গভীর সমুদ্রে দুঃসাহসিক অভিযান, বিস্ফোরণে অকেজো রাশিয়ার ২০০০ কোটি ডলারের পাইপলাইন, নেতৃত্বে ইউক্রেনের দুষ্টু মডেল!
‘ফ্রেয়া’ ছদ্মনামে পরিচিত ওই প্রাক্তন মডেল ইউক্রেনের রাজধানী কিভে মডেলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সেই জগৎ থেকে বেরিয়ে তিনি সমুদ্রের তলদেশে এক বিপজ্জনক অভিযানে নেতৃত্ব দেন।
একসময় প্রাপ্তবয়স্কদের মডেল হিসাবে কাজ করতেন। ‘নর্ড স্ট্রিম’ গ্যাস পাইপলাইনে হামলার ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন তাঁর নাম। তিনি ইউক্রেনের এক তরুণী। সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টাইমস’-এর একটি প্রতিবেদনে তাঁকে ওই পাইপলাইন বিস্ফোরণের ঘটনার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।
‘ফ্রেয়া’ ছদ্মনামে পরিচিত ওই প্রাক্তন মডেল ইউক্রেনের রাজধানী কিভে মডেলিংয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। কিন্তু সেই জগৎ থেকে বেরিয়ে তিনি সমুদ্রের তলদেশে এক বিপজ্জনক অভিযানে অংশ নিয়েছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
অভিযোগ, এই অভিযানের লক্ষ্যবস্তু ছিল বাল্টিক সাগরের তলদেশে অবস্থিত রাশিয়ার বহু কোটি ডলার মূল্যের গ্যাস পাইপলাইন ‘নর্ড স্ট্রিম’। রাশিয়া থেকে প্রাকৃতিক গ্যাস পশ্চিম ইউরোপে সরবরাহ করার জন্য ‘নর্ড স্ট্রিম’ পাইপলাইনটি তৈরি করা হয়েছিল। মনে করা হয়েছিল অর্থনৈতিক সহাবস্থান দু’পক্ষের মধ্যে শান্তি বজায় রাখবে।
কিন্তু ইউক্রেন এবং রাশিয়ার মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ওই পাইপলাইন দিয়ে প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেয় মস্কো। আবার জ্বালানি সঙ্কটের মধ্যে পড়ে ইউরোপ। ১ লক্ষ কোটি ইউরোরও বেশি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে মহাদেশটি। সেই পাইপলাইন ধ্বংসের ছক কষার অভিযোগ উঠেছে ইউক্রেনের প্রাক্তন মডেলের বিরুদ্ধে।
সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮০-র দশকে কিভে জন্ম নেওয়া ফ্রেয়া ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত প্রাণবন্ত, চঞ্চল এবং ডাকসাইটে সুন্দরী। মূলত মায়ের কাছেই বড় হয়েছিলেন তিনি। পরবর্তী সময়ে মাঝেমধ্যে মডেল হিসাবে কাজ করেছেন। একটি প্রাপ্তবয়স্কদের ম্যাগাজ়িনের প্রচ্ছদেও তাঁকে দেখা গিয়েছিল।
আরও পড়ুন:
জানা গিয়েছে, ২০-২২ বছর বয়সে ডাইভিং বা ডুবসাঁতারের সঙ্গে পরিচয় ঘটে ফ্রেয়ার। দ্রুত সেই সাঁতারের প্রেমে পড়ে যান তিনি। শখ হিসাবে শুরু হওয়া এই সাঁতার খুব শীঘ্রই তাঁর আবেগ এবং ভালবাসায় পরিণত হয়।
ডাইভিং শুরু করার অল্প সময়ের মধ্যেই মডেলিংয়ের চাকরি ছেড়ে দেন ফ্রেয়া। প্রথম বার ডুব দেওয়ার মাত্র তিন বছরের মাথায় এক অত্যন্ত দক্ষ ‘টেকনিক্যাল ডাইভার’-এ পরিণত হন তিনি। সমুদ্রের এমন গভীরতায় সাঁতার কাটতে শুরু করেন যা তাবড় তাবড় ডাইভারদের ক্ষমতার বাইরে।
‘দ্য টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে রাশিয়ার ক্রাইমিয়া দখল এবং পরবর্তী কালে পূর্ব ইউক্রেনে যুদ্ধের ঘটনা ফ্রেয়ার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। ২০২২ সালে মস্কোর পূর্ণ মাত্রার আগ্রাসনের পর তিনি মানবিক সহায়তা ও ইউক্রেনীয় সেনার জন্য তহবিল সংগ্রহের কাজে মনোনিবেশ করেন, কারণ গভীর সমুদ্রে ডাইভিংয়ের দক্ষতার আর কোনও প্রয়োজন ছিল না তাঁর।
তবে পরবর্তী কালে জানা যায়, ফ্রেয়ার বিশেষ দক্ষতার প্রয়োজন আসলে অন্য কোথাও ছিল। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সেনাবাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় দক্ষতা সম্পন্ন লোক না পেয়ে ইউক্রেনীয় কর্মকর্তারা একটি গোপন অভিযানের জন্য বেসামরিক ডাইভিং বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ করা শুরু করেন।
আরও পড়ুন:
অভিযানের লক্ষ্য ছিল রাশিয়ার ২০০০ কোটি ডলার মূল্যের ‘নর্ড স্ট্রিম’ গ্যাস পাইপলাইন, যা ইউরোপে গ্যাস রফতানির একটি প্রধান পথ, তা ধ্বংস করা। ঠিক তখনই ইউক্রেনীয় কর্তাদের নজর পড়ে ফ্রেয়ার উপর। দীর্ঘ বাছাই প্রক্রিয়ার পর নির্বাচিত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিও ছিলেন বলে জানা গিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাছাই প্রক্রিয়ার সময় অন্যদের চেয়ে ফ্রেয়াকে যা আলাদা করে তুলেছিল, তা হল তাঁর নির্ভীক মনোভাব। ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে অভিযানের একটি পর্যায়ে বাল্টিক সাগরের দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে দলটিকে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৮০ মিটার গভীরে পূর্বপরিকল্পিত ডুব দেওয়ার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করতে হয়েছিল।
তখন ফ্রেয়া নাকি তাঁর দলের সদস্যদের বলেছিলেন, ‘‘আমাকে একা যেতে দাও, আমি দ্রুত কাজ শেষ করে ফেলব।’’ অন্যেরা যখন দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তখন তিনি একাই নীচে নামার প্রস্তাব দেন।
কয়েক মাস প্রস্তুতির পর অবশেষে অভিযানটি পরিচালিত হয়। ডুবুরিরা গভীর সমুদ্রে নেমে নর্ড স্ট্রিম পাইপলাইনের বিভিন্ন অংশে বিস্ফোরক স্থাপন করেন। কয়েক সপ্তাহ পর, জলের নীচে ধারাবাহিক বিস্ফোরণে পাইপলাইন নেটওয়ার্কটি অকেজো হয়ে পড়ে এবং এ নিয়ে আন্তর্জাতিক তদন্ত শুরু হয়।
‘দ্য টাইমস’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তদন্তের এক পর্যায়ে জার্মান তদন্তকারীরা অভিযানে ব্যবহৃত একটি ইয়ট (ছোট প্রমোদতরী) থেকে ডিএনএ-র নমুনা, আঙুলের ছাপ এবং বিস্ফোরকের অবশিষ্টাংশ উদ্ধার করেন।
ওই সব প্রমাণের মধ্যে একটি চুলের নমুনাও ছিল, যা ফ্রেয়ার বলে অনুমান করা হয়। যদিও জিজ্ঞাসাবাদের সময় তরুণী ডুবুরি ওই নাশকতার সঙ্গে জড়িত থাকার সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ইউক্রেনের একটি নিরাপত্তা ইউনিটে প্রশিক্ষক হিসাবে কাজ করছেন ফ্রেয়া। অন্য দিকে ‘নর্ড স্ট্রিম’ পাইপলাইনে বিস্ফোরণের ঘটনা এখনও অমীমাংসিত, রহস্যে ঘেরা।