Chinese New Rocket Launching System

রেলগাড়ির মতো প্রতি দিন মহাকাশে পাঠানো যাবে রকেট! চিনা উৎক্ষেপণ পদ্ধতিতে লালবাতি জ্বলবে মাস্কের সংস্থায়?

মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ বা নভোযান পাঠাতে নতুন রকেট উৎক্ষেপণ প্রযুক্তি তৈরি করতে চলেছে চিন। এতে মার্কিন ধনকুবের ইলন মাস্কের সংস্থায় লালবাতি জ্বলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকদের একাংশ।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০২ এপ্রিল ২০২৫ ১৭:২৫
Share:
০১ ২১

অর্থনীতি থেকে ফৌজি শক্তি। সব ক্ষেত্রে আমেরিকাকে কড়া টক্কর দিচ্ছে চিন। সেই তালিকায় এ বার যুক্ত হল মহাকাশ গবেষণা। কৃত্রিম উপগ্রহ বহনকারী নতুন রকেট লঞ্চিং সিস্টেম তৈরির দিকে নিঃশব্দে এগিয়ে চলেছে বেজিং। এই প্রকল্পে ড্রাগন সাফল্য পেলে অন্তরীক্ষে মার্কিন আধিপত্য যে অনেকটা ধাক্কা খাবে, তা বলাই বাহুল্য।

০২ ২১

সূত্রের খবর, নতুন রকেট লঞ্চিং ব্যবস্থায় কোনও অতিশক্তিশালী ইঞ্জিন ব্যবহার করবেন না চিনা মহাকাশ গবেষকেরা। বরং তড়িৎ চৌম্বকীয় শক্তির দ্বারা যানটিকে অন্তরীক্ষে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের। এতে কৃত্রিম উপগ্রহগুলি পাবে তীব্র গতি। পাশাপাশি, তাদের কক্ষপথে প্রতিষ্ঠা করতেও সমস্যা হবে না।

Advertisement
০৩ ২১

সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটিতে কাজ করছে গ্যালাকটিক এনার্জি নামের একটি চিনা সংস্থা। তাদের দাবি, সব ঠিক থাকলে ২০২৮ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রথম তড়িচ্চুম্বকীয় শক্তির রকেট লঞ্চিং ব্যবস্থা চালু করবে তারা। এতে বিশ্বব্যাপী মহাকাশ গবেষণার সংজ্ঞায় বড় বদল আসবে বলে মনে করা হচ্ছে। যদিও বিষয়টি নিয়ে সরকারি ভাবে এখনও কোনও ঘোষণা করেনি ড্রাগন-সরকার।

০৪ ২১

দক্ষিণ-পশ্চিম চিনের সিচুয়ান প্রদেশে রয়েছে চিনা সরকারের একটি মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠান। তাদের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট রকেট লঞ্চিং ব্যবস্থাটি তৈরিতে হাত দিয়েছে গ্যালাকটিক এনার্জি। সূত্রের খবর, এতে সুপার কন্ডাক্টিং চুম্বক ব্যবহার করছেন ড্রাগনের বিজ্ঞানীরা। এর ফলে মহাকাশযান বা কৃত্রিম উপগ্রহ বহনকারী রকেট সুপারসনিক (শব্দের চেয়ে বেশি) গতি পাবে বলে মনে করছেন তাঁরা।

০৫ ২১

এই গবেষণায় অনেকটাই যে সাফল্য এসেছে, তা ফলাও করে জানিয়েছে বেজিং। মার্চের শেষ সপ্তাহে সংশ্লিষ্ট বিষয়টি নিয়ে একটি খবর সম্প্রচার করে সিচুয়ান রেডিয়ো অ্যান্ড টেলিভিশন। সেখানে বলা হয়, উচ্চাভিলাষী তড়িচ্চুম্বকীয় রকেট লঞ্চিং ব্যবস্থার প্ল্যাটফর্ম ভাল ভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। এতে সিচুয়ানের স্থানীয় সরকারি কর্তাদের সঙ্গে ‘চায়না অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন’-এর (সিএএসআইসি) পদস্থ আধিকারিকেরাও ছিলেন।

০৬ ২১

সিচুয়ান রেডিয়ো অ্যান্ড টেলিভিশনে সম্প্রচারিত খবর অনুযায়ী, এই প্ল্যাটফর্ম থেকে উৎক্ষেপণের পর মহাকাশযান বা কৃত্রিম উপগ্রহ নিয়ে ম্যাক-১ গতিতে ছুটবে রকেট। নতুন পদ্ধতিতে কমবে জ্বালানির খরচ। ফলে মহাকাশযান উৎক্ষেপণ যাত্রিবাহী ট্রেনের মতো নিত্য দিনের পরিষেবা হয়ে উঠবে। চিনের এই দাবিকে অবশ্য ‘অতিরঞ্জিত’ বলেছেন অন্তরীক্ষ বিজ্ঞানীদের একাংশ।

০৭ ২১

এ ব্যাপারে সংবাদমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন সিচুয়ানের ‘জিয়াং কমার্শিয়াল স্পেস লঞ্চ টেকনোলজি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’-এর সভাপতি লি পিং। তাঁর কথায়, নতুন প্রযুক্তিতে রকেটের ভার বহনের ক্ষমতা দ্বিগুণ বৃদ্ধি পাবে। কমবে উৎক্ষেপণের খরচ। তা ছাড়া ঐতিহ্যবাহী লঞ্চপ্যাডগুলির রক্ষণাবেক্ষণের প্রয়োজন হয়। নতুন ব্যবস্থায় সেই ঝামেলা থাকবে না। ফলে ঘন ঘন উৎক্ষেপণ সম্ভব হবে।

০৮ ২১

২০১৮ সালে পথচলা শুরু করে গ্যালাকটিক এনার্জি। এখনও পর্যন্ত মোট ১৮টি সফল উৎক্ষেপণ করতে পেরেছে তারা। মোট ৭৭টি কৃত্রিম উপগ্রহকে সঠিক ভাবে কক্ষপথে স্থাপন করার রেকর্ডও রয়েছে এই চিনা বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা সংস্থার। এই পরিসংখ্যান ড্রাগনের অন্য যে কোনও বেসরকারি অন্তরীক্ষ সংস্থার চেয়ে বেশি বলে জানা গিয়েছে।

০৯ ২১

চলতি বছরের ২১ মার্চ শেষ বার ছ’টি কৃত্রিম উপগ্রহ সূর্যের সমকালীন কক্ষপথে স্থাপন করে গ্যালাকটিক এনার্জি। এর জন্য সেরেস-১ রকেট ব্যবহার করেছে সংশ্লিষ্ট সংস্থা। জিউকুয়ান স্যাটেলাইট লঞ্চ সেন্টার থেকে কৃত্রিম উপগ্রহগুলিকে নিয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে রওনা হয় ওই রকেট।

১০ ২১

বর্তমানে সেরেস-২ নামের আরও উন্নত একটি রকেট তৈরিতে মন দিয়েছে গ্যালাকটিক এনার্জি। এর সম্পর্কে অবশ্য বিস্তারিত তথ্য দিতে সংস্থার তরফে অস্বীকার করা হয়েছে। তবে ‘সিচুয়ান রেডিয়ো অ্যান্ড টেলিভিশনে’ সম্প্রচারিত খবর অনুযায়ী, সেরেস-১-এর ভারবহন ক্ষমতা ছিল ৪০০ কেজি। সেরেস-২তে সেটা বেড়ে ৩.৫ টন দাঁড়াবে বলে জানা গিয়েছে। তবে নতুন রকেটটি তড়িচ্চুম্বকীয় লঞ্চিং ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা জানা যায়নি।

১১ ২১

চলতি বছরের শেষের দিকে চিনে আরও একটি কারখানা স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা সংস্থা গ্যালাকটিক এনার্জির। সেখান থেকে বছরে ২৪টি করে সেরেস-২ শ্রেণির রকেট তৈরির লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে তারা।

১২ ২১

২০২৭ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক ভাবে রকেট উৎক্ষেপণের কেন্দ্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করতে চাইছে সিচুয়ানের ‘জিয়াং কমার্শিয়াল স্পেস লঞ্চ টেকনোলজি রিসার্চ ইনস্টিটিউট’। এর জন্য পুনঃব্যবহারযোগ্য তড়িচ্চুম্বকীয় রকেট লঞ্চিং ব্যবস্থায় সাফল্য পেতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন চিনা মহাকাশ গবেষকেরা।

১৩ ২১

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে তড়িচ্চুম্বকীয় শক্তি ব্যবহার করে মহাকাশ উৎক্ষেপণের জন্য উচ্চ তাপমাত্রায় একটি সুপার কন্ডাক্টিং ম্যাগলেভ পরীক্ষা করে ‘চায়না অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি কর্পোরেশন’। তাতে আংশিক সাফল্য মিলেছিল। ওই পরীক্ষায় ৩৮০ মিটার ট্র্যাকে ঘণ্টায় ২৩৪ কিলোমিটার গতিবেগ পেয়েছিল ওই সুপার কন্ডাক্টিং ম্যাগলেভ।

১৪ ২১

অন্য দিকে অন্তরীক্ষে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর ক্ষেত্রে রকেট যুগের ইতি টানার চেষ্টা চালাচ্ছে মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা (ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন)। কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণে ক্যাটাপল্ট পদ্ধতি ব্যবহার করতে আগ্রহী আমেরিকা। এর ফলে জ্যোতির্বিজ্ঞানের সংজ্ঞা বদলে যাবে বলে দাবি করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

১৫ ২১

মহাকাশ গবেষণায় বিপ্লব আনতে চলা ক্যাটাপল্টের আবিষ্কর্তা আমেরিকার ক্যালোফোর্নিয়াভিত্তিক স্টার্ট আপ স্পিনলঞ্চ। কৃত্রিম উপগ্রহকে পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছে দিতে রকেটের বদলি হিসাবে ওই যন্ত্র তৈরি করেছে তারা। সংস্থাটির দাবি, এর সাহায্যে ব্যাপক সস্তায় কোনও যান বা কৃত্রিম উপগ্রহকে মহাশূন্যে পাঠানো যাবে। পাশাপাশি, ক্যাটাপল্ট পরিবেশবান্ধব হওয়ায় নেই কোনও দূষণের আশঙ্কা।

১৬ ২১

স্পিনলঞ্চ জানিয়েছে, ক্যাটাপল্টের সাহায্যে হাইপারসোনিক গতিতে (শব্দের পাঁচ গুণের চেয়ে বেশি গতি) কৃত্রিম উপগ্রহ বা অন্তরীক্ষ যান পৌঁছে যাবে সুনির্দিষ্ট কক্ষপথে। যন্ত্রটিতে রয়েছে ঘূর্ণায়মান দু’টি বিশাল হাতের মতো অংশ। এগুলির সাহায্যেই উৎক্ষেপণের পর গতির ঝড় তোলে ক্যাটাপল্ট।

১৭ ২১

রকেটের মতো স্পিনলঞ্চের এই যন্ত্রে প্রয়োজন হচ্ছে না কোনও জ্বালানির। ক্যাটাপল্ট পুরোপুরি বিদ্যুৎচালিত হওয়ায় এতে পরিবেশের ক্ষতি হওয়ার কোনও আশঙ্কা নেই। ক্যালিফোর্নিয়ায় স্টার্ট আপ সংস্থাটি শুধু মুখেই যে একাধিক দাবি করেছে এমনটা নয়। ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকটি পরীক্ষামূলক সফল উৎক্ষেপণ সেরে ফেলেছে স্পিনলঞ্চ।

১৮ ২১

এ-হেন ক্যাটাপল্ট যন্ত্রটির প্রেমে পড়ছেন নাসার তাবড় জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদেরা। আর তাই এয়ারবাস এবং মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগের সঙ্গে মিলে এর উন্নত সংস্করণ তৈরির দিকে মন দিয়েছেন তাঁরা। সূত্রের খবর, ২০২৬ সালের মধ্যে ক্যাটাপল্টের সাহায্যে একগুচ্ছ কৃত্রিম উপগ্রহ মহাশূন্যে পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে আমেরিকার মহাকাশ গবেষণা সংস্থার।

১৯ ২১

বর্তমানে কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে আধিপত্য রয়েছে বিশ্বের অন্যতম ধনকুবের তথা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘনিষ্ঠ ইলন মাস্কের সংস্থা স্পেসএক্সের। এই কোম্পানির প্রতিটা লঞ্চে খরচ হয় ন’লক্ষ পাউন্ডের বেশি জ্বালানি। আর তাই স্পেসএক্সের সাহায্যে মহাশূন্যে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর বিষয়টি বেশ খরচসাপেক্ষ।

২০ ২১

অন্তরীক্ষে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠিয়ে আমজনতার একেবারে বাড়িতে সরাসরি ইন্টারনেট পরিষেবা পৌঁছে দিচ্ছে মাস্কের সংস্থা। কিন্তু উৎক্ষেপণ খরচসাপেক্ষ হওয়ায় এর জন্য আমজনতার পকেট থেকে খসছে অনেকটাই বেশি টাকা।

২১ ২১

বিশ্লেষকদের দাবি, চিনা গ্যালাকটিক এনার্জি হোক বা ক্যালিফোর্নিয়ার স্পিনলঞ্চের ক্যাটাপল্ট, দুটোর যে কোনও একটি পুরোপুরি সাফল্য পেলে মাস্কের ব্যবসায় থাবা বসানোর সুযোগ চলে আসবে। উৎক্ষেপণ ব্যয়বহুল না হওয়ায় অনেক সস্তা দরে ইন্টারনেট পরিষেবাও দিতে পারবে এই সমস্ত সংস্থা। আর তখন বিপুল পরিমাণ গ্রাহক হারাবে মাস্কের সংস্থা।

সব ছবি: সংগৃহীত।

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, X (Twitter), Facebook, Youtube, Threads এবং Instagram পেজ)
Follow us on:
আরও গ্যালারি
Advertisement