পরিচালনার মাঝেই তিনি খুঁজে নেন সমাজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আসলে গল্প বলতে ভালবাসেন। ইন্ডাস্ট্রি থেকে সমাজ, সমাজে নারীদের অবস্থান, পুরুষতন্ত্র নিয়ে অকপট পরিচালক নন্দিতা রায়। পঁচিশ বছরের পরিচালনার অভিজ্ঞতা থেকে শিবপ্রসাদের সঙ্গে মতের মিল, উঠে এল সেইসব কথাও। ‘ফুলপিসি ও এডওয়ার্ড’ নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তবে এ ছবি পরিচালককে মুড়ে রাখে নস্টালজিয়ার চাদরে। আনন্দবাজার ডট কমের সঙ্গে আড্ডায় পরিচালক নন্দিতা রায়।
প্রশ্ন: পঁচিশতম ছবি, এবং প্রথম গোয়েন্দা গল্প নিয়ে ছবি তৈরির ইচ্ছা কবে থেকে?
নন্দিতা: গোয়েন্দা গল্প আমার খুব প্রিয়। আজও আমি গোয়েন্দা গল্প না পড়ে বা না শুনে ঘুমোতে যেতে পারি না। এটা এত বছর বাদে যে সুযোগ এল সেটা খুবই আনন্দের এবং তৃপ্তির। আমি গোয়েন্দা গল্পের জন্য পাগল। আমি এই ধরনের গল্পগুলো শুনেই বড় হয়েছি।
প্রশ্ন: গল্প শোনানোর মানুষগুলো এখন হারিয়ে যাচ্ছে?
নন্দিতা: আমার জীবনে এমন গল্প বলার যে মানুষগুলো ছিলেন, আমার ফুলপিসি, রাঙামাসি এরাই। গোয়েন্দা গল্পের প্রতি ভালবাসা সেই থেকেই তৈরি হয়েছে। প্রথম ব্যোমকেশ তাঁদের কাছে শোনা। কিরীটি, ফেলুদাকেও তাঁদের গল্পের মাধ্যমেই চিনেছি। এই ছবির মাধ্যমে আমি তাঁদেরই শ্রদ্ধা জানাচ্ছি। তাঁরাই আমায় গল্প শুনিয়ে গল্প বলার আগ্রহও তৈরি করেছিলেন। আজ যৌথ পরিবার কমে গিয়েছে। এই মানুষগুলো হারিয়ে যাচ্ছে, খুবই দুঃখ লাগে ভাবলে। দিদিমা, পিসিমারা নেই। কোথায় পাব তাঁদের। একটা কল্পনার জগৎ তৈরি হত।
‘সব ক্ষেত্রেই নারীদের উপর ভরসা কম’ ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্ন: মহিলা পরিচালকের এত অভাব কেন ইন্ডাস্ট্রিতে, এর কারণ কী বলে মনে হয়?
নন্দিতা: আমি জানি না সত্যি কেন। আসলে আমার মনে হয়, গল্প বলা কাজটা তো মহিলাদের। দাদু বা বাবারা কিন্তু কখনও গল্প শোনাতেন না আমাদের। মাসিমা, পিসিমা, দিদিমা, ঠাকুমারাই গল্প বলেন। নারীরা কেন গল্প বলছেন না আমি জানি না। আমি জীবনে বরাবরই গল্প বলতে চেয়েছি, আমি পেরেওছি। মনগড়া গল্প হলেও বলেছি। আমি চাই আরও মহিলা এগিয়ে আসুক। আমার বিশ্বাস, মেয়েরা খুব ভাল গল্প বলতে জানে।
প্রশ্ন: ইন্ডাস্ট্রিতে নারীদের প্রতি ভরসা কম করা হয়, মনে করেন?
নন্দিতা: এটা তো সব ক্ষেত্রেই নারীদের উপর ভরসা কম। শুধু সিনেমা ইন্ডাস্ট্রিতেই নয়, বিভিন্ন ক্ষেত্রেই রয়েছে। যেখানেই কাজে যাবে, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ আমাদের, তাদের কথাই চলে। হয়তো মেয়েদের লড়াই করতে হবে। কিন্তু বেছে নেওয়াটা জরুরি। নারীরা কি করতে চায় নিজেদের হাতে। লড়ে যেতে পারলে, টিকে যেতে পারলে অবশ্যই জিতবে এক দিন।
প্রশ্ন: সমাজে লিঙ্গসাম্যের বিষয়টি কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে ?
নন্দিতা: সমাজে এখনও লিঙ্গসাম্য আসেনি। এখনও মেয়েরা পিছিয়েই আছি। কিন্তু হ্যাঁ, আমরা প্রতিদিন এগিয়ে যাচ্ছি, পিছিয়ে পড়ছি না। আমরা লড়াই করছি। আজ থেকে একশো বছর আগে এই পরিস্থিতিতে ছিলাম না। তবে আরও এগোতে হবে। আমি সবসময় মনে করি, নারীরা ভাল ‘লিডার’ হন। আমরা তো দশভুজা। মা দুর্গার মতোই আমরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কাজ করতে পারি। পুরুষেরা পারে না কিন্তু। পুরুষেরা সংসার, চাকরি, সন্তানদের মানুষ করা পারে না। পুরুষ মানুষ এই সব দায়িত্ব পেলে ধেড়িয়ে দেবে। এটা করতেই হবে এমন মানসিকতাটা নারীদের এইভাবে তৈরি। ফলে আমি মনে করি, নারীরা অনেক বেশি সফল।
‘সিনেমা সমাজে বদল আনতে পারে’ ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্ন: আপনাদের ছবিতে সমাজের নানা ইস্যু তুলে ধরা হয়। কী মনে হয়, ছবির মাধ্যমে সমাজে বদল আনা সম্ভব?
নন্দিতা: অনেকটা বদল আনা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি। এখনও মানুষ সিনেমা দেখতে ভালবাসে। সমাজের মানুষ সিনেমা দেখে প্রভাবিত হয়। ভাবে সেটাই সত্যি। সিনেমা মাধ্যমটি বার্তা দেওয়ার জন্য দারুণ মাধ্যম। আমি বলছি না রূঢ় ভাবে আনতে। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেও যদি মানুষের হৃদয় ছুঁয়ে যায় তা হলে তা ভাল। পড়াতে চেষ্টা করলে তা দর্শককে আগ্রহ দেবে না। আসলে মানুষকে ভাবাতে হবে। দর্শক যাতে কিছু দেখে সেটা নিয়ে চিন্তা করেন, বাড়ি নিয়ে যান, তবেই গল্প বলা এবং বার্তা দেওয়া সফল হবে।
প্রশ্ন: ২৫ বছর পরিচালক জুটি হিসাবে কাজ, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এই সফর কেমন?
নন্দিতা: এটা একটা মজার সম্পর্ক আমাদের মধ্যে। প্রত্যেকদিন শিবু একটা নতুন আইডিয়া নিয়ে আসে আমার কাছে। চেষ্টা করে যদি বাজিমাত করতে পারে। আমি খুব মজা পাই সত্যি করে বলতে। কিন্তু শিবুকে বলি না। কিন্তু ওকে রিজেক্ট করলেও ও কিন্তু দমে যায় না। আবার নতুন করে ভাবে। এই যে ভাববার সুযোগ দিই ওকে, আমার মনে তাতে শিবুরও উত্তরণ হয়।
‘আমাদের মধ্যে বোঝাপড়াটাই আসল’ ছবি: সংগৃহীত
প্রশ্ন: সেই থেকেই নতুন ভাবনা জন্মায়?
নন্দিতা: আমাদের মধ্যে একটা খেলা চলে। ও একটা করে ভাবনা বলে আর আমি বলি, না না এই কনসেপ্ট চলবে না। ও তখন আবার নতুন করে ভাবে। একটা লাইনে গল্প বলে। একটা আইডিয়া দিয়ে বলে সিনেমা করতে। মানে ধরা যাক একটা ডাকাত ছিল, একটা গ্রামের ছেলে ডাকাতি করে, এ বার আপনি গল্প বানান, বলে আমায়। গল্প তৈরি করতে হবে আমায়। যেটা দিয়ে আড়াই ঘণ্টার ছবি তৈরি হবে। মারতে ইচ্ছে করে না ওকে?
প্রশ্ন: মতবিরোধ বা ক্রিয়েটিভ ডিফারেন্স নিশ্চয়ই হয়?
নন্দিতা: আমাদের মতবিরোধ হয় না। আসলে এত দিন একসঙ্গে আছি না আমরা যে আমাদের মতের অমিল হয় না। আমি জানি ও পরের কথা কী বলবে, প্রেম করা যেমন। একই প্রশ্ন আলাদা ভাবে শিবুকে আর আমাকে করলেও একই উত্তর পাবে। এতটাই বোঝাবুঝি আমাদের মধ্যে। কারণ, এতদিন ক্রিয়েটিভিটির মধ্যে দিয়ে আমরা রয়েছি একসঙ্গে। ও কোন গান, কোন মিউজ়িক ভালবাসে আমি জানি। শিবু কখন কেঁদে ফেলবে সেটাও আমি জানি। মা-বাবাদের মধ্যে যেমন হয় ঠিক তেমনই। এমনই আমাদের পার্টনারশিপ।