট্র-কেন্দ্রিক নয়। এটি মহাজোটের সম্ভাব্য শরিকদের প্রতি বার্তা যে, জোট তৈরি হওয়ার আগেই তার অঙ্গচ্ছেদ করার ক্ষমতা বিজেপির রয়েছে। জোটকে যত দুর্বল দেখাবে, ততই জোট-শরিকদের কপালে চিন্তার রেখা প্রকটতর হবে— ডুবন্ত নৌকার সওয়ার হতে অনেকেরই আপত্তি থাকতে পারে, বিশেষত তাদের, যাদের রাজনীতি সচরাচর সুবিধাবাদের হাওয়া পালে লাগিয়েই চলে।
কেউ বলতে পারেন, ঘোড়া কেনার পালা সাঙ্গ করে বিজেপি মহারাষ্ট্রে এক বছরের মধ্যে পর পর দু’বার গোটা আস্তাবল কিনে ফেলল— ঘটনার অনৈতিকতা এমন নির্লজ্জ ভাবে প্রকট যে, তা নিয়ে আর বুঝি বিস্মিতও হওয়া চলে না। গত ন’বছরের অভিজ্ঞতা বলছে, জনগণের রায়কে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো চেলে নেওয়ার এই প্রবণতা বিজেপি ত্যাগ করবে না। এর প্রতিরোধ গণতন্ত্রের পথে হওয়াই কাম্য। কিন্তু, তা করবে কে? এনসিপি-র ঘটনাক্রম দেখিয়ে দিল, যাদের নিয়ে বিজেপি-বিরোধী জোট গঠিত হওয়ার কথা, তাদের অতীত এমনই কালিমাময়, দুর্নীতির পাঁকে এমনই আকণ্ঠ নিমজ্জিত যে, তাদের প্রতিরোধ বড় জোর বালির বাঁধ। শুধু এনসিপি নয়, অভিজ্ঞরা জানেন যে, জোটের সম্ভাব্য শরিকদের মধ্যে অনেক দলেরই অবস্থা এই রকম। আপসহীন, নির্ভীক রাজনীতির জন্য যে জোর প্রয়োজন, একমাত্র সত্যই তা জোগাতে পারে। ভারতীয় রাজনীতি থেকে সেই সত্যের জোর সম্পূর্ণ মুছে গিয়েছে। অতঃপর টাকা এবং রাষ্ট্রযন্ত্র, এই দুই-ই ভারতীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠেছে।
Or
By continuing, you agree to our terms of use
and acknowledge our privacy policy