গ্রামের পথে উটের গাড়ি। —নিজস্ব চিত্র।
পেলব হাইওয়ে ছেড়ে রুখুসুখু গ্রামীণ সড়কে নেমে গ্রামের খোঁজ করতেই উটে টানা-ভ্যানচালক জানতে চান, ‘ইয়ানি সুনীতা উইলিয়ামসনম গামা ছে (সুনীতা উইলিয়ামসের গ্রাম খুঁজছ কী)!’
নাসার নভশ্চরের সঙ্গে তাঁর পৈতৃক ভিটে ঝুলাসান প্রায় সমার্থক হয়ে ওঠার পাশাপাশি, গুজরাতের এই প্রান্তিক গ্রামটি হালফিলে আরও একটি কারণে খবরের শিরোনামে ঠাঁই করে নিয়েছে। সুদিনের খোঁজে আমেরিকায় পাড়ি দেওয়া ঝুলাসান ও তার লাগোয়া তিনটি গ্রামের ২৪ জনের খোঁজ মিলছে না। গ্রামের সরপঞ্চ বা পঞ্চায়েত-সূত্র বলছে, মাস আটেক আগে ঝুলাসান এবং পড়শি গ্রাম ডেঙ্গুচা ও পানসারের জনা চব্বিশ মানুষ পাড়ি দিয়েছিলেন আমেরিকায়। চেনা এজেন্টের হাত ধরেই আমদাবাদ থেকে দুবাই হয়ে আমেরিকায় পৌঁছনোর কথা। কিন্তু মাস কয়েক ধরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। কোথায় উবে গেলেন তাঁরা?
ডেঙ্গুচা গ্রামের সেই ভাগ্যান্বেষী দলে শামিল হওয়া এক যুবকের ভাই সূরজ সিংহ (নাম পরিবর্তিত) বলছেন, ‘‘এজেন্টের হাতে মোটা টাকা আর নথিপত্র তুলে দিয়ে আমেরিকা পাড়ি দিয়েছিল ‘মোটাভাই’ (বড়দা)। এ তল্লাটে আমেরিকা বা কানাডা পাড়ি দেওয়ার এটাই চালু রেওয়াজ। কিন্তু চার মাস ধরে কোনও খোঁজ নেই।’’ কোন পথে কী ভাবে তারা আমেরিকায় যায়, এজেন্ট ছাড়া তার হদিস কেউ দিতে পারে না। কখনও তাই গন্তব্যে পৌঁছতে মাস কাবার হয়ে যায়। তা বলে আট মাস! ঝুলাসান গ্রামের এক মাতব্বর জানান, বারো ক্লাসের পরে কলেজ নয়, বিদেশে পাড়ি দেওয়াই দস্তুর হয়ে উঠেছে গুজরাতের এ অঞ্চলের সদ্য যুবাদের বড় অংশের। তিনি বলেন, ‘‘অধিকাংশই আইনি পথ এড়িয়ে এজেন্টকে টাকা গছিয়ে আমেরিকা কিংবা কানাডা যায়। সে দেশে এক বার থিতু হতে পারলে আর দেখে কে!’’
ট্রাম্প জমানায় হাতকড়া পরিয়ে এই সব বেআইনি অভিবাসীদের দেশে ফেরত পাঠানোর খবর গ্রামের মানুষের অজানা নয়। তা হলে কি সেই তালিকায় সুনীতা উইলিয়ামসের পৈতৃক ভিটের পড়শিরাও রয়েছেন? স্থানীয় পুলিশ কিংবা প্রশাসনের কাছে এর কোনও সদুত্তর নেই। প্রশাসনের এক কর্তা দায়সারা ভাবে বলেন, ‘‘আমাদের কাছে অভিযোগ না জানালে হারানো মানুষের খোঁজ করব কী করে!’’ কিন্তু অভিযোগ জানাবে কে? পুলিশে ছুঁলে আঠারো ঘা! নিখোঁজ স্বজনের অপেক্ষায় তাই উৎকণ্ঠাই ভরসা।
ঝুলাসান গ্রামের সদ্য প্রাক্তন সরপঞ্চ মনি পটেল জানান, ঝুলাসানের সাড়ে পাঁচ হাজার অধিবাসীর মধ্যে প্রায় হাজার তিনেক উচ্চ বর্ণের পাটিদার সম্প্রদায়ের। যাঁদের মধ্যে অন্তত দু’হাজারের ঘরবসত আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চলে। ভাঙা হিন্দিতে তিনি বলছেন, ‘‘মোটা টাকা রোজগারে কার অনীহা থাকবে বলুন! পাটিদারদের অর্থবল আছে। তাই উচ্চশিক্ষা কিংবা ব্যবসার সূত্র ধরে কৈশোর পার হলেই তাঁরা আমেরিকায় পাড়ি দেন। তবে গ্রামের সঙ্গে যোগসূত্রটা ধরে রাখেন তাঁরা। গ্রামের মন্দিরে ডোনেশন পাঠান।’’ কিন্তু অন্যরা? তাঁর সংক্ষিপ্ত উত্তর, ‘‘রুটিরুজির জন্য আমেরিকা তো স্বর্গ, কিন্তু সাধ থাকলেই তো সাধ্যে কুলোয় না!’’
তাই বাঁকা পথেই তাঁরা স্বপ্নের পিছনে ছোটেন। কেউ পৌঁছতে পারেন, কেউ বা হারিয়ে যান।
(শেষ)