মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
রবিবারের মেঘ কেটে সোমবার রোদ উঠেছে লন্ডনে। দীর্ঘ বিমানযাত্রার ধকলের পর প্রথম দিন মূলত বিশ্রামেই ছিলেন মমতা। সোমবার বেরিয়ে পড়লেন। ভারতীয় দূতাবাসের কর্মসূচির আগে সদলবলে হেঁটে নিলেন রাস্তায়। কখনও দৌড়ও। মমতার ভাষায় ‘ওয়ার্ম আপ’।
রানির ডাক
লন্ডনের রাস্তায় বেরিয়ে পড়লেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কাকতালীয়। কিন্তু সোমবার সকাল থেকে বিশ্রী ঠান্ডা আর স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়া কেটে গিয়ে ঝলমলে রোদ্দুর উঠে গেল। সাদা শাড়ির উপর গাঢ় নীল ফ্লিস জ্যাকেট, গলায় একটা চাদর পেঁচানো। পায়ে একটা পাতলা মোজা আর সাদা হাওয়াই চটি ফটফটিয়ে চললেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী। সঙ্গে মুখ্যসচিব মনোজ পন্থ, নিরাপত্তা প্রধান পীযূষ পান্ডে, শিল্পপতি সত্যম রায়চৌধুরী এবং তাঁর পুত্র দেবদূত। ছিলেন রিলায়্যান্সের প্রেসিডেন্ট তরুণ ঝুনঝুনওয়ালা, শিল্পপতি সিকে ধানুকা, সঞ্জয় বুধিয়া। হোটেল থেকে বেরিয়ে বাকিংহাম প্যালেসের পাশের রাস্তা ধরে হাইড পার্ক। প্রাসাদের সামনে বেজায় ভিড়। খানিক আগে ‘চেঞ্জ অফ গার্ডস’ হয়েছে। পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় মমতা স্বগতোক্তি করলেন, ‘‘আমি এই প্রাসাদের ভিতরে গিয়েছিলাম। আমায় রানি ডেকেছিলেন।’’ ঠিকই। ২০১৫ সালে লন্ডন সফরে এসে বাকিংহাম প্যালেসে গিয়েছিলেন মমতা।
অক্সফোর্ডে দিদি-দাদা
দিদি বক্তৃতা করবেন অক্সফোর্ডের কেলগ কলেজে। সঙ্গে যাবেন দাদা। ২৭ তারিখ সন্ধ্যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কর্মসূচি অক্সফোর্ডে। তার সঙ্গেই সেখানে যাবেন সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়। মমতার অক্সফোর্ড কর্মসূচির আগের দিন লন্ডনে আসছেন সৌরভ। তবে এ শহরে সৌরভ অতিথি নন। টেমসের ধারে লন্ডন আইয়ের কাছে তাঁর বসত। সেই ফ্ল্যাটে থাকেন কন্যা সানা। যিনি লেখাপড়া শেষ করে এখানেই কর্মরত। আপাতত সৌরভের স্ত্রী ডোনাও লন্ডনে। তাঁর ট্রুপ নিয়ে হোলির অনুষ্ঠানের মহড়া দিতে ব্যস্ত। এক ফাঁকে তিনিও এসে দেখা করে যাবেন দিদির সঙ্গে।
রাঙাবিতান
হাইড পার্কে ঢুকেই থমকে দাঁড়ালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। নীচে একটা ছোট জলাশয়। হাঁস চরছে। গাছগাছালির ভিড়। উপর থেকে সে দিকে তাকিয়ে মমতা বলছিলেন, ‘‘আমরা শান্তিনিকেতনের রাঙাবিতানটা এই রকম করেছি।’’ বলতে বলতে সঙ্গীদের আমন্ত্রণও জানিয়ে ফেললেন রাঙাবিতানে ঘুরে আসার জন্য। তার পরে আবার বেরিয়ে পড়লেন হন্টনে।
হাইড পার্কে মমতা। —নিজস্ব চিত্র।
মর্নিং ওয়াক নয়, ওয়ার্ম আপ
হাঁটতে হাঁটতে কেউ একজন কলকাতায় ফোনে বলছিলেন, মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কানে যেতেই শুধরে দিলেন মমতা, ‘‘মর্নিং ওয়াক নয়, ওয়ার্ম আপ!’’ সেটা মন্দ বলেননি অবশ্য। সোমে ভারতীয় দূতাবাসে কর্মসূচি, মঙ্গলে শিল্প সম্মেলন, বুধ এবং বৃহস্পতিবারেও কর্মসূচি আছে মুখ্যমন্ত্রীর। তার জন্যই গা ঘামানো শুরু হল সোম সকালে।
লন্ডনের ফুটপাথে মমতা। —নিজস্ব চিত্র।
হাইড পার্ক-ইকো পার্ক
লন্ডনের হাইড পার্ক দেখেই ইকো পার্কের ‘আইডিয়া’ নিয়েছিলেন। হাঁটতে হাঁটতে জানালেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর কথায় ঘটনাপ্রবাহ হল, উত্তরবঙ্গ সফর সেরে ফেরার পথে নিউ টাউনের ওই বিস্তীর্ণ এলাকা সরেজমিনে দেখতে গিয়েছিলেন মমতা। তখন পুরো এলাকা জল-জঙ্গলে ঘেরা। সে ছবিও তুলে রেখেছিলেন। তার পরেই সেখানে কাজ শুরু করান তিনি। দেখতে দেখতে বিশাল জলাশয়কে ঘিরে পার্ক তৈরি হয়। তৈরি হয় বিশ্বের সাতটি আশ্চর্যের অনুকৃতিও। ছুটির দিনে সেখানকার ভিড় অনেক সময় টেক্কা দেয় চিড়িয়াখানা বা জাদুঘরের ভিড়কেও। তবে সেই পার্কের অনুপ্রেরণা যে এই হাইড পার্ক, তা মমতা না জানালে কে জানত!
আবার দৌড়!
দু’বছর আগে স্পেন সফরে গিয়ে মাদ্রিদের সেন্ট্রাল পার্কে হাঁটতে হাঁটতে দৌড় শুরু করেছিলেন। সোমবার সকালে লন্ডনের হাইড পার্কেও খানিকটা দৌড়ে নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সে অর্থে দৌড় নয় যদিও। হালকা জগিং বলাই ঠিক। তবে শুধু নিজে যে দৌড়লেন তা নয়, সঙ্গীদেরও দৌড় করিয়ে ছাড়লেন। কয়েক জনকে মৃদু বকুনিও দিলেন ফাঁকিবাজির জন্য। তার পরে অন্তত ৫০০ পা পিছন ফিরে হাঁটলেন। বললেন, ‘‘এটা শরীরচর্চার জন্য আরও বেশি দরকারি। বিশেষত, পাহাড়ে গেলে।’’ বিবিধ স্মৃতিসৌধ আছে হাইড পার্ক জুড়ে। বিভিন্ন যুদ্ধে নিহতদের শহিদবেদি। প্রতিটির পাদদেশেই কে বা কারা রেখে গিয়েছেন পুস্পস্তবক। প্রতিটির সামনেই কিছু সময় দাঁড়িয়ে নীরবে শ্রদ্ধা জানালেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী।
সোমবার সকালে সঙ্গীদের নিয়ে খানিকটা দৌড়েও নিলেন মমতা। —নিজস্ব চিত্র।