তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তোলা বন্ধ রাখার আর্জি জানিয়ে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিলেন দলের ‘সদ্য প্রাক্তন’ কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাস। বিধানসভা ভোটে বিপর্যয়ের পরে গত ৫ জুন দলের সাংগঠনিক রদবদলের কথা ঘোষণা করে তৃণমূলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, অরূপ বিশ্বাসের বদলে নতুন কোষাধ্যক্ষ হয়েছেন প্রাক্তন সাংসদ শুভাশিস চক্রবর্তী। ব্যাঙ্ককে দেওয়া চিঠিতে অবশ্য অরূপ দাবি করেছেন, তিনিই এখনও দলের কোষাধ্যক্ষ।
একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কের সেন্ট্রাল প্লাজা শাখায় তৃণমূলের অ্যাকাউন্ট রয়েছে। দলের তরফে নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া অডিট রিপোর্ট অনুসারে জমা থাকা টাকার পরিমাণ ৬৭৫ কোটি। ব্যাঙ্কের ম্যানেজারকে অরূপ যে চিঠি দিয়েছেন, তার তারিখ ১২ জুন। ব্যাঙ্কের তরফে অবশ্য সেটা ১৬ জুন গ্রহণ করা হয়েছে। চিঠিতে অরূপ বলেছেন, দলের ২০ জন সাংসদ এবং ৫৮ জন বিধায়ক হয় দল ছেড়েছেন, না হয় প্রকাশ্যেই দলের বর্তমান নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন। এই অবস্থায় দল এবং দলের তহবিলের নিয়ন্ত্রণ কারণ হাতে থাকবে তা নিয়ে তীব্র মতভেদ দেখা দিয়েছে। সমস্যা না-মেটা পর্যন্ত দলের তহবিল ‘সুরক্ষিত রাখতে’ এবং ‘অনুমোদনহীন কোনও ব্যক্তি কর্তৃক’ টাকা তোলা বা আদানপ্রদান আটকাতে অ্যাকাউন্টে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার এবং সব রকম লেনদেন বন্ধ রাখার আর্জি জানিয়েছেন অরূপ।
চিঠিতে অরূপ আরও বলেছেন, দলের কাজের সুবিধার জন্য তিনি আগে থেকেই কিছু চেক সই করে রাখতেন। যেগুলি পরে প্রয়োজনমতো ব্যবহার করা হত। কিন্তু দলের বিভিন্ন লেনদেনের গরমিলকে কেন্দ্র করে অতীতে তাঁকে ‘কঠিন পরিস্থিতির’ সম্মুখীন হতে হয়েছে। অরূপের বয়ানে, ‘‘সাম্প্রতিক বিবাদের প্রেক্ষিতে আমার আশঙ্কা হল, দলের যাঁদের নেতৃত্ব নিয়ে বিতর্ক রয়েছে এমন ব্যক্তিরা এই আগাম সই করে রাখা চেকগুলির অপব্যবহার করতে পারেন বা সেগুলি ব্যবহার করে অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলে নিতে পারেন।’’
আরও পড়ুন:
অরূপের চিঠির বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরে শুভাশিস চক্রবর্তীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি এ বিষয়ে কিছু জানি না। তবে আমি রাজ্য সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ। অরূপ ছিল সর্বভারতীয় তৃণমূলের কোষাধ্যক্ষ।” সর্বভারতীয় তৃণমূল এবং রাজ্য তৃণমূলের আলাদা আলাদা ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট আছে কি না জানতে চাওয়া হলে শুভাশিসের জবাব, “অ্যাকাউন্ট একটাই।”
বিধানসভা ভোটে হারের পর থেকে তৃণমূল কার্যত তিন টুকরো হয়ে গিয়েছে। একটা ভাগ বিধায়কদের, দ্বিতীয় ভাগ সাংসদদের। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে থাকা নেতাদের সংখ্যা প্রতিদিনই কমছে। এই অবস্থায় তৃণমূলের প্রতীক এবং তহবিল কোন পক্ষের এক্তিয়ারে থাকবে তা নিয়ে জল্পনা শুরু হয়েছে। সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, কাকলি ঘোষ দস্তিদারের সঙ্গী সাংসদেরা ন্যাশনালিস্ট সিটিজেনস পার্টি অফ ইন্ডিয়া-তে (এনসিপিআই) যোগ দিলেও প্রতীক পাওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাবেন বলে জানিয়ছেন। আর ঋতব্রতের সঙ্গে যাওয়া বিধায়কেরা তো নিজেদের ‘আসল তৃণমূল’ বলেই দাবি করছেন।
তবে এই বিদ্রোহপর্বে অরূপ তাঁর সঙ্গেই আছেন বলে সম্ভবত মনে করছিলেন মমতা। ৫ তারিখের বৈঠকে অরূপকে কোষাধ্যক্ষ পদ থেকে সরালেও দলের সাধারণ সম্পাদক পদে রেখে দেওয়া হয়েছিল। যদিও ভাই স্বরূপ বিশ্বাস গ্রেফতার হওয়া এবং মেসি-কাণ্ডে পুলিশের তলব পাওয়ার পর থেকে প্রকাশ্যে আর অরূপের দেখা মিলছিল না। তিন বার সমন এড়ানোর পরে বৃহস্পতিবারই বিধাননগর দক্ষিণ থানায় হাজিরা দিয়েছেন রাজ্যের প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী। তার আগে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে লেখা চিঠি প্রকাশ্যে এসে বুঝিয়ে দিল, অরূপও আর দিদির হাতে নেই!