গগনজয়ী: মহাকাশ থেকে নেমে স্পেস-এক্স ক্যাপসুলের মধ্যে সুনীতা উইলিয়ামস, বুচ উইলমোর, নিক হেগ ও আলেক্সান্ডার গর্বুনভ, ১৮ মার্চ। ছবি: পিটিআই।
গত শতকের ষাটের দশক থেকেই শুরু হয়েছিল মহাকাশ বিজ্ঞানের সফল প্রয়াস। ১৯৬৯ থেকে ১৯৭২, মাত্র তিন বছরে বারো জন মহাকাশচারী অবতরণ করলেন চাঁদের বুকে। তার পরবর্তী কালে মহাকাশ বিজ্ঞানীরা তৎপর হলেন মহাশূন্যে বিভিন্ন উপগ্রহ পাঠিয়ে পৃথিবী পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে পৃথিবীর খুঁটিনাটি তথ্য আবিষ্কারের দিকে। কিন্তু ‘নিজ মর্তসীমা’ ভাঙার জন্য আরও অনেক দূর হাঁটার কথা ভাবলেন বিজ্ঞানীরা— মহাকাশকে জয় করতে গেলে সেখানে মানুষের উপনিবেশ তৈরি করতে হবে। শুধুমাত্র কিছু বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে নয়, বরং মহাকাশে ভ্রমণ এবং বাস করার অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে পরবর্তী কালে মানুষের অধিকার ও উপস্থিতি পৃথিবীর গণ্ডি অতিক্রম করে মহাশূন্যে পৌঁছবে।
এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফলস্বরূপ বিংশ শতাব্দীর একেবারে শেষ প্রান্তে এসে তৈরি হতে শুরু করল ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন (আইএসএস)। ১৯৯৮ সালে এর সূত্রপাত করল রাশিয়া— ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার উপরে জারিয়া নামক একটি স্পেস কন্ট্রোল মডিউল স্থাপনের মধ্যে দিয়ে। বছরখানেকের মধ্যে আমেরিকা তাদের নিজস্ব মডিউল-কে যুক্ত করল তার সঙ্গে। তার পর, আরও অনেক দেশের সহায়তায় ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে শুরু করল এক বিশাল স্পেস স্টেশন। আন্তর্জাতিক সমন্বয় এবং বৈজ্ঞানিক সহযোগিতার এক আশ্চর্য উদাহরণ সৃষ্টি হল। বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, মহাশূন্যে বসবাসকালে মানবদেহের উপরে বিভিন্ন প্রভাব বিশ্লেষণ করা ছাড়াও মহাকাশ ভ্রমণ (স্পেস ওয়াক) ও নতুন মহাকাশ প্রযুক্তির পরীক্ষা ও প্রয়োগের উপরে কাজ হয়ে চলেছে এই স্টেশনে, এই শতকের গোড়া থেকেই। কল্পনার চেয়েও বড় এই মহাকাশ আলয়ে ছ’সাত জন মহাকাশচারীকে সব সময় থাকতে হয়। নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, গবেষণা, তথ্য সংগ্রহ, অন্য উপগ্রহকে তথ্য সরবরাহ, সব কাজই করতে হয় তাঁদের। সাধারণত ছ’মাস পরে মহাকাশচারীদের আর একটি দল এসে এঁদের স্থান নেয়। অন্যান্য দেশের মহাকাশচারীরাও আসেন এই আন্তর্জাতিক স্পেস স্টেশনে।
ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন-এর সাফল্যের মূলে কিন্তু পৃথিবী থেকে সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করার এক নিরাপদ ও নির্ভরশীল মহাকাশযানের ব্যবস্থা চালু রাখা। প্রাথমিক ভাবে রাশিয়ার সয়ুজ ক্যাপসুল এই মহাকাশচারীদের ফেরি করার কাজটি করত। পরে নাসা-র স্পেস শাটল প্রোগ্রামের মাধ্যমে এক বিশাল কর্মকাণ্ড চলেছিল এই স্পেস স্টেশন-এ। কিন্তু, কয়েকটি দুর্ভাগ্যজনক দুর্ঘটনা এবং আর্থিক কারণে ২০১১ সালে স্পেস শাটল প্রকল্পটি বন্ধ হয়ে যায়। তার পরবর্তী কালে মহাকাশচারী বা বিজ্ঞানীদের আইএসএস-এ পাঠাতে আমেরিকাকে নিয়মিত ভাবে রাশিয়ার শরণাপন্ন হতে হচ্ছিল। সয়ুজ ক্যাপসুল-এ এক জন মহাকাশচারীকে পাঠাতে খরচ হচ্ছিল প্রায় ৩২০ কোটি টাকা।
২০১৪ সালে আমেরিকার সঙ্গে রাশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের প্রভাবে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন-এ যাতায়াত ব্যাহত হতে শুরু করল। নাসা পরিকল্পনা করল মহাকাশে যাতায়াতের বাণিজ্যিক প্রকল্পের— কোনও বেসরকারি সংস্থা সংযোগকারী মহাকাশযান তৈরি করবে; নাসা তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ থাকবে মহাকাশচারীদের আইএসএস-এ পাঠানোর বিষয়ে। নানান স্তরে বিচার-বিশ্লেষণ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে দিয়ে দু’টি সংস্থার সঙ্গে চুক্তি হল— একটি হল বিমান নির্মাণকারী সংস্থা বোয়িং, আর অন্যটি ইলন মাস্কের স্পেস-এক্স। বোয়িং-এর তৈরি মহাকাশযানটির নাম হল স্টারলাইনার; স্পেস-এক্স’এর মহাকাশযানটির নাম ক্রু ড্রাগন। প্রায় বছর পাঁচেক প্রস্তুতির পর ২০১৯-এ দু’টি সংস্থাই প্রস্তুতি নিতে শুরু করল পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের। প্রথম সাফল্য পেল ক্রু ড্রাগন। ২০২০-এর মে মাসে দুই মহাকাশচারীকে নিয়ে সফল ভাবে উড়ল সেটি। ২০২৪-এর মধ্যে আটটি সফল অভিযান সম্পন্ন করল।
এ দিকে বোয়িং-এর স্টারলাইনার-এ নানা ত্রুটি ধরা পড়ছিল। ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে কাজ করছিলেন সুনীতা উইলিয়ামস ও ব্যারি উইলমোর। চার বছর পর গত বছর ৫ জুন তাঁরা স্টারলাইনার-এর প্রথম পরীক্ষামূলক উড়ানে পাড়ি দিলেন। সমস্যা সত্ত্বেও পৌঁছে গেলেন মহাকাশ স্টেশনে। কিন্তু মহাকাশযানটির সম্বন্ধে নাসার বিজ্ঞানীরা চিন্তিত হলেন— সন্দেহ, সেটা সুনীতা ও ব্যারি-কে সুস্থ ভাবে ফিরিয়ে আনতে পারবে কি? ঠিক হল, স্টারলাইনার মহাকাশযানটি যাত্রী ছাড়াই ফিরে আসবে; সুনীতা আর ব্যারিকে ফেরত আনবে ক্রু ড্রাগন।
শুরু হল অপেক্ষার প্রহর গোনার। সুনীতা ও ব্যারি বাস করছিলেন ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনের ভিতরে। তাঁদের খাওয়া-দাওয়া, চিকিৎসা এবং অন্য কাজকর্মের কোনও অসুবিধা বা অভাব ছিল না। কিন্তু বিজ্ঞানীরা চিন্তিত ছিলেন তাঁদের স্বাস্থ্য সম্পর্কে। প্রায় শূন্য মাধ্যাকর্ষণের ফলে মানবশরীরে অনেক পরিবর্তন ঘটে— ক্ষেত্রবিশেষে যা কিনা খুব বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। তাঁদের শারীরবৃত্তীয় ও মানসিক স্বাস্থ্য বজায় রাখার জন্য পৃথিবী থেকে চিকিৎসকরা বিবিধ নির্দেশ মেনে চলতে বলেছিলেন। দৈহিক ক্ষমতা যেন কোনও মতে হ্রাস না পায়, তার জন্য বিশেষ রকমের শরীরচর্চা ও খাদ্যেরও নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। মনে রাখতে হবে যে, প্রথমে আমেরিকান নৌসেনা, ও তার পর বায়ুসেনা এবং মহাকাশচারিতার প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা সুনীতা ও ব্যারিকে প্রস্তুত করেছিল এই প্রতিকূল অবস্থাতেও প্রায় স্বাভাবিক থাকতে। সুনীতা ও ব্যারি প্রায় ৬০০ ঘণ্টা ধরে ১৫০টি বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার কাজ করেছেন তাঁদের ২৮৬ দিন মহাকাশ অবস্থানের অবকাশে।
বাকিটা ইতিহাস। সমস্ত আশঙ্কা ও জল্পনার অবসান ঘটিয়ে স্পেস-এক্স’এর ক্রু১০ মহাকাশযানটি সুষ্ঠু ভাবে ফিরিয়ে আনল সুনীতা-সহ চার নভশ্চরকে। আপাতত বেশ কয়েক মাস তাঁদের কাটাতে হবে অনেক শারীরিক পরীক্ষার মধ্যে— যত দ্রুত সম্ভব, তাঁদের শরীরকে ‘স্বাভাবিক’ অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করবেন বিজ্ঞানীরা।
এই পুরো ঘটনাটি মানুষের মধ্যে এক সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছে। সাধারণ মানুষ যেমন বুঝতে পেরেছেন যে, মহাকাশ এমন এক পরিবেশ যা পরিস্থিতি অনুযায়ী হয়ে উঠতে পারে দুর্গম ও ভয়প্রদ; তেমনই এটাও বোঝা গিয়েছে, মহাকাশবিজ্ঞানীদের পারদর্শিতা ও প্রয়োগকৌশল এমন পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছে যে, তাঁরা এখন অত্যন্ত দুরূহ অবস্থার মোকাবিলা করতেও সক্ষম। এ পর্যন্ত মাত্র তিনটি দেশ মহাশূন্যকে জয়ের প্রচেষ্টা করেছে— আমেরিকা, রাশিয়া, এবং চিন। ভারত হয়তো আর এক বছরের মধ্যে উৎক্ষেপণ করতে চলেছে গগনযান। দুই মহাকাশচারী-কে (এ ক্ষেত্রে ‘গগনযাত্রী’) নিয়ে প্রায় চার দিন মহাশূন্যে কাটিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসার পরিকল্পনা।
ভারতীয় মহাকাশবিজ্ঞানীদের আশা, ২০৩৫ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে ইন্ডিয়ান স্পেস স্টেশন বা ভারতীয় অন্তরিক্ষ স্টেশন মহাকাশে ভারতীয় বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির সাফল্যের দাবিদার হিসাবে পরিগণিত হবে। ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন থেকে পাওয়া সমস্ত অভিজ্ঞতা তাঁদের সাহায্য করবে নিশ্চয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এখন আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে এমন এক জায়গায় পৌঁছে গেছে যে, এ ধরনের প্রচেষ্টা ও সাফল্য শুধু কোনও দেশের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়, তা সমগ্র মানবজাতির।
ভারতীয় ক্ষেত্রে আর একটি উল্লেখজনক বৈশিষ্ট্য হল যে, গত কয়েক বছরে ভারত সরকার তথা ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা ইসরো বেসরকারি উদ্যোগ এবং প্রযুক্তি সংস্থার সঙ্গে হাত মিলিয়েছে মহাকাশ বিজ্ঞানের অগ্রগতির জন্য। প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান সংস্থা ছাড়াও প্রায় ২৫০টি স্টার্ট-আপ সংস্থা ইসরোকে সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এসেছে। এই সংস্থাগুলি অত্যন্ত দক্ষ, উজ্জ্বল ও প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিত্ব দ্বারা পরিচালিত। আশা করা যায়, এই সরকারি-বেসরকারি যৌথ অংশীদারি মহাকাশবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। উন্নত মেধা, প্রকৌশলগত প্রযুক্তির ব্যবহার ভারতকে করে তুলবে মহাকাশ বিজয়ী চতুর্থ দেশ।
ভূতপূর্ব অধিকর্তা, এম পি বিড়লা তারামণ্ডল