Advertisement

নবান্ন অভিযান

নিজের গড় নন্দীগ্রামকে আরও পোক্ত করলেন শুভেন্দু, বৃথা গেল তৃণমূলের ‘পবিত্র’ চেষ্টা! মিলল না অভিষেকের অনুমান

তমলুক লোকসভার অন্তর্গত নন্দীগ্রাম বিধানসভায় বিজেপি প্রার্থী তথা প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘লিড’ ছিল ৮ হাজারেরও বেশি। এ বার তাকেও ছাপিয়ে গেল বিজেপি।

আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা

শেষ আপডেট: ০৪ মে ২০২৬ ১৮:৫৫
নন্দীগ্রামে জিতলেন শুভেন্দু অধিকারী।

নন্দীগ্রামে জিতলেন শুভেন্দু অধিকারী। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

নন্দীগ্রাম রইল শুভেন্দু অধিকারীরই। নন্দীগ্রাম রইল বিজেপির-ই। পাঁচ বছর আগে তবু লড়াই হয়েছিল। এ বার একপেশে ভাবে তৃণমূলকে দুরমুশ করে জিতলেন শুভেন্দু। ব্যবধান দাঁড়াল ১০ হাজারের বেশি। বিজেপি থেকে ভেঙে এনে পবিত্র করকে প্রার্থী করার কৌশল কার্যত বৃথা গেল তৃণমূলের। ডাহা ফেল করল নন্দীগ্রাম নিয়ে করা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভবিষ্যদ্বাণীও। নিজের গড় ডায়মন্ড হারবারের প্রচার থেকে অভিষেক বলেছিলেন, ‘‘নন্দীগ্রামে তৃণমূল জিতছে!’’

হলদি নদীর তীরের এই জনপদ গত বিধানসভা নির্বাচনেও আলোচ্য ছিল। শুভেন্দুর বিরুদ্ধে নন্দীগ্রামে লড়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গণনাপর্ব শেষে শেষ হাসি হাসেন শুভেন্দুই। মুখ্যমন্ত্রী মমতাকে তিনি হারিয়েছিলেন ১,৯৫৬ ভোটে। সেই ফল নিয়ে কলকাতা হাই কোর্টে মামলা দায়ের হয়। পাঁচ বছর পরে আরও একটি বিধানসভা নির্বাচনের ফলঘোষণা হয়ে গেলেও হাই কোর্টে সেই মামলার নিষ্পত্তি হয়নি।

গত পাঁচ বছরে নন্দীগ্রামের ‘ক্ষত’ মেরামত করতে ধারাবাহিক প্রচেষ্টা জারি রেখেছিল তৃণমূল। সাংগঠনিক স্তরে নেতৃত্বের রদবদল, নন্দীগ্রামের দু’টি ব্লকে সভাপতি পদ তুলে দিয়ে কোর কমিটি গড়ে দেওয়ার মতো একাধিক পদক্ষেপ করার পরেও নন্দীগ্রামের তৃণমূলের অন্দরে জারি ছিল অবিশ্বাসের বাতাবরণ এবং সন্দেহের পরিবেশ। নন্দীগ্রামে শাসকদলের অন্দরে চালু লব্জ ছিল, ‘দিনে তৃণমূল, রাতে শুভেন্দু’। অর্থাৎ, তৃণমূলের অনেকেই তলায় তলায় শুভেন্দুর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলেন। পাল্টা পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের সৌজন্যে বিজেপির মধ্যেও এ হেন বাতাবরণ তৈরির কৌশল নিয়েছিল তৃণমূল। গত জানুয়ারি মাসে একান্ত আলোচনায় নন্দীগ্রামের তৃণমূলের অনেকেই দাবি করেছিলেন, বিজেপির মধ্যেও সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের আবহ তৈরি করা গিয়েছে।

বিজেপি যদিও সে সব কখনওই মানতে চায়নি। পদ্মশিবিরের বক্তব্য ছিল, এই জনপদে তাদের সংগঠন গত পাঁচ বছরে ইস্পাতদৃঢ় হয়েছে। ২০২১ সালের নির্বাচনেও দেখা গিয়েছিল, নন্দীগ্রামে মেরুকরণ প্রকট। গত পাঁচ বছরে তা শুধু বজায় থাকেনি, আরও চড়া দাগে পৌঁছেছে। চণ্ডীপুর থেকে নন্দীগ্রামের সীমানায় ঢুকলেই রাস্তার ধারে ধারে বজরংবলীর মূর্তি, হিন্দুত্বের পতাকার আধিক্য তার সাক্ষ্য বহন করেছে। বিধায়ক হিসাবে শুভেন্দুও গত পাঁচ বছর ধরে যেমন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তাঁর বিধানসভা এলাকায় ধারাবাহিক ছিলেন, তেমন ধর্মীয় কর্মসূচিতেও অংশগ্রহণ করেছেন নিয়মিত।

এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামকে ‘বিশেষ গুরুত্ব’ দিয়েছিলেন অভিষেক। গত জানুয়ারিতে নন্দীগ্রামের দু’টি ব্লকে স্বাস্থ্যশিবির সেবাশ্রয় করেছিলেন তিনি। ১৬ দিনে যে শিবিরে পরিষেবা গ্রহণ করেছিলেন প্রায় ৫০ হাজার মানুষ। শিবিরের উদ্বোধন করতে নিজে নন্দীগ্রামে গিয়েছিলেন অভিষেক। ডায়মন্ড হারবারের বাইরে একমাত্র নন্দীগ্রামেই সেবাশ্রয় হয়েছে অভিষেকের উদ্যোগে। বছরের শুরুতে অভিষেকের ওই কর্মসূচিই স্পষ্ট করে দিয়েছিল, শুভেন্দুর নন্দীগ্রামে ভোটের সলতে পাকানো শুরু করে দিয়েছে ক্যামাক স্ট্রিট।

তবে নন্দীগ্রামের প্রার্থী নিয়ে তৃণমূলকেও ভাবতে হয়েছে। কারণ, কালীঘাট থেকে ক্যামাক স্ট্রিট— তৃণমূলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব জানেন, নন্দীগ্রামের ১ নম্বর ব্লকের নেতাদের সঙ্গে ২ নম্বর ব্লকের নেতাদের সম্পর্ক কতটা ‘মধুর’। ফলে স্থানীয় তৃণমূলের কোনও নেতাকে যে শাসকদল প্রার্থী করবে না, সেই দেওয়াল লিখন স্পষ্টই ছিল। গত ১৭ মার্চ দুপুরে অভিষেকের হাত থেকে জোড়াফুলের পতাকা নিয়ে তৃণমূলে যোগ দেন ‘শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠ’ বলে পরিচিত পবিত্র। বিকালে নন্দীগ্রামের প্রার্থী হিসাবে তাঁর নামই ঘোষণা করেন মমতা এবং অভিষেক। পবিত্রকে প্রার্থী করার নেপথ্যেও তৃণমূলের মধ্যে মেরুকরণ এবং স্থানীয় সমীকরণ কাজ করেছিল। তৃণমূল নেতৃত্ব একটা বিষয়ে নিশ্চিত ছিলেন যে, নন্দীগ্রামের সংখ্যালঘু ভোটের প্রায় ষোলো আনাই তাঁদের বাক্সে আসবে। বিজেপির প্রতি পুঞ্জীভূত হওয়া হিন্দু ভোট ভাঙতে চেয়েছিল তৃণমূল। সে কারণেই পবিত্রকে প্রার্থী করা হয়। যাঁর সঙ্গে জুড়ে রয়েছে ‘হিন্দু সংহতি মঞ্চ’-এর মতো সংগঠন করার ইতিহাস। বয়াল এলাকার বাসিন্দা পবিত্র। ঘটনাচক্রে, পাঁচ বছর আগে ওই এলাকা থেকেই ‘লিড’ পেয়ে মমতাকে হারিয়েছিলেন শুভেন্দু। বিজেপির অনুকূলে সেই ছবির আরও বদল ঘটে গত লোকসভা নির্বাচনে। তমলুক লোকসভার অন্তর্গত নন্দীগ্রাম বিধানসভায় বিজেপি প্রার্থী তথা প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘লিড’ ছিল ৮ হাজারেরও বেশি। এ বার তাকেও ছাপিয়ে গেল বিজেপি। পবিত্রের লড়াইটা সহজ ছিল না। তবে গত ২৩ এপ্রিল প্রথম দফার নির্বাচনের দিন যুযুধান দুই শিবিরের দুই প্রার্থীর মেজাজ ছিল একেবারে ভিন্ন। শুভেন্দু নন্দীগ্রামের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত ছুটে বেড়িয়েছিলেন। আর পবিত্র বসে ছিলেন একটি নির্দিষ্ট এলাকায়।

২০০৭ সালে নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন রাজ্য রাজনীতির মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল। ধারাবাহিক জেদি লড়াই, তা রুখতে পুলিশের গুলি এবং পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে ১৪ জনের মৃত্যু টলিয়ে দিয়েছিল দীর্ঘদিনের বামশাসন। নন্দীগ্রামের সৌজন্যেই নতুন করে গতি পেয়েছিল সিঙ্গুর আন্দোলনও। নন্দীগ্রামের সেই জমি আন্দোলন থেকেই উত্থান হয়েছিল ‘নেতা’ শুভেন্দুর। গোড়া থেকে নানা দল এবং গোষ্ঠী নন্দীগ্রামের লড়াইয়ে থাকলেও, আন্দোলনের ‘মুখ’ হয়ে উঠেছিলেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী মমতা। ২০০৯ সালের লোকসভা ভোটে সিপিএমের লক্ষ্মণ শেঠের বিরুদ্ধে তমলুকে শুভেন্দুকে প্রার্থী করেন মমতা। শুভেন্দু জিতে সাংসদ হন। সেই সাংসদ শুভেন্দুকে ২০১৬ সালে বিধানসভায় ফেরান তৃণমূলনেত্রী। নন্দীগ্রাম থেকেই জেতেন শুভেন্দু। দ্বিতীয় মমতা সরকারে পরিবহণমন্ত্রীও ছিলেন। কিন্তু ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তৃণমূল ছেড়ে শুভেন্দু যোগ দেন বিজেপিতে।

সোমবার রাতে ভবানীপুর জয়ের পরে নিজের জেলা পূর্ব মেদিনীপুর ফিরে যান শুভেন্দু। সেখানে হলদিয়ার প্রশাসনিক দফতর থেকে নন্দীগ্রাম আসনে জয়ের শংসাপত্র গ্রহণ করেন তিনি।

নিজের গড় নন্দীগ্রামকে দুর্গে পরিণত করলেন শুভেন্দু। ক্ষমতায় পদ্মশিবির। ফলে নন্দীগ্রাম আর বিরোধী দলনেতার কেন্দ্র রইল না। নতুন সরকারে শুভেন্দুর পদমর্যাদার উপর নির্ভর করবে নন্দীগ্রামের নতুন পরিচয়।

সংক্ষেপে
  • প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, প্রচুর পরিমাণে ভোট পড়লে তা সাধারণত স্থিতাবস্থা বা প্রতিষ্ঠানবিরোধী হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন সরকারের বিপক্ষে যায় জনতার রায়। তবে দীর্ঘলালিত এই ধারণার প্রতিযুক্তিও ছিল। তৃণমূলের তরফে গত লোকসভা এবং বিধানসভা ভোটের উদাহরণ দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, অনেক ভোট পড়লেও এ রাজ্যে তা শাসকের পক্ষেই গিয়েছে বরাবর। বিজেপির পাল্টা যুক্তিতে আবার ছিল ২০১১ সালের ‘পরিবর্তনের ভোট’। সে বারও প্রচুর ভোট পড়েছিল এবং ৩৪ বছরের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে নতুন সরকার গড়েছিলেন মমতা। এ বারের ভোটে এসআইআর সুবিধা করে দিল বিজেপির।
  • ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) যে হয়রানিকে প্রচারে হাতিয়ার করেছিল তৃণমূল, তা কাজে এল না। পশ্চিমবঙ্গবাসী ভোট দিলেন বিজেপির পক্ষেই। ফলে এ রাজ্যেও ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তৈরি হতে চলেছে। পশ্চিমবঙ্গ জয় করেছে বিজেপি। গত লোকসভা নির্বাচনেও যে দল সে ভাবে দাঁত ফোটাতে পারেনি, দু’বছরের ব্যবধানে তারাই ২০০-র গণ্ডি ছুঁয়ে ফেলেছে। জেলায় জেলায় পদ্মের ঝড়ে উড়ে গিয়েছেন তৃণমূল প্রার্থীরা।
Nandigram Suvendu Adhikari BJP
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy