SSC Recruitment Case Verdict

চাকরিহারাদের দেখা পরীক্ষার খাতাও কি ‘অবৈধ’? পড়াবেন কারা? সুপ্রিম রায়ে ৫ জটিলতা দেখল আনন্দবাজার ডট কম

এসএসসির ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। শুক্রবার থেকে ২৫,৭৫২ জন রাজ্য সরকারি স্কুলগুলিতে আর চাকরি করতে পারবেন না। এর ফলে বেশ কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০৩ এপ্রিল ২০২৫ ১৯:৪৪
What complications have arrived due job cancellation by Supreme Court

কলকাতা হাই কোর্টের রায় বহাল রেখে ২৬ হাজার চাকরি বাতিল করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। —ফাইল চিত্র।

স্কুল সার্ভিস কমিশন (এসএসসি)-এ নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট যে রায় দিয়েছে, তাতে চাকরি গিয়েছে ২৫,৭৩৫ জনের। কলকাতা হাই কোর্টের রায় বহাল রেখে ২০১৬ সালের সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে দিয়েছে শীর্ষ আদালত। এর ফলে শুক্রবার থেকে ২৫,৭৩৫ জন রাজ্য সরকারি স্কুলগুলিতে চাকরি করতে পারবেন না। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এই রায়ের ফলে বেশ কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। কী ভাবে রাজ্য সরকারি স্কুলগুলিতে পঠনপাঠন এবং অন্যান্য কাজ চলবে, তা অনিশ্চিত। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই সমস্যার কথা মেনে নিয়েছেন। নবান্নে তিনি বলেছেন, ‘‘২৫ হাজার চাকরি বাদ দিয়ে দেওয়া হলে স্কুলে পড়াবে কে!’’

Advertisement

মানবিক কারণে শুধু ক্যানসার আক্রান্ত শিক্ষক সোমা দাসের চাকরি বহাল রেখেছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রধান বিচারপতি সঞ্জীব খন্না এবং বিচারপতি সঞ্জয় কুমারের ডিভিশন বেঞ্চ জানিয়েছে, ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যে প্রতিবন্ধী প্রার্থীরা চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁরা নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ না-হওয়া পর্যন্ত চাকরি করতে পারবেন। তবে তাঁদের চাকরিও বাতিল হচ্ছে। প্রতিবন্ধকতার কথা বিবেচনা করে তাঁদের এই বিশেষ ছাড় দেওয়া হয়েছে। নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়ায় তাঁরা অংশ নিতে পারবেন। বৃহস্পতিবার ২৬ হাজার চাকরি বাতিল সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের ৪১ পৃষ্ঠার রায় আনন্দবাজার ডট কমের হাতে এসেছে। এর ফলে আগামী দিনে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থায় কী কী জটিলতা তৈরি হতে পারে, তার হদিস পেতে চেষ্টা করল আনন্দবাজার ডট কম।

স্কুল অচল?

গত কয়েক বছর ধরে রাজ্য সরকারি স্কুলগুলিতে এসএসসির নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। ফলে আগে থেকেই শিক্ষক এবং শিক্ষাকর্মীদের ঘাটতি রয়েছে একাধিক স্কুলে। সুপ্রিম কোর্টের বৃহস্পতিবারের রায়ের ফলে আরও ২৫,৭৩৫ জনের চাকরি গেল। ফলে শিক্ষকের অভাবে স্কুলে অচলাবস্থা তৈরির আশঙ্কা রয়েছে। অনেক শিক্ষক-শিক্ষিকা সুপ্রিম কোর্টের রায় শুনে মাঝপথে স্কুল থেকে কাঁদতে কাঁদতে বেরিয়ে গিয়েছেন। পরীক্ষা চলাকালীন উঠে গিয়েছেন অনেকে। শুক্রবার থেকে স্কুল চলবে কী ভাবে, তা ভেবে মাথায় হাত প্রধানশিক্ষকদেরও। কুলতলির জামতলা ভগবানচন্দ্র হাই স্কুলের প্রধানশিক্ষক শান্তনু ঘোষাল বলেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্টের রায় শোনার পর ১১ জন শিক্ষক কাঁদতে কাঁদতে স্কুল থেকে বেরিয়ে গেলেন। বিজ্ঞান বিভাগের বিষয়গুলি এ বার কী ভাবে স্কুলে পড়ানো হবে? স্কুলে পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণির পরীক্ষা চলছে। প্রায় তিন হাজার ছাত্রছাত্রী। আমি স্কুল চালাব কী করে?’’ একই প্রশ্ন ঘুরছে আরও অনেক স্কুলে। শিক্ষকের অভাবে আপাতত স্কুল ছুটি দিয়ে দেওয়া হবে কি না, তা-ও বিবেচনা করছেন কোনও কোনও কর্তৃপক্ষ। শুধু তো ক্লাসে গিয়ে পড়ানো নয়, পরীক্ষার খাতা দেখা, পরীক্ষার হলে নজরদারি চালানো-সহ শিক্ষকদের অনেক বাড়তি কাজ থাকে। সে সব নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

পরীক্ষার দেখা খাতা কি ‘অবৈধ’?

সম্পূর্ণ নিয়োগ প্রক্রিয়া দুর্নীতির মাধ্যমে হয়েছে, জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রায় ২৬ হাজার প্রার্থীর চাকরির বৈধতা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। ২০১৬ সালের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় যাঁরা এই চাকরি পেয়েছিলেন, তাঁরা অন্তত সাত থেকে আট বছর চাকরি করেছেন। দেখেছেন মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের মতো বোর্ডের পরীক্ষার অজস্র খাতা। সেই সমস্ত পরীক্ষার ফলাফল কি তবে বৈধ? যাঁরা খাতা দেখেছেন, তাঁরাই যদি শিক্ষক হিসাবে বৈধ না-হন, তবে সেই সমস্ত খাতাগুলি কি ঠিকমতো দেখা হয়েছিল? সুপ্রিম-রায়ে প্রশ্ন উঠেছে। জটিলতা তৈরি হচ্ছে গত কয়েক বছরের মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীর ফলাফলের বৈধতা নিয়েও।

খাতা দেখবেন কারা?

২০২৫ সালের মাধ্যমিক এবং উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা কিছু দিন আগে শেষ হয়েছে। এখনও ফল প্রকাশিত হয়নি। এই বিপুল সংখ্যক পরীক্ষার খাতা কারা দেখবেন, সুপ্রিম কোর্টের রায়ে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। যাঁদের খাতা দেখার কথা, তাঁদের অনেকেরই চাকরি বাতিল হয়ে গিয়েছে। ফলে তাঁরা আর খাতা দেখার ‘যোগ্য’ নন। বাকি শিক্ষকদের উপর সে ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ পড়তে চলেছে। অনেকে বলছেন, এর ফলে প্রতি বছর যে নির্দিষ্ট সময়ে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকের ফল প্রকাশিত হয়, এ বছর তাতে বেশ খানিকটা দেরি হতে পারে। আর তা যদি হয়, তবে একাদশ-দ্বাদশ এবং কলেজগুলিতে নতুন ক্লাস শুরু হতেও দেরি হবে। গোটা প্রক্রিয়ায় জটিলতা আরও বাড়বে। উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সংসদের সভাপতি চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘ইতিমধ্যে অনেকে ফোন করে জানিয়েছেন, তাঁরা আর পরীক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থাকবেন না। অনেকে খাতা দেখতে চাইছেন না। আমরা এ বিষয়ে আলোচনা করছি। সরকারের সঙ্গেও কথা বলব।’’

শিক্ষাকর্মীদের কাজেও অচলাবস্থা

২৫,৭৩৫ জনের মধ্যে রয়েছেন গ্রুপ সি এবং গ্রুপ ডি কর্মীরাও। ফলে শুধু পঠনপাঠন নয়, স্কুলের অন্যান্য কাজেও অচলাবস্থা তৈরি হতে চলেছে শুক্রবার থেকে। বহু কর্মীই আর স্কুলে যেতে পারবেন না। নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না-হওয়া পর্যন্ত এই শূন্যপদগুলিতে কাজ আটকে থাকবে। এর ফলে নানা সমস্যা তৈরি হতে পারে। স্কুলে ক্লাস এবং অন্যান্য কাজ হবে কী ভাবে, প্রশ্ন তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী স্বয়ং। পরিসংখ্যান তুলে মমতা বলেছেন, ‘‘যাঁদের চাকরি বাতিল করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ১১৬১০ জন নবম-দশম শ্রেণিতে পড়াতেন। ৫৫৯৬ জন একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণিতে পড়াতেন। বাকিরা অন্য ক্লাসে। আপনারা জানেন, নবম-দশম, একাদশ-দ্বাদশ ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। এটি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার ‘গেটওয়ে’।’’

ওবিসিদের ছাড়া নিয়োগ?

পশ্চিমবঙ্গের অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (ওবিসি)-র শংসাপত্র বাতিল নিয়ে পৃথক মামলা চলছে সুপ্রিম কোর্টে। জুলাই মাসে সেই মামলার পরবর্তী শুনানি হওয়ার কথা। পদ্ধতি মেনে এই শংসাপত্র দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ তুলে কলকাতা হাই কোর্টে মামলা দায়ের হয়েছিল। বিচারপতি তপোব্রত চক্রবর্তী এবং বিচারপতি রাজাশেখর মান্থার ডিভিশন বেঞ্চ ২০১০ সালের পর থেকে তৈরি সব ওবিসি শংসাপত্র বাতিল করে দিয়েছে। হাই কোর্টের নির্দেশে অকেজো হয়েছে প্রায় ১২ লক্ষ শংসাপত্র। উচ্চ আদালতের সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টে গিয়েছিল। শীর্ষ আদালতে রাজ্য জানিয়েছে, ওবিসি সংরক্ষণের বিষয়ে নতুন করে সমীক্ষা শুরু হয়েছে। কারা ওবিসি তালিকাভুক্ত হওয়ার যোগ্য, তা যাচাই করা হচ্ছে। এর জন্য রাজ্যই তিন মাস সময় চেয়েছিল। আদালত তা মঞ্জুর করেছে। সেই মামলার নিষ্পত্তি না হলে এসএসসি মামলায় নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হবে কী ভাবে, প্রশ্ন উঠেছে। এই নতুন নিয়োগ কি তবে ওবিসিদের ছাড়াই হবে? দুই মামলা নিয়ে তৈরি হয়েছে জটিলতা।

ভ্রম সংশোধন: এই খবরটি প্রথম প্রকাশের সময়ে লেখা হয়েছিল, তিন মাসের মধ্যে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে বলেছে আদালত। কিন্তু এই তিন মাসের সময়সীমা সমগ্র নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আদালতের রায়ের প্রতিলিপিতে লেখা হয়েছে, চাকরিহারা যে প্রার্থীরা আগে কোনও সরকারি দফতরে বা সরকার পোষিত দফতরে চাকরি করতেন, তিন মাসের মধ‍্যে নতুন নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সংশ্লিষ্ট সরকারি দফতরকে তাঁদের চাকরি ফেরত দিতে হবে। অনিচ্ছাকৃত এই ত্রুটির জন্য আমরা দুঃখিত এবং ক্ষমাপ্রার্থী।

Advertisement
আরও পড়ুন