নার্সিংহোমের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় গাফিলতির অভিযোগ আকছারই ওঠে। এ বার এক প্রসূতির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অভিযোগের কাঠগড়ায় বরাহনগর পুরসভাচালিত মাতৃসদন এবং সেখানকার এক চিকিৎসক।
পুলিশ জানিয়েছে, সন্তান প্রসবের জন্য রিয়া ঘোষ (২৫) নামে এক মহিলা ওই মাতৃসদনে সুস্মিতা চৌধুরী নামে এক চিকিৎসকের অধীনে ভর্তি হয়েছিলেন। শনিবার সকালে সিজার করে ওই মহিলার একটি পুত্রসন্তান জন্মায়। বিকেলের পর থেকে রিয়ার অবস্থার অবনতি শুরু হয়। রাতে
তাঁকে আরজিকর হাসপাতালে ‘রেফার’ করা হয়। সেখানে নিয়ে গেলে রিয়াকে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা।
এই ঘটনার পরেই মাতৃসদনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন মৃতার পরিজনেরা। তাঁদের অভিযোগ, আরজিকর হাসপাতালে রোগিণীকে নিয়ে যাওয়ার আর্জি প্রত্যাখান করেন মাতৃসদনের অ্যাম্বুল্যান্সচালক। এমনকী, রোগিণী মারা যাওয়ার খবর জানিয়ে মাতৃসদনে রাতের ডিউটিতে থাকা আরএমও-র সঙ্গে কথা বলতে গেলেও তিনি আমল দেননি।
এই ঘটনার পরেই আরও উত্তেজিত হয়ে পড়ে রিয়ার পরিবার। পুরসভার একটি সূত্রের অভিযোগ, ক্ষোভে ফেটে পড়ে মাতৃসদনে ভাঙচুরও চালান তাঁরা। যদিও ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেছে মৃতার পরিবার। রবিবার সকালে হাসপাতালে গিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেন পুরসভার কাউন্সিলর অঞ্জন পাল। অঞ্জনবাবু বলেন, ‘‘ঘটনাটি নিয়ে অভিযোগ জানাতে বলেছি। তবে হাসপাতালের বাকি রোগীদের যাতে অসুবিধা না হয়, সেটাও তো দেখা উচিত।’’
গোটা ঘটনা জানিয়ে বরাহনগর থানা এবং পুরসভায় অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। পুরসভা সূত্রে খবর, পুলিশের পাশাপাশি পুরসভাও এই বিষয়ে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, বছর খানেক আগে কামারহাটির রথতলার বাসিন্দা দেবাশিস ঘোষের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল রিয়ার। রিয়ার খুড়শাশুড়ি সুপর্ণা ঘোষ পুলিশকে জানান, অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকে সুস্মিতাদেবীকেই দেখাতেন রিয়া। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে তাঁর প্রসব করার কথা ছিল। কিন্তু ১৭ এপ্রিল আচমকাই অসুস্থ হয়ে পড়েন রিয়া। তখন সুস্মিতাদেবী এলাকার বাইরে ছিলেন। বরাহনগর মাতৃসদনে নিয়ে যাওয়া হলে অন্য এক চিকিৎসকের পরামর্শ মতো গত বুধবার রিয়াকে ভর্তি করা হয়। শুক্রবার হাসপাতালে এসে রিয়াকে পরীক্ষা করেন
সুস্মিতাদেবী। তার পরে শনিবার রিয়ার সিজার করা হয়। অভিযুক্ত চিকিৎসক সুস্মিতা চৌধুরীর সঙ্গে অবশ্য যোগাযোগ করা যায়নি।
রিয়ার পরিবারের অভিযোগ, শনিবার বিকেল থেকেই রিয়ার শরীরে যন্ত্রণা শুরু হয়। এ ব্যাপারে রিয়ার পরিবার নার্সের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তিনি জানান, রোগিণীকে ব্যথা কমানোর ওষুধ দেওয়া হয়েছে। রাত ন’টা নাগাদ রিয়ার শারীরিক অবস্থা জানতে সুপর্ণাদেবীরা হাসপাতালে ফোন করেন। অভিযোগ, সে সময়ে জানানো হয় অপারেশনের পরে রোগীর সঙ্গে অতিরিক্ত কথা বলার জন্যই রক্তচাপ কমে গিয়েছে, অক্সিজেনের ঘাটতি রয়েছে। রাত দু’টো নাগাদ হাসপাতাল থেকে ফোন করে জানানো হয়, রিয়ার অবস্থা সঙ্কটজনক। পরিবারের লোকেরা যেন দ্রুত হাসপাতালে যান। সুপর্ণাদেবী জানান, রাতেই রিয়াকে আরজিকর হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলা হয়। মাতৃসদনের অ্যাম্বুল্যান্সচালক যেতে না চাইলে কামারহাটি পুরসভার অ্যাম্বুল্যান্স এনে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। বরাহনগর পুরসভার চেয়ারপার্সন অপর্ণা মৌলিকের অবশ্য দাবি, অ্যাম্বুল্যান্সচালক প্রত্যাখান করেননি। রিয়ার পরিবারের আগে আর এক সঙ্কটাপন্ন রোগীর বাড়ি থেকে ‘কল’ এসেছিল। হাসপাতাল এবং চিকিৎসকের গাফিলতি নিয়ে তাঁর মন্তব্য, ‘‘তদন্ত না করে এখনই কিছু বলা সম্ভব নয়।’
বেলঘরিয়ার একটি বেসরকারি নার্সিংহোমে রিয়ার সদ্যোজাত পুত্রসন্তান ভর্তি বলে পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে।