ময়দানের এক কর্তাকে শুভেন্দু অধিকারীর শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে সেজেগুজে সোৎসাহে যেতে দেখে আর এক কর্তা টিপ্পনী কেটে বলেছিলেন, ‘‘এত তাড়াতাড়ি ডিগবাজি খেয়ে গেলেন?’’ গত শনিবার ব্রিগেডে যাওয়া কর্তার সোজাসাপটা জবাব ছিল, ‘‘ক্লাবটা তো চালাতে হবে। সরকারকে নিয়ে তো চলতে হবে।’’
পশ্চিমবঙ্গে সরকার বদল হয়েছে। তাই রাজ্যের খেলাধুলোর প্রশাসনিক স্তরেও পরিবর্তনের আঁচ পাচ্ছেন অধিকাংশ কর্তাই। তবে, সকলেরই প্রাথমিক বক্তব্য, বদলাতে সময় লাগবে। ঠিক কোন পদ্ধতিতে, কবে, কী ভাবে বদলটা আসবে, সেটা এখনই বলা বা বোঝা সম্ভব নয়। আপাতত অপেক্ষা করা ছাড়া উপায় নেই।
ক্রিকেটের পরিস্থিতি
তিন বছর আগের একটি ঘটনায় ফেরা যাক। কলকাতা ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে পাঁচটি ম্যাচ পেয়েছিল। তখন প্রশ্ন উঠেছিল, এই পাইয়ে দেওয়া কি সৌরভকে বিজেপির আরও একটি ‘পুরস্কার’? বিজেপির তরফে সৌরভকে কি বার্তা দেওয়া হয়েছিল যে, আপনি আর একটু এগোলে আরও বড় ‘পুরস্কার’ মিলতে পারে?
রাজনীতি এবং সৌরভের এই দড়ি টানাটানি পাঁচ বছর আগে থেকে। এটা এখন আর অজানা নয় যে, ২০২১ সালের বিধানসভা ভোটের আগে সৌরভের সঙ্গে কথাবার্তা বহু দূর এগিয়েছিল বিজেপির। অনেকে বলেছিলেন, সেই বিধানসভা ভোটে সৌরভ ‘দিদি’র বিরোধী ‘মুখ’ হবেন, সেই বোঝাপড়াতেই সব অঙ্ক ওলটপালট করে ‘দাদা’কে ২০১৯ সালে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সভাপতি করেছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। সেই অঙ্কে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল অমিত শাহের।
কিন্তু বিজেপির পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিয়ে সৌরভ বিধানসভা ভোটের অব্যবহিত আগে পিছিয়ে গিয়েছিলেন। তখন সৌরভ-বিজেপি সম্পর্কে খানিকটা শৈত্য এসেছিল। বিজেপি মনে করেছিল, সৌরভ তাদের ‘বিশ্বাস’ ভঙ্গ করেছেন। তিনি ‘দান’ নিয়েছেন। কিন্তু ‘প্রতিদান’ দেননি।
এর পরে ২০২৩-এর নভেম্বরে বিজেপি শাসিত ত্রিপুরা সৌরভকে তাদের পর্যটনের ব্র্যান্ডদূত নিয়োগ করেছিল। যা থেকে অনেকেই মনে করেছিলেন, বিজেপির তরফে সৌরভকে আবার বার্তা দেওয়া হল যে, দরজা খোলা আছে। পাশাপাশি ব্র্যান্ডদূতের পদ গ্রহণ করে সৌরভও বুঝিয়েছিলেন, তাঁর দরজাও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
এর মাসখানেক পরেই বিশ্বকাপের সূচি প্রকাশ হয়েছিল। যাতে দেখা গিয়েছিল, অ-বিজেপি শাসিত রাজ্য হয়েও (বিশেষত, দিদির শাসিত রাজ্য হয়েও) বাংলা তথা কলকাতা বিশ্বকাপের পাঁচটি ম্যাচ পেয়েছিল। তার মধ্যে একটি আবার সেমিফাইনাল!
অনেকেই মনে করেছিলেন, এই সিদ্ধান্তের নেপথ্যেও বিজেপির তরফে সৌরভকে ‘বার্তা’ দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। অনেকের ধারণা, ইডেনের ম্যাচ পাওয়ার পিছনে সৌরভেরও ‘উদ্যোগ’ ছিল। যদিও এই ধারণার কোনও আনুষ্ঠানিক সত্যতা কখনও মেলেনি। সৌরভ নিজেও কিছু বলেননি। তবে বিজেপি তরফে পুরস্কারসূচক এই বার্তা ইঙ্গিত দিয়েছিল, আরও এগোলে সৌরভের জন্য আরও বড় পুরস্কার রয়েছে। বিশ্বকাপের পাঁচটি ম্যাচ দিয়ে সিএবিকে ‘পুরস্কৃত’ করা যে সৌরভের সামনে আরও একটা ‘টোপ’, তাতে কোনও সন্দেহ ছিল না। তখন সৌরভের দাদা স্নেহাশিস গঙ্গোপাধ্যায় সিএবির সভাপতি থাকলেও সৌরভই যে ‘আসল’, সেটা বুঝতে বিশেষ বুদ্ধির দরকার ছিল না।
তখন জল্পনা ছিল, সৌরভ একটু এগোলে এর পরে আইসিসি চেয়ারম্যানের পদের মতো বড় পুরস্কার জুটতে পারত তাঁর ভাগ্যে। সেটিই হত বিজেপির তরফে ‘চূড়ান্ত’ পুরস্কার। যে পদটি নিয়ে সৌরভের আগ্রহও কম ছিল না। ২০২৪-এর ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গ বিজেপির তৎকালীন সভাপতি সুকান্ত মজুমদারকে হাসপাতালে গিয়ে দেখেও এসেছিলেন। এর পরেই কলকাতায় ঘটে যায় আরজিকরের ঘটনা। সৌরভ কেন চুপ ছিলেন, বা তাঁকে কেন রাত দখলের আন্দোলনে দেখা যায়নি, সেই নিয়ে যখন একের পর এক প্রশ্ন উঠছিল, তখন সৌরভ অনেক ভেবেচিন্তে দু’তরফেরই মন জুগিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘‘এটা খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। কিন্তু বাংলা ভারতের মতোই নিরাপদ।’’
সৌরভ কখনওই নিজের অবস্থান পাকাপাকি ভাবে জানাননি। কারণ, সৌরভ মমতার সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ করতে চাননি। বাংলায় থেকে শাসকদলের সঙ্গে কে-ই বা সম্পর্ক নষ্ট করতে চায়! কিন্তু একই সঙ্গে সৌরভের ক্রিকেট প্রশাসনে থাকার ইচ্ছাও প্রচুর। যা বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সমর্থন এবং অনুমোদন ছাড়া সম্ভব ছিল না। সৌরভের ঘনিষ্ঠ সূত্রের দাবি, সেই কারণেই তিনি অমিতের সঙ্গেও সম্পর্কের অবনতি চাননি।
সৌরভ অবশ্য পুরো বিষয়টিকে বরাবরই রাজনীতির বাইরে রেখেছিলেন। ত্রিপুরার ব্র্যান্ডদূত হওয়া নিয়ে জল্পনার সময়েই তিনি বলেছিলেন, তিনি কিছু করলেই তাঁর সঙ্গে রাজনীতি টেনে আনা হয়। খানিকটা বিরক্তিও প্রকাশ করেছিলেন সৌরভ। তবে ঘটনা হল, রাজনীতিতে সৌরভের আগ্রহ অপরিসীম। তিনি এমন কখনও বলেননি যে, রাজনীতিতে কখনওই আসবেন না। যত বারই সরাসরি প্রশ্ন করা হয়েছে, তিনি অফ স্টাম্পের বাইরের বল দেখে ব্যাট তুলে নিয়ে সেটি ছেড়ে দিয়েছেন। কখনও সরাসরি জবাব দেননি। তবে ঘনিষ্ঠেরা জানেন, সৌরভের রাজনীতিতে মোটেই অনাগ্রহ নেই।
বস্তুত, সৌরভ এখনও সাবধানেই খেলছেন। অনেকের মতে, তা ছাড়া উপায়ও নেই। বিজেপি বা অমিতকে তাঁকে শোয়েব আখতারকে দেখে খেলার মতো খেলতে হয়েছে। যিনি অফ স্টাম্প অথবা অফ স্টাম্পের সামান্য বাইরে, যাকে পরিভাষায় বলে ‘করিডর অফ আনসার্টেনটি’-তে পর পর ডেলিভারি করে গিয়েছেন।
বাংলার ক্রিকেটে এখন সৌরভ ক্ষমতায়। গত বছর বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তিনি দ্বিতীয় বার সিএবি-র সভাপতি হয়েছেন। কিন্তু নির্বাচন না হওয়ায় তাঁর বিরোধী অভিষেক ডালমিয়া গোষ্ঠী তখন নানা অনিয়মের অভিযোগ তুলেছিল।
সিএবি-র এক সদস্য আনন্দবাজার ডট কম-কে বললেন, ‘‘তখন একাধিক বিধায়ক, সাংসদ এমনকি পুর প্রতিনিধিরাও সিএবি-তে নিজেদের লোক ঢোকানোর চেষ্টা করেছেন। সফলও হয়েছেন।’’ জানা গেল, এই প্রচেষ্টায় বাদ যাননি কয়েক জন জেলাশাসকও। বৃহস্পতিবার ইডি-র হাতে গ্রেফতার হওয়া পুলিশকর্তা শান্তনু সিংহ বিশ্বাসও নাকি বিরাট ভূমিকা নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ। ভোটারদের হুমকি দেওয়ার অভিযোগও এখন উঠছে তাঁর বিরুদ্ধে।
সিএবি-র একটি অংশ মনে করছে, যত দিন যাবে এই অভিযোগগুলো প্রকাশ্যে আসবে। এক সদস্যের কথায়, ‘‘সৌরভ কী ভাবে ক্ষমতায় এসেছেন, আমরা জানি। ওঁকে সিএবি-র সিংহাসনে বসানোর নেপথ্যে নবান্নের সরাসরি ভূমিকা ছিল। তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী তো ভোটই করতে দেননি।’’ কিন্তু এটাও ঘটনা, নির্বাচন হলেও সৌরভকে ঠেকানো যেত না। বঙ্গ ক্রিকেটে ক্ষমতার লড়াইয়ে সৌরভ নামলে তাঁকে হারানো এখনও পর্যন্ত কার্যত অসম্ভব।
কিন্তু অনেকেই মনে করছেন, নতুন সরকার ক্ষমতায় আসায় এ বার ছবিটা বদলাবে। অনেকেই সাহস করে গলা তুলতে পারবেন। প্রতিবাদ হবে। যেমন, সৌরভের বিরুদ্ধে একাধিক স্বার্থের সংঘাতের অভিযোগ। আইপিএলে দিল্লি ক্যাপিটালস দলের সঙ্গে যুক্ত থেকেও কী ভাবে সিএবি সভাপতি থাকতে পারেন সৌরভ, এইসব প্রশ্ন উঠবে। ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি প্রতিযোগিতা বেঙ্গল প্রিমিয়ার লিগ নিয়েও ভূরি ভূরি দূর্নীতির অভিযোগ।
আগামী সেপ্টেম্বরে সিএবি-র নির্বাচন হওয়ার কথা। তার আগেই দু’জন কর্তার মেয়াদ শেষ হয়ে যাচ্ছে। সচিব বাবলু কোলে ৭০ বছরের ঊর্ধ্বসীমা অতিক্রম করে যাবেন। যুগ্মসচিব মদনমোহন ঘোষ সব মিলিয়ে ন’বছর ক্ষমতায় থাকার মেয়াদ পূর্ণ করে ফেলবেন। সহ-সভাপতি নিশীথরঞ্জন দত্তের বয়স নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। এই তিনটি পদে নির্বাচন হওয়ার সম্ভাবনা।
তবে, নির্বাচন হবে কি না, এখনই বুঝতে পারছে না সিএবি। অন্তত আরও এক-দেড় মাস দেখতে চাইছেন সকলে। অভিষেক শিবিরের সঙ্গে কথা বলে বোঝা গেল, তারাও এখনই নির্বাচন নিয়ে কিছু ভাবছে না। তিনটি পদের অন্তত দু’টি অভিষেক শিবিরকে সৌরভ বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দিয়ে দিতে পারেন বলেও শোনা গেল। এখানেও অঙ্কটা পরিষ্কার বলে মনে করছেন সিএবি-র সঙ্গে যুক্ত অনেকেই। তাঁদের দাবি, সিএবি-র গত নির্বাচনের আগে অভিযেক নাকি মমতার দ্বারস্থ হয়েছিলেন। কোনও সাড়া না পাওয়ায় সাহায্য চেয়েছিলেন বিজেপির। কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব অভিষেককে সামনে রেখে ‘প্রতিশোধ’ নিতে চেয়েছিল সৌরভের উপর। নির্বাচন হলেও হয়তো অভিষেক জিততে পারতেন না। কিন্তু সৌরভকে অন্তত বার্তা দেওয়া লক্ষ্য ছিল যে, আপনার ঘাড়ে আমরা নিঃশ্বাস ফেলব। আরও এক বার বিজেপির ‘কাছাকাছি’ আসার জন্য এখন অভিষেকের দিকে সৌরভ বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন বলে শোনা গেল। যদিও অভিষেক-শিবিরের অনেকেই বলছেন, সৌরভের বদান্যতার তাঁদের দরকার হবে না।
এখানে তাৎপর্যপূর্ণ হল, রাজ্যে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর শমীক ভট্টাচার্যের বক্তব্য। গত মঙ্গলবার একটি বণিকসভার অনুষ্ঠানে গিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি নাম না করে সৌরভকে খোঁচা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘‘আমি এক ভদ্রলোককে চিনতাম। আমরা জানতাম উনি স্টেপ আউট মেরে ওভার বাউন্ডারি মারতেন। তার জন্য তিনি পরিচিত ছিলেন। আমরা দেখলাম তিনি বাউন্ডারির বাইরে থেকে বল থ্রো করছেন। স্পেন থেকে ঘোষণা হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের শিল্পের। কোনও মাইক্রোস্কোপ দিয়ে খুঁজে পাওয়া যাবে না।’’
সিএবিতে আগামী কয়েক মাস সকলেই নিজের মতো করে ঘুঁটি সাজাবেন। ইতিমধ্যেই কোষাধ্যক্ষ সঞ্জয় দাস নতুন ক্রীড়ামন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিককে অভিনন্দন জানিয়ে এসেছেন। সৌরভের সঙ্গেও মন্ত্রীর কথা হয়েছে। কোন ঘুঁটিটা কোথায় রাখলে কিস্তিমাত হবে, সেটা এত তাড়াতাড়ি বোঝা যাচ্ছে না। সকলেই আরও অপেক্ষা করতে চাইছেন।
ফুটবল প্রশাসনে বদল?
রাজ্যের ফুটবল নিয়ামক সংস্থা আইএফএ-তে সভাপতি পদে রয়েছেন অজিত বন্দ্যোপাধ্যায়, যিনি প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর ভাই। অন্যতম সহ-সভাপতি স্বরূপ বিশ্বাস, যিনি প্রাক্তন ক্রীড়ামন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসের ভাই। দীর্ঘ দিনের অভিযোগ, সচিব বা অন্য কয়েক জন কর্তা এঁদের চাপে এবং অত্যাচারে কোনও কাজই করতে পারেন না। এই দমবন্ধ পরিস্থিতিটা স্বাভাবিক হবে বলে মনে করছেন এক কর্তা।
আইএফএ-র আর এক কর্তা বললেন, ডায়মন্ড হারবার ফুটবল ক্লাবকে (অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্লাব) কলকাতা লিগে খেলানোর জন্য স্বরূপেরা কী কাণ্ড করেছিলেন, সকলের জানা। এগুলো আশা করি বন্ধ হবে।
টেনিস সুবিধাজনক জায়গায়
একটা বিষয় পরিষ্কার, রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদলের পর সব খেলার মধ্যে সবচেয়ে সুবিধা হবে টেনিসের। কারণ, বেঙ্গল টেনিস অ্যাসোসিয়েশন বিধানসভা নির্বাচনের আগেই লিয়েন্ডার পেজকে তাদের সভাপতি করেছে। আর বিটিএ সভাপতি হওয়ার কয়েক দিনের মধ্যেই লিয়েন্ডার আনুষ্ঠানিক ভাবে বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন।
বিটিএ-র এক কর্তা সেটা স্বীকারই করে নিলেন। বললেন, ‘‘লিয়েন্ডার থাকায় আমাদের তো সুবিধে হবেই। পালাবদল না হলে আমরা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তাম। এখন বোধ হয় আমরাই সবচেয়ে সুবিধাজনক জায়গায়। আমাদের এই সুযোগটা কাজে লাগাতে হবে।’’
অন্য খেলার অবস্থা
সরকারি সাহায্য না পেয়ে সবচেয়ে ভুগতে হয়েছে ক্রিকেট-ফুটবল বাদ দিয়ে অন্য খেলাগুলোকে। বেঙ্গল অলিম্পিক্স অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ)-এর সচিব চন্দন রায়চৌধুরী বললেন, ‘‘পরিবর্তন সব সময়ে ভাল। কেন্দ্রীয় সরকার যে ভাবে খেলাধুলো নিয়ে কাজ করেছে, এখানে তা হয়নি। আমরা খুব তাড়াতাড়ি নতুন ক্রীড়ামন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করব। এখানে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘খেলো ইন্ডিয়া’ করতে দেওয়া হয়নি। আশা করি এ বার হবে। আমরা সকলের আগে দাবি জানাব জাতীয় গেমস করার। এই রাজ্যে এখনও জাতীয় গেমস হয়নি। হয়তো কেন্দ্র এবং রাজ্যে ভিন্ন সরকার থাকার কারণে। এ বার একই সরকার। আশা করি, আমরা জাতীয় গেমস আয়োজন করতে পারব। একটা জাতীয় গেমস করতে পারলে যে কোনও রাজ্যের ক্রীড়া পরিকাঠামো বদলে যায়। সেই রাজ্যের খেলাধুলোয় বিরাট উন্নয়নের সুযোগ চলে আসে। এটা হওয়া দরকার।’’
বিওএ-র আর এক কর্তা সরাসরি আগের সরকার এবং ক্রীড়ামন্ত্রীকে একহাত নিয়ে বললেন, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর দাদা-ভাইয়েরা যা খুশি তা-ই করেছেন। আশা করি এ বার সেই পরিবারতন্ত্র কায়েম হবে না। আগের মন্ত্রী খেলাধুলো কিছু বুঝতেনই না। এখন যিনি দায়িত্ব নিয়েছেন, তিনি সে রকম নন। কেন্দ্রীয় ক্রীড়ামন্ত্রী হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে। তবে পুরোটা বুঝতে আরও একটু সময় দরকার।’’
ক্লাবগুলির অবস্থা
ময়দানের ক্লাবগুলোর মধ্যে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ইস্টবেঙ্গলের উপর। শোনা যাচ্ছে, স্পনসর হিসাবে সরে যেতে পারে ইমামি। তারা কোনও সময়েই লাল-হলুদের স্পনসর হতে চায়নি। শেষ মুহূর্তে জোর করে ইস্টবেঙ্গলকে তাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া হয়। ইস্টবেঙ্গলের স্পনসর হওয়ার দৌড়ে ছিল একাধিক সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সংস্থা। ইমামি ধারেকাছে ছিল না। একেবারে শেষ মুহূর্তে তাদের এবং ইস্টবেঙ্গলের প্রতিনিধিদের নবান্নে ডেকে পাঠিয়ে চুক্তি করানো হয়। এর পর সময় যত গড়িয়েছে, তত স্পষ্ট হয়েছে, দু’পক্ষের কেউই পরস্পরকে নিয়ে খুব একটা খুশি নয়। যে সরকারের চাপে ইমামি লাল-হলুদে টাকা ঢেলেছিল, সেই সরকার পড়ে যাওয়ায় ইমামির পক্ষেও এখন সরে আসা কঠিন নয়। যদিও ইমামির পক্ষ থেকে এখনই এই সম্ভাবনার কথা বলা হয়নি।
মোহনবাগানের ফুটবল দল শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েন্কার হাতে। ফলে আর্থিক সমস্যা নেই। কিন্তু ক্লাবের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বদল আসতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। গত সরকারের হস্তক্ষেপে মোহনবাগানের নির্বাচনও শেষ মুহূর্তে হয়নি। যুযুধান দুই গোষ্ঠী এখন একসঙ্গে ক্লাব চালাচ্ছে। সভাপতি হয়েছেন দেবাশিস দত্ত। সচিব হয়েছেন সৃঞ্জয় বসু। নির্বাচনী প্রচারে দেবাশিস এবং সৃঞ্জয় পরস্পরের বিরুদ্ধে অসংখ্য বার তোপ দেগেছিলেন। তাঁর পরিবারে দেবাশিস ভাঙন ধরাচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেছিলেন সৃঞ্জয়। তৃণমূলের একাধিক নেতা-মন্ত্রী তখন দুই শিবিরে ভাগ হয়ে গিয়েছিলেন। শোনা যাচ্ছে, নতুন সরকার আসায় দেবাশিস নাকি সুবিধা পাবেন। যুক্তি, সৃঞ্জয় এবং তাঁর বাবা সদ্যপ্রয়াত টুটু বসু একসময় রাজ্যসভায় তৃণমূলের সাংসদ ছিলেন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই বিজেপি সরকারে আসায় দেবাশিসের সুবিধা। যদিও দুই গোষ্ঠীর লোকজনই এটা মানতে চাইলেন না।
কলকাতার আর এক ক্লাব মহামেডানের সবচেয়ে বেশি সমস্যা। তাঁদের এক কর্তা বললেন, অস্বীকার করে লাভ নেই, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্যই আমরা আইএসএল খেলতে পারছি। ওঁর জন্যই আমরা ফুটবলারদের বকেয়া মিটিয়ে নিজেদের উপর থেকে ফিফার নির্বাসন তুলেছি। এখনও সাত মাসের বেতন বাকি। নতুন সরকারের থেকে সাহায্য না পেলে এই টাকা আমরা দিতে পারব না। তখন আবার না নির্বাসিত হয়ে যাই।
দু’-এক দিনের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করছেন মহামেডান কর্তারা। ওই কর্তা বললেন, আমরা ওঁকে অনুরোধ করব। তার বেশি আর কী করতে পারি। যদি আমাদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়, তা হলে নিজেদের মতো করে যত দিন পারি ক্লাব চালাব।
কলকাতার অন্যতম প্রধান ক্লাব দক্ষিণ কলকাতা সংসদ বা ডিকেএস। এই ক্লাবের সভাপতি দেবাশিস কুমার। রাসবিহারী কেন্দ্রে এ বার হেরে গিয়েছেন দীর্ঘদিনের তৃণমূল বিধায়ক। ফেঁসেছেন জমি সংক্রান্ত বিতর্কে। তাঁকে নিয়ে ক্লাবের একাংশের অনেক দিন থেকেই আপত্তি। জানা গেল, নির্বাচনের ফলাফলের পর ক্লাবের মধ্যে থেকে আরও জোরালো ভাবে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, দেবাশিস এর পরেও কেন দায়িত্বে থাকবেন? বিশেষ করে, সোনা পাপু বিতর্কে প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়কের নাম জড়িয়েছে।
দেশপ্রিয় পার্কের জমিতে কী করে ডিকেএসের মতো একটি প্রাইভেট ক্লাব থাকতে পারে, তা নিয়ে অনেক দিন থেকেই প্রশ্ন। এর মধ্যে এই ক্লাব ঝাঁ-চকচকে নতুন ইমারতও তৈরি করেছে। দেবাশিসের উপস্থিতিতে ঘটা করে তার উদ্বোধনও হয়েছে। সেখানে ঘর ভাড়া নিয়ে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। আরও নানা ভাবে ক্লাব আয় করছে। যে জমি পাবলিকের, সেখানে বছরের পর বছর ধরে একটি প্রাইভেট ক্লাব কী করে মুনাফা করে যাচ্ছে, সেটাই প্রশ্ন। উত্তরটা সহজ। ক্লাব সামনে রেখেছে একদা প্রভাবশালী দেবাশিসকে। নির্বাচনী ভরাডুবির পর এখন দেবাশিসের প্রতিপত্তি তলানিতে এসে ঠেকেছে। ক্লাবের একাংশ মনে করছে, নির্বাচনে যেখানে প্রবল জনরোষের ছাপ দেবাশিসদের উপর পড়েছে, সেখানে ক্লাবের আর তাঁকে রাখা উচিত নয়। কেউ কেউ বলছেন, এমনিই ওঁকে আর ক্লাবের দরকার পড়বে না। তাই ছেঁটে ফেলাটাও সময়ের অপেক্ষা।
তবে তৃণমূল ক্ষমতা থেকে যাবে, বা দেবাশিস হেরে যাবেন, এটা ক্লাব আঁচ করতে পারেনি। তাঁর সমালোচকেরা বলছেন, রিগিং ছাড়া নাকি কোনও দিনই দেবাশিস জিততে পারতেন না। যদিও ‘দেবভক্তেরা’ এই অভিযোগ মানতে নারাজ। ক্লাবের এক সদস্য বললেন, নির্বাচনে ওঁর হারটা আমাদের কাছে অপ্রত্যাশিত। পাশাপাশি তিনি এখনও দেবাশিসকে সার্টিফিকেট দিয়ে বললেন, ‘‘ব্যক্তিগত ভাবে বলতে পারি, ওঁর থেকে ক্লাব সব সময়ে সাহায্য পেয়েছে। ওঁকে যে কোনও সময়ে আমরা পেয়েছি। মানুষ হিসাবে ভাল। রাজ্যের পালাবদলে বা ওঁর হারে এখনও পর্যন্ত ক্লাবে কোনও প্রভাব পড়েনি। আশা করি, ভবিষ্যতে পড়বে না। এখনই ক্লাবের ক্ষমতাবদলের কোনও সম্ভাবনা দেখছি না।’’
পরিবর্তনের অপেক্ষায় সময় চাইছে গোটা ময়দান। সকলেই চাইছেন, খেলাধুলোয় রাজনীতিকরণ বন্ধ হোক। যাঁরা আগের সরকারের বদান্যতায় ক্ষমতায়, তাঁরা নতুন করে ছক কষছেন। যাঁরা আগের সরকারের বিরাগভাজন হওয়ার কারণে ক্ষমতায় আসতে পারেননি, তাঁরাও ঘুঁটি সাজাচ্ছেন।