ভারতের কাছে ভিক্ষা চাইছে ইউরোপ। এই ভাষাতেই এ বার পশ্চিমি দেশগুলিকে বিদ্রুপ করল রাশিয়া। ইউক্রেন যুদ্ধের তিন বছর পূর্তিতে মস্কোর এ-হেন মন্তব্যকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞেরা। যদিও বিষয়টিতে কোনও প্রতিক্রিয়া দেয়নি নয়াদিল্লি।
চলতি বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি দু’দিনের ভারত সফরে আসেন ইউরোপীয় কমিশনের সভাপতি উরসুলা ফন ডার লিয়েন। সঙ্গে ছিলেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) ২০ জনের বিরাট প্রতিনিধিদল। নয়াদিল্লিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তিনি। তাঁর এই সফরের মধ্যেই পশ্চিমি দুনিয়াকে নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য করেছে রাশিয়া।
এ প্রসঙ্গে মস্কোর বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র মারিয়া জ়াখারোভা বলেন, ‘‘একটা সময়ে পশ্চিমি দুনিয়া মনে করত, ইউরোপ হল সাজানো বাগান। আর বিশ্বের বাকি দেশগুলি জঙ্গল। এখন সেই জঙ্গলের কাছে গিয়েই বাগান ভিক্ষা চাইছে। তাদের এর জন্য লজ্জা পাওয়া উচিত।’’ এই বিবৃতিতে অবশ্য কোনও দেশ বা ব্যক্তির নাম করেননি জ়াখারোভা। কিন্তু তার পরেও এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে বিশ্ব জুড়ে পড়ে গিয়েছে শোরগোল।
সম্প্রতি ইইউ থেকে আমদানি করা পণ্যের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক চাপানোর কথা ঘোষণা করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর্থিক বিশ্লেষকদের দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের এ-হেন সিদ্ধান্তে রীতিমতো আতঙ্কিত গোটা ইউরোপ। কারণ এতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্যে ইইউ-ভুক্ত দেশগুলির লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। সেটা দূর করতেই প্রতিনিধিদল নিয়ে ভারতে ছুটে এসেছেন এর কমিশনার উরসুলা।
ইউরোপীয় কমিশনারের এটাই প্রথম ভারত সফর। এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করে একে ঐতিহাসিক বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। অন্য দিকে গত কয়েক বছর ধরেই চিনের উপর থেকে নির্ভরশীলতা কমাতে ইউরোপের সঙ্গে সখ্য বৃদ্ধির চেষ্টা চালাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। সেই লক্ষ্যে তিনি ও তাঁর সরকার যে কিছুটা সফল হয়েছেন, উরসুলার সফরে সেই ইঙ্গিত মিলেছে।
এক্স হ্যান্ডলে (সাবেক টুইটার) পোস্ট করা ভিডিয়োয় ভারত ও ইউরোপকে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী গণতন্ত্র হিসাবে দেখানো হয়েছে। নয়াদিল্লির সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ককে আরও মজবুত করার কথা বলেছেন উরসুলা। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, প্রযুক্তি এবং প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সঙ্গে তিনি আলোচনা করেছেন বলে জানা গিয়েছে।
এর পাশাপাশি ইইউ কমিশনারের ভারত সফরের আরও একটি উদ্দেশ্য রয়েছে। রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা চাপাতে নয়াদিল্লিকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে চলেছেন তিনি। বিশেষজ্ঞদের অনুমান, বিনিময়ে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এবং ভারতীয়দের ঢালাও ভিসা দেওয়ার ব্যাপারে সম্মতি জানাতে পারে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলির এই সংগঠন।
ট্রাম্প মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই মস্কোর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক অন্য দিকে বাঁক নিয়েছে। ধীরে ধীরে বৈরিতা কাটিয়ে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে কাছে টানার চেষ্টা করছেন তিনি। বিষয়টিকে একেবারেই ভাল চোখে দেখতে নারাজ পশ্চিমি দুনিয়া। যুক্তরাষ্ট্রের এই মনোভাব মস্কোকে আগ্রাসনের সুযোগ করে দিচ্ছে বলে মনে করছে তারা।
অন্য দিকে বিষয়টি নিয়ে মুখ খুলেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন। তিনি বলেছেন, ‘‘আমেরিকার সঙ্গে মস্কোর সম্পর্কের উন্নতিকে ভাল চোখে দেখছে না ইউরোপ। ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হোক, সেটা তারা চায় না। আর তাই সেখানে চিড় ধরানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে। এটা আমরা কখনওই মেনে নেব না।’’
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞদের একাংশের অনুমান, পরিস্থিতি যে দিকে গড়াচ্ছে তাতে রাশিয়ার উপর থেকে ধীরে ধীরে যাবতীয় নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পথে হাঁটতে পারেন ট্রাম্প। সেটা ইউরোপের জন্য হবে সবচেয়ে বড় ধাক্কা। আর তাই নিষেধাজ্ঞার চাপ বজায় রাখতে ভারতকে পাশে পেতে চাইছে ইইউ।
যদিও এই ইস্যুতে নয়াদিল্লির সমর্থন পাওয়া বেশ কঠিন বলেই মনে করেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞেরা। কারণ, লম্বা সময় ধরে রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত দিক থেকে অত্যন্ত গভীর সম্পর্ক রয়েছে ভারতের। ইইউর প্ররোচনায় মোদী সরকার সেটা ভেঙে ফেলবে, এই ধারণা কষ্টকল্পিত।
দ্বিতীয়ত, হাতিয়ারের ব্যাপারে ভারতীয় ফৌজ এখনও মস্কোর উপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল। সেনার তিনটি বিভাগই ঢালাও রুশ অস্ত্র ব্যবহার করে থাকে। পশ্চিমি দেশগুলির মধ্যে একমাত্র ফ্রান্সের সঙ্গেই সেই অর্থে বড় অঙ্কের প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে নয়াদিল্লি। জার্মানি-সহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলি এ ব্যাপারে ভারতকে যে খুব কাছে টেনে নিয়েছে, সে কথা বলা যাবে না।
আগামী ১০-১৪ মার্চ বেলজ়িয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে হবে ভারত-ইইউ-র বাণিজ্য বৈঠক। বিশেষজ্ঞদের দাবি, তার আগে গাড়ি, মদ-সহ বিভিন্ন পণ্যে আমদানি শুল্ক কমাতে দিল্লির উপরে চাপ তৈরি করতে চাইছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন। সেই লক্ষ্যেই ভারত সফরে এসেছেন উরসুলা ফন ডার লিয়েন।
ইইউ কমিশনারের ‘ভারত প্রেমে’ রুশ খোঁচাকে অবশ্য শাপে বর বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞেরা। তাঁদের যুক্তি, এর জেরে এক ঢিলে দুই পাখি মারতে পারবে নয়াদিল্লি। প্রথমত, আমেরিকার আগ্রাসী শুল্ক নীতির জন্য নিজেদের ঘরোয়া বাজার ভারতের জন্য খুলতে পারে ইউরোপ। দ্বিতীয়ত, ঢালাও ভিসা দিলে ইইউ-ভুক্ত দেশগুলিতে কাজ পেতে সুবিধা হবে ভারতীয়দের।
আমেরিকার মতোই ভারতের উচ্চ হারের শুল্কনীতি নিয়ে আপত্তি রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের। তবে রাষ্ট্রগোষ্ঠী হিসেবে নয়াদিল্লির বৃহত্তম বাণিজ্য সহযোগী ইইউ। গত বছর দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য পরিমাণ ছিল ১২,৬০০ কোটি ডলার। এক দশকে এই অঙ্ক বেড়েছে ৯০ শতাংশ।
সম্প্রতি দিল্লিতে মুক্ত বাণিজ্য বৈঠকে যোগ দেন ব্রিটেনের বাণিজ্যমন্ত্রী জোনাথন রেনল্ডস এবং বিনিয়োগমন্ত্রী পপি গুস্তাফসন। পরে তাঁরা বলেন, ভারতের সঙ্গে ১৭টি নতুন রফতানি এবং লগ্নি চুক্তির ঘোষণা হয়েছে। যদিও এই নিয়ে ব্রিটেনের তরফে সবিস্তার কিছু বলা হয়নি।
গত ১ ফেব্রুয়ারি সংসদে পেশ করা বাজেটে বিমা ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বিদেশি লগ্নির ঊর্ধ্বসীমা বৃদ্ধি করেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন। আগে এটি ছিল ৭৪ শতাংশ। এ বারের বাজেটে সেই অঙ্ক বাড়িয়ে ১০০ শতাংশ করেছেন তিনি। ফলে ভারতে বিদেশি বিমা সংস্থাগুলি ব্যবসা বৃদ্ধি করতে পারবে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে এত কিছুর পরেও রাশিয়ার মন্তব্যকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞেরা। কারণ, এর আগেও বহু বার নানা ইস্যুতে নয়াদিল্লির পাশে দাঁড়িয়েছে মস্কো। তার মধ্যে এ বারের প্রতিক্রিয়া সব কিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে। জ়াখারোভার বিবৃতির পর দুই দেশের বাণিজ্যিক এবং প্রতিরক্ষা সম্পর্ক আরও মজবুত হবে বলে স্পষ্ট করেছে ওয়াকিবহাল মহল।