Artificial Intelligence

কী ভাবব, বলবে এআই

গ্রক কিন্তু কোনও নতুন প্রযুক্তি নয়, প্রচলিত যন্ত্রমেধা চালিত চ্যাটবট। চ্যাটজিপিটির মতো চ্যাটবটগুলির মতো গ্রক-ও টেক্সট তৈরি করতে পারে এবং ব্যবহারকারীদের সঙ্গে কথোপকথনে সক্ষম।

Advertisement

স্বাগতম দাস

শেষ আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২৫ ০৭:১২
Share:

নরেন্দ্র মোদী কি এক জন ফ্যাসিস্ট?” এই প্রশ্নের উত্তরে অধিকাংশ যন্ত্রমেধা-নির্ভর চ্যাটবটই নিরাপদ উত্তর দেবে। কারণ, এই বিতর্কে চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, কিংবা পারপ্লেক্সিটি-র মতো এআই-নিয়ন্ত্রিত সিস্টেমের নির্মাতা সংস্থাগুলির ব্যবসায়িক ক্ষতির সম্ভাবনা। তাই ব্যবহারকারীর প্রশ্নের উত্তরকে ফিল্টার করার জন্য ওপেনএআই-এর মতো সংস্থা থাকে সদা সচেষ্ট। এখানেই ভারতের হিন্দুত্ববাদী ভক্তকুলের মধ্যে চরম শোরগোল ফেলে দিয়েছে ইলন মাস্কের সংস্থা এক্স-এর তৈরি গ্রক নামের চ্যাটবট। “ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে আরএসএস-এর ভূমিকা কী ছিল”— এমন সব প্রশ্নের যে উত্তর সেই চ্যাটবট দিচ্ছে, এবং যে গতিতে এক্স সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে উত্তরগুলি, তাতে এক দিকে হিন্দুত্ববাদী বাস্তুতন্ত্র প্রবল চটেছে, অন্য দিকে বিরোধীরা স্বভবতই উল্লসিত। এই উল্লাস সেই সত্তরের দশকে চোখের সামনে অন্যায় হতে দেখে নিজে কিছু না করতে পারলেও রুপোলি পর্দায় রাগী যুবক নায়ককে দেখে সিটি মারার মতো। সেই সঙ্গে আমাদের ভাবতে হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে ‘রাজা, তোর কাপড় কোথায়?’ বলে ওঠা সেই বাচ্চা ছেলেটার ভূমিকাও কি পালন করবে যন্ত্রমেধা-ই?

Advertisement

গ্রক কিন্তু কোনও নতুন প্রযুক্তি নয়, প্রচলিত যন্ত্রমেধা চালিত চ্যাটবট। চ্যাটজিপিটির মতো চ্যাটবটগুলির মতো গ্রক-ও টেক্সট তৈরি করতে পারে এবং ব্যবহারকারীদের সঙ্গে কথোপকথনে সক্ষম। কিন্তু গ্রককে অন্যদের থেকে আলাদা করে তার এক্স সমাজমাধ্যমের সাহায্যে একেবারে সর্বাধুনিক তথ্য ও খবরাখবর সম্পর্কে নিজেকে ওয়াকিবহাল রাখার ক্ষমতা। চ্যাটজিপিটির ভাঁড়ারে তথ্য যেখানে ২০২৩ পর্যন্ত, সেখানে গ্রক সাম্প্রতিক ঘটনাবলি নিয়ে কথা বলতে খুবই পটু, যেমন ইজ়রায়েল-হামাস যুদ্ধ বা ২০২৪ সালের সুপার বোল। তা ছাড়াও প্রচলিত কনটেন্ট ফিল্টারিং বা বিষয়ানুগ পরিস্রুতকরণের বালাই এখানে নেই। ফলে, অন্যান্য এআই যে সব প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে যায়, সেখানে গ্রক উস্কানিমূলক এবং বিতর্কিত প্রশ্নের উত্তর দেয় রীতিমতো হাস্যকর এবং বিদ্রোহী ভঙ্গিতে। উপভোক্তার প্রশ্ন যতই ‘বিপজ্জনক’ হোক না কেন, গ্রকের খুব একটা পরোয়া নেই। যেম, গ্রক ‘শিক্ষামূলক উদ্দেশ্যে’ কোকেন তৈরির জন্য ধাপে ধাপে নির্দেশ সাজিয়ে দিয়েছে! দিন কয়েক আগে দিল্লি পুলিশ মজা করে গ্রককে প্রশ্ন করেছিল, “তোমার কি কখনও ট্র্যাফিক ফাইন হয়েছে?” গ্রক উত্তর দিয়েছে, “আমি তো ডিজিটাল এআই, দিল্লির ড্রাইভার না!”

যে কোনও জটিল যন্ত্রমেধাতন্ত্রের আউটপুটটি নির্ভর করবে তাকে প্রশিক্ষিত করতে কেমন তথ্য ব্যবহার করা হয়েছিল তার উপরে। যে-হেতু গ্রককে এক্স-এর সমস্ত আলাপচারিতার তথ্যের ভিত্তিতে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, এটি স্বাভাবিক ভাবেই সেখানে পাওয়া তর্ক এবং ভাষার ছাঁচ অনুসরণ করে, যার মধ্যে অদ্ভুত, ব্যঙ্গাত্মক উত্তর এবং এমনকি গালিগালাজের অন্তর্ভুক্তিও মোটেই আশ্চর্যের নয়। আসলে এটা কোনও আদর্শের বিষয়ই নয়, বরং গ্রক-এর ইনপুটের প্রকৃতি তার আউটপুটকে প্রভাবিত করছে মেশিন লার্নিং-এর স্বাভাবিক নিয়মে।

Advertisement

কিন্তু একই সঙ্গে গ্রক নিয়ে সাম্প্রতিক এই মাতামাতি আমাদের সমাজে মূল্যবোধ থেকে জনমত গঠনের ক্ষেত্রেও বৃহৎ ভাষা-প্রক্রিয়াকরণ মডেলগুলোর অবশ্যম্ভাবী ও বহুমাত্রিক ভূমিকাকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে। এআই পরিচালিত যে কোনও চ্যাটবটের উত্তর নির্বিষ থাকবে, না কি বিষ-মাখানো তিরের ফলার মতো তা ঘুরে যাবে কোনও বিশেষ রাজনৈতিক মতবাদ, দল, বা ধর্মীয় সম্প্রদায়ের দিকে, সেটা নিয়ন্ত্রিত হবে ওই চ্যাটবটের নেপথ্যে থাকা ভাষা প্রক্রিয়াকরণ মডেলটি কী ভাবে প্রশিক্ষিত হয়েছে তার ভিত্তিতে। এই প্রশিক্ষণের দায়িত্বে কে বা কারা? অবশ্যই চ্যাটবটটির মালিক, প্রযুক্তি-জগতের দানব-সদৃশ কোনও সংস্থা। সেই সংস্থার মডেলগুলোর থেকে অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রাম ইন্টারফেস বা এপিআই কিনে নিজেদের মতো করে চ্যাটবটকে শিখিয়ে-পড়িয়ে নিয়ে ব্যবসা চালাচ্ছে বহু স্টার্ট-আপ সংস্থা।

এপিআই-এর মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে বড় সংস্থার গ্রাহকত্ব ছেড়ে দিচ্ছে তারা, মুছে ফেলছে অ্যাকাউন্ট ও যাবতীয় নিজস্ব তথ্য। কিন্তু এ রকম অজস্র ছোট ছোট সংস্থার তথ্য ব্যবহার করে নেপথ্যে থাকা যন্ত্রমেধার ফাউন্ডেশন মডেলটি যে জ্ঞান লাভ করল, সেই জ্ঞানও কি মুছে যাচ্ছে তার যান্ত্রিক স্মৃতি থেকে? এর নিশ্চিত ও ইতিবাচক উত্তর দেওয়া দুঃসাধ্য, কারণ বৃহৎ মডেলটির প্রশিক্ষণের আসল পদ্ধতি ও ব্যবহৃত প্রতিটি তথ্য এআই গবেষকদের পরীক্ষা করে দেখার জন্য উন্মুক্ত নয় মোটেই, সেগুলো সেই মালিক সংস্থার সিন্দুকেই বন্দি। আর এখানেই লুকিয়ে আছে আসল বিপদ। ধরুন, সারা পৃথিবীর সবচেয়ে বুদ্ধিমান এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষগুলো যদি কেবল এক বা দু’জন ব্যবসায়ীর কথা শুনেই কথা বলেন— তখন যে বিপদ ঘনাবে, এটাও অনেকটা সেই রকম।

চ্যাটজিপিটি, গ্রক, জেমিনি, কিংবা ওয়টস্যাপ-সংলগ্ন মেটা এআই তৈরি করতে লাগে সমুদ্রসমান তথ্যভান্ডার, প্রচুর টাকা ও শক্তিশালী কম্পিউটার, যা কয়েকটি বড় সংস্থারই আছে— যেমন ওপেনএআই, গুগল, মেটা, বা অ্যামাজ়ন। কিন্তু যদি শুধু এ রকম কিছু সংস্থা এই শক্তিশালী প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তা হলে আমাদের সামনে ঘনিয়ে আসবে আধিপত্যবাদের বহুমুখী বিপদ। প্রথমত, এই সংস্থাগুলোর মালিকরা ঠিক করবে আমরা কী জানতে পারব, সত্যি-মিথ্যের কী ধরনের ককটেল আমাদের গেলানো হবে, আর কোন বিষয়গুলো চাপা পড়ে যাবে চিরতরে। ইতিহাস কে লিখবে এবং কী লেখা হবে তাও তারাই ঠিক করে দেবে। যেমন যদি কোনও দেশের নির্বিচারে গণহত্যার খবর তারা ‘আপত্তিকর’ ভেবে না দেখায় বা সেই সংক্রান্ত কোনও তথ্যই না দেয়, তা হলে সেটার অস্তিত্বই বাকি পৃথিবীর কাছে হারিয়ে যেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, যদি পিছিয়ে পড়া দেশের সাধারণ মানুষ বা ছোট প্রতিষ্ঠান এই মডেলগুলো ব্যবহার করতে না পারে, তা হলে তারা উন্নত শিক্ষা বা গবেষণায় যোগ দিতে পারবে না। এতে সমাজে দারুণ বৈষম্য তৈরি হবে। তৃতীয়ত, যে জনমত আসলে তৈরি হয় মাঠে, মিছিলে, চায়ের দোকানে, রাস্তায় বা বাজারে, মানুষকে স্মার্টফোনের স্ক্রিনে নজরবন্দি রেখে সেই জনমতকেই নিজেদের ধাঁচে প্রভাবিত করতে এআই নিয়ন্ত্রিত এ সব মডেল ও সমাজমাধ্যমের যুগলবন্দি ক্রমশ আরও সফল হচ্ছে। মানুষে মানুষে সত্যিকারের কথাবার্তা যত কমে যাবে, মানুষ যত আরও বেশি নিজেকে গুটিয়ে একটা ডিজিটাল অস্তিত্বে বন্দি হয়ে পড়বে, তত এদের লাভ। রাজনীতি, নির্বাচন, আইন সব কিছুতেই এরা নিজেদের ইচ্ছামতো প্রভাব ফেলতে পারবে অদূর ভবিষ্যতে। সেই ভবিষ্যতে আমাদের জন্য অপেক্ষা করে থাকবে দুনিয়াজোড়া এক অদৃশ্য কিন্তু অমোঘ মগজ-ধোলাই যন্ত্র।

হিটলার এক সময় একটাই দেশ (জার্মানি) দখল করে একনায়ক হয়েছিলেন, তার পর রক্তক্ষয়ী একটা যুদ্ধ বাধিয়ে চেয়েছিলেন একটা গোটা মহাদেশকে কব্জা করতে। কিন্তু এই সংস্থাগুলো যদি ক্রমশ পুরো পৃথিবীর তথ্য ও মানুষের চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা পেয়ে যায়, তা হলে তারা কোনও দেশ বা মহাদেশের সীমানায় থামবে না। তাদের সাম্রাজ্য সকলের অলক্ষ্যেই বিস্তৃত হবে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের মাথার ভিতর। এই সংস্থাগুলো মানুষের চিন্তাভাবনা এমন ভাবে বদলে দেবে, যাতে মানুষ নিজের দাসত্বকেও ‘স্বাধীনতা’ ভাববে। সমাজমাধ্যম আর এআই মডেল ব্যবহার করে আজ কোনও একটি অনুন্নত দেশের সংস্কৃতি, ভাষা, বা ইতিহাসকেই ধীরে ধীরে মুছে ফেলাটা খুব শক্ত নয়, যাতে ভবিষ্যতের প্রজন্ম জানতেই না পারে যে কী ছিল তাদের উৎস, কী বা তাদের ঐতিহ্য।

এই প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণকে অতএব বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। এক্স-এআই’এর তৈরি গ্রক-১ কিন্তু ওপেন সোর্স— অর্থাৎ পুরো মডেলটি তার সমস্ত প্যারামিটার সমেত উন্মুক্ত, সকলের ব্যবহারযোগ্য। ইলন মাস্কের উদ্দেশ্যটি মহৎ কি না, তা নিয়ে মন্তব্য করার সময় এখনও আসেনি— কিন্তু যে কোনও বৃহৎ এআই মডেলেরই ওপেন সোর্স হওয়াটা নিঃসন্দেহে আজ সময়ের দাবি। পৃথিবীর সমস্ত সরকার ও সাধারণ মানুষের উচিত এই বিষয়ে সচেতন হওয়া। ভবিষ্যতে যদি কেবল গুগল, মেটা, বা ওপেনএআই-এর মতো সংস্থার হাতে মানবজাতির ‘চিন্তা করার ক্ষমতা’ বন্দি থাকে, তবে এক দিন তারা চাইলেই আমাদের কী ভাবতে হবে, কী জানতে হবে, এমনকি কী বিশ্বাস করতে হবে— সব ঠিক করে দেবে। সে দিন আমাদের অস্তিত্বও কি আর আমাদের নিজের থাকবে? এ প্রশ্ন শুধু প্রযুক্তির নয়, মানবাধিকারেরও।

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement