ধারাবাহিক উপন্যাস পর্ব ৭
Bengali Novel

অনন্ত পথের যাত্রী

এই বুঝি পুত্রের অমন সোনার অঙ্গ চূর্ণ হয়ে যায়! তিনি বার বার নারায়ণকে স্মরণ করতে লাগলেন। নিমাই যত বার ভূমিতে আছাড় খেয়ে পড়ছেন, তত বার যেন মাতার অঙ্গ ব্যথায় অবশ হয়ে যাচ্ছে।

Advertisement

অবিন সেন

শেষ আপডেট: ২৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ ০৭:২২
Share:

ছবি: রৌদ্র মিত্র।

পূর্বানুবৃত্তি: এক শীতের রাতে ঘর-সংসার, মাতা-পত্নীকে পিছনে ফেলে এক বস্ত্রে গৃহত্যাগ করলেন নিমাই পণ্ডিত। সঙ্গী তিন বাল্যসখা। পরদিন বেলা দ্বিপ্রহরে কাটোয়ার পণ্ডিত কেশব ভারতীর বাড়িতে সন্ন্যাসগ্রহণ করলেন নিমাই। কৃষ্ণভাবাবেগে হঠাৎই বৃন্দাবন যাওয়ার জন্য আকুল হয়ে উঠলেন তিনি। সঙ্গীরা বারবার তাঁকে ভোলাতে চেষ্টা করলেন। যমুনা বলে স্নান করালেন গঙ্গায়। সেখান থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হল শান্তিপুরের অদ্বৈত আচার্যের গৃহে। সঙ্গীদের ছলনা ধরতে পারলেন নিমাই। কিন্তু তা নিয়ে বিবাদ করলেন না। কৃষ্ণভাবে নিমজ্জিত রইলেন। অদ্বৈত আচার্যের গৃহে তাঁকে মহাসমারোহে প্রভূত অন্নব্যঞ্জনে ভোজন করানো হল। সেই গৃহে দিবারাত্র চলতে লাগল নামগানের ভাববিহ্বল পরিবেশ। পরদিন সকালে সেখানে পুত্রের সঙ্গে দেখা করতে এলেন শচীদেবী। মুণ্ডিতমস্তক সন্ন্যাসী পুত্রকে দেখে মায়ের চোখের জল আর বাধ মানল না।

Advertisement

একে একে মহাপ্রভু সমাগত সমস্ত ভক্তের সঙ্গে মিলিত হলেন। নৃত্যগীতে অদ্বৈত-গৃহ যেন শ্রীবৈকুণ্ঠপুরী হয়ে উঠল।

পুত্রের আহারের জন্য শচীদেবী সমস্ত রন্ধনের ভার নিজের হাতে তুলে নিলেন। নিজ হাতে পুত্রকে আহার করিয়ে তবে তাঁর শান্তি।

Advertisement

রাতে ভক্তগণের সঙ্গে মহাপ্রভু কীর্তন করতে লাগলেন। ভাবে বিভোর তিনি বার বার মাটিতে আছাড় খেয়ে উথালি-পাথালি করতে লাগলেন।

এই দৃশ্য দেখে শচীদেবী রোদন করতে লাগলেন। এই বুঝি পুত্রের অমন সোনার অঙ্গ চূর্ণ হয়ে যায়! তিনি বার বার নারায়ণকে স্মরণ করতে লাগলেন। নিমাই যত বার ভূমিতে আছাড় খেয়ে পড়ছেন, তত বার যেন মাতার অঙ্গ ব্যথায় অবশ হয়ে যাচ্ছে।

এমন করে কয়েক দিন হরিনাম সঙ্কীর্তনে উৎসবের মতো কেটে গেল।

এক দিন মহাপ্রভু ভক্তদের ডেকে বললেন, “এ বার তোমরা তোমাদের গৃহে ফিরে যাও। নিজ নিজ গৃহে গিয়ে সবাই কৃষ্ণসঙ্কীর্তন করো। আমি আবার সবার সঙ্গে মিলিত হব। তোমারা যেয়ো কখনও নীলাচলে। আমিও আসব গঙ্গাস্নান করতে এখানে।”

ভক্তগণ চলে গেলে এক দিন রাতে জননীর চরণবন্দনা করে, জননীকে প্রদক্ষিণ করে নীলাচলের উদ্দেশে যাত্রা করলেন মহাপ্রভু। সঙ্গে গেলেন চার সখা— নিত্যানন্দ, পণ্ডিত জগদানন্দ, দামোদর পণ্ডিত আর মুকুন্দ দত্ত।

এক বার আচার্যকে আলিঙ্গন করে কিছু প্রবোধবাক্য দিলেন মহাপ্রভু। তার পর গৃহ ছেড়ে পথে নামলেন। এক বারও আর পিছন ফিরে তাকালেন না।

এক বারও কি তাঁর বিষ্ণুপ্রিয়ার কথা মনে পড়েছিল? সন্ন্যাসগ্রহণের পরে আর স্ত্রীর মুখ দেখতে নেই। স্ত্রীর কথা ভাবতেও কি নেই? চির-অনাদৃত বধূটি অন্ধকারের আড়ালেই থেকে গেল।

সকাল হয়েছে বেশ কিছু ক্ষণ। চার পাশ শান্ত তপোবনের মতো। বাতাসে শীতের আমেজ আর ফুলের সুবাস। দূরে কোনও বৃক্ষশাখায় পাতার আড়াল থেকে দু’-একটা কোকিল ডাকছে। পণ্ডিতচূড়ামণি সার্বভৌম ভট্টাচার্য প্রত্যহ এই সময়টায় সমুদ্রস্নান সেরে ঘরে ফেরেন। গৃহে ফেরার আগে আগে এক বার শ্রীজগন্নাথদেবের চরণে প্রণাম নিবেদন করে আসেন।

আত্মমগ্ন পণ্ডিতচূড়ামণি নিজের মনে নিজের সঙ্গেই যেন শাস্ত্র আলোচনা করতে করতে চলেছিলেন। তাঁর চলার ভঙ্গি দ্রুত। সিক্ত বস্ত্র, নগ্ন পদ। চরাচরের কোনও বিষয়েই তাঁর হুঁশ ছিল না। সহসা একটা মৃদু কোলাহল তাঁর ধ্যান ভঙ্গ করে। তত ক্ষণে তিনি একেবারে জগন্নাথ মন্দিরের সামনে। মন্দিরের সিংহদুয়ারের সামনে এক আশ্চর্য দৃশ্য।

পণ্ডিতপ্রবর বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখলেন, এক অপূর্ব গৌরকান্তি দিব্যপুরুষ ভাবে বিভোর হয়ে বিগ্রহের দিকে ধেয়ে চলেছেন। মন্দির প্রাঙ্গণে তত ক্ষণে ভক্তসমাগম শুরু হয়ে গিয়েছে। সে দিকে অপূর্ব দিব্যপুরুষটির কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। কৃষ্ণপ্রেমে তাঁর বাহ্যজ্ঞান যেন লুপ্ত। তাঁর কমলকোরকের মতো চোখদু’টি দিয়ে অঝোরে অশ্রু ঝরে পড়ে স্বর্ণকপোল প্লাবিত করে দিয়েছে, সে দিকেও তাঁর জ্ঞান নেই। মুখে শুধু কৃষ্ণনাম।

এমন অতুল সৌন্দর্য আর কৃষ্ণপ্রেমের বিকার দেখে পণ্ডিতচূড়ামণি বিস্ময়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। একটু আশঙ্কিত হলেন। এই বুঝি ওই সোনার অঙ্গ মাটিতে আছাড় খেয়ে পড়বে। মনে মনে ভাবলেন, ‘কে এই দিব্যপুরুষ!’ এমন আকুল প্রেমের বিকার তো তিনি আগে কখনও দেখেননি!

সহসা দেখলেন, সেই আশ্চর্য পুরুষ বিগ্রহের কাছে পৌঁছনোর আগেই অচেতন হয়ে ছিন্ন লতার মতো মন্দিরের কঠিন ভূমির উপরে পড়ে গেলেন।

তিনি যা আশঙ্কা করেছিলেন, তা-ই সত্যি হল। মনে মনে তিনি ভাবলেন।

চার পাশে ভক্তসমাগম হচ্ছে। আর তারা দেববিগ্রহ দর্শন ভুলে ভূপতিত সেই দিব্য শরীরের দিকে তাকিয়ে বিস্ময়ে বিভোর হয়ে যাচ্ছে। কোন অলীক প্রান্ত থেকে এক আশ্চর্য আলোর স্পর্শ এসে পড়েছে সেই স্বর্ণকান্তির উপরে। পণ্ডিত চূড়ামণি অবাক হয়ে দেখছেন, আলোও যেন ম্লান হয়ে গিয়েছে সেই দিব্য দেহের কাছে এসে। কত মুহূর্ত এমন বিস্ময়ে কেটে গেল, সে দিকে যেন তাঁর খেয়াল ছিল না। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে তিনি এ বার এই দিব্য মানুষটির জন্য আশঙ্কিত হয়ে পড়লেন, ‘কোনও আঘাত লাগেনি তো!’

তিনি চার পাশে তাকালেন। ওই তো, কালীপদ পান্ডা, তার পাশে গোপাল ভট্ট, তাঁর শিষ্য। তিনি হাত নেড়ে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। তাদের কাছে ডাকলেন।

উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, “কে এই দিব্যপুরুষ, তোমরা জানো?”

দু’জনেই ঘাড় নাড়ল। না, তারা জানে না। তারা আগে কখনও দেখেনি এই মানুষটিকে।

পণ্ডিতচূড়ামণি ভট্টাচার্যমশাই নির্দেশ দিলেন, “এই যুবকটিকে তোমরা আমার গৃহে নিয়ে গিয়ে শুশ্রূষার ব্যবস্থা করো।”

পার্শ্বচর দু’জন মহাপ্রভুকে ধরাধরি করে আচার্যের ঘরে নিয়ে গিয়ে এক উত্তম শয্যায় সাবধানে শয়ন করালেন। মহাপ্রভু তখনও অচেতন। চূড়ামণিমশাই চিন্তিত হয়ে উঠলেন। যুবাপুরুষটির সংজ্ঞা ফিরছে না কেন? মহাপ্রভুর নাসিকার কাছে একটি সূক্ষ্ম তুলার তন্তু ধরে দেখার চেষ্টা করলেন শ্বাস-প্রশ্বাস বইছে কি না। এ বার তিনি একটু আশ্বস্ত হলেন। বুঝলেন, শঙ্কার কোনও কারণ নেই। আচার্য মনে মনে ভাবলেন, এ কেমন বিকার! এমন সাত্ত্বিক দেবভক্তি তিনি কখনও দেখেননি। ঈশ্বরপ্রেমের এমন আশ্চর্য বহিঃপ্রকাশ দেখে মনে মনে ভাবতে লাগলেন, কে এই দিব্যকান্তি যুবক!

ও দিকে মন্দিরে মহাপ্রভুকে দেখতে না পেয়ে তাঁর সখা নিত্যানন্দ প্রভু মন্দিরের সিংহদরজার সামনে এসে উদ্‌ভ্রান্ত হয়ে পড়লেন। তিনি জনে জনে জিজ্ঞাসা করতে লাগলেন, জগন্নাথপ্রেমে বিভোর কোনও সন্ন্যাসীকে তারা দেখেছে কি না! তখন লোকমুখে শুনলেন, এক সন্ন্যাসীকে তারা দেখেছে। ভাবে বিভোর হয়ে তিনি মন্দির প্রাঙ্গণে অচেতন হয়ে পড়লে, পণ্ডিতচূড়ামণি সার্বভৌম ভট্টাচার্য তাঁকে নিজ গৃহে নিয়ে গিয়েছেন। এই কথা শুনে নিত্যানন্দ-সহ প্রভুর দুই সখা আশ্বস্ত হলেন।

সেই সময় সেখানে মুকুন্দ দত্ত প্রমুখ সখাদের দেখে কাছে এলেন গোপীনাথ আচার্য। নদিয়ায় তাঁর শ্বশুরালয়, সেই সূত্রেই বাকিদের পরিচিত। মহাপ্রভুর নাম তিনি পূর্বেই শুনেছেন। প্রভুর লীলা বিষয়ে তিনি সম্যক অবগত। ফলে এই স্থানে মন্দির প্রাঙ্গণে মুকুন্দ দত্তকে দেখে তিনি বিস্মিত হলেন। মনে মনে ভাবলেন, ‘তবে কি মহাপ্রভুর পদধূলি পড়েছে এই দেবভূমিতে!’

কুশল জিজ্ঞাসা করে তিনি মুকুন্দকে জড়িয়ে ধরলেন, “ভ্রাতা, প্রভুর কী সমাচার?”

মুকুন্দও তাঁকে দেখে কিছুটা চিন্তামুক্ত হলেন। বিদেশ-বিভুঁইয়ে স্বজাতিকে দেখে কার না ভাল লাগে। তিনিও তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “শুনেছ কি না জানি না, মহাপ্রভু তো সংসার ছেড়ে সন্ন্যাস নিয়েছেন। তাঁর সঙ্গেই আমরা নীলাচলে এসেছি। আমরা হঠাৎ পিছিয়ে পড়েছিলাম। আমাদের ছাড়িয়ে প্রভু ভাবে বিভোর হয়ে আগে আগে মন্দিরে চলে এসেছিলেন। আমরা তাঁকেই খুঁজে বেড়াচ্ছি।”

তত ক্ষণে নিত্যানন্দ প্রভু সেখানে উপস্থিত হয়েছেন। তিনি গোপীনাথ আচার্যের সঙ্গে কুশল বিনিময় করলেন। তার পর মুকুন্দের দিকে ফিরে বললেন, “লোকমুখে শুনলাম, ভাবে অচেতন এক গৌরকান্তি যুবা সন্ন্যাসীকে সার্বভৌম ভট্টাচার্যমশাই তাঁর গৃহে নিয়ে গিয়েছেন। মুকুন্দ, চলো ভট্টাচার্যমশাইয়ের বাড়ি কোথায় গিয়ে দেখি।”

গোপীনাথ আচার্য স্মিত মুখে বললেন, “খোঁজাখুঁজির প্রয়োজন কী! আমার সঙ্গে চলো, আমি তোমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। বিশ্বম্ভরের জন্য আমিও চিন্তিত হয়ে উঠেছি। চলো দেখি, নদের সেই দামাল নিমাই আমাদের কেমন সন্ন্যাসী হয়েছে!”

সকলে মিলে সার্বভৌম ভট্টাচার্যমশাইয়ের বাড়িতে উপস্থিত হলে তিনি পুলকিত হলেন। এত ক্ষণ তিনি অচেতন যুবাপুরুষের পরিচয় জানতে না পেরে চিন্তান্বিত ছিলেন। এখন এই যুবক সন্ন্যাসীর পরিচয় পেয়ে যারপরনাই আনন্দিত হলেন। প্রভুর সখাবৃন্দও প্রভুর সংবাদ পেয়ে নিশ্চিন্ত হলেন। গোপীনাথ আচার্য সকলের সঙ্গে পণ্ডিতচূড়ামণির পরিচয় করিয়ে দিলেন। পণ্ডিতচূড়ামণি নদিয়ার নিমাই পণ্ডিতের কথা হয়তো শুনেছিলেন। গোপীনাথ আচার্য তাঁর সম্যক পরিচয় দিলেন।

“জগন্নাথ মিশ্রর পুত্র ইনি। নাম বিশ্বম্ভর। যদিও নবদ্বীপে সকলে নিমাই পণ্ডিত বলে চেনে।”

মহাপ্রভুর পরিচয় জানার পরে সার্বভৌমমশাই হৃষ্ট হলেন। পুত্র চন্দনেশ্বরকে ডেকে বললেন, “পুত্র, সকলকে যুবা সন্ন্যাসীর কাছে নিয়ে যাও।”

সকলে ভিতরে গিয়ে দেখলেন, উত্তম শয্যায় শায়িত আছেন তাঁদের প্রিয় মহাপ্রভু। তখনও অচেতন। মহাপ্রভুকে দেখে তাঁরা যেমন প্রীত হলেন, তেমন অচেতন অবস্থায় দেখে একটু ভীতও হলেন।

প্রিয়সখা নিত্যানন্দ ছুটে গিয়ে মহাপ্রভুর শয্যার কাছে উপুড় হয়ে পড়লেন। মায়াভরে একটা হাত মহাপ্রভুর কপালে ঠেকালেন। নাকের কাছে হাত নিয়ে গিয়ে অনুভব করলেন শ্বাসবায়ু। মহাপ্রভুকে এই অবস্থায় দেখে সহসা নিত্যানন্দের ভিতরেও ভাবের উদয় হল। তাঁকে অস্থির দেখে সকলে ধরাধরি করে শান্ত করলেন। শান্ত হয়ে নিত্যানন্দ নামসঙ্কীর্তন শুরু করলে, বাকি সকলে তাঁর চার পাশে বসে সেই নাম-গানের সঙ্গে গলা মেলালেন।

এক আশ্চর্য ভক্তিভাবের প্লাবন বয়ে গেল। পণ্ডিতচূড়ামণি আশ্চর্য হয়ে সেই অপূর্ব নামগান শুনতে লাগলেন। মনে মনে ভাবলেন, ‘কোথা থেকে এরা এমন ভক্তিরসের সন্ধান পেল!’ যত তিনি এই নামগান শুনছেন, ততই তিনি আপ্লুত হয়ে উঠছেন। তাঁর দুই চোখ কখন অশ্রুসজল হয়ে উঠেছে, তিনি বুঝতেই পারলেন না। ভাবের প্লাবনে কখন বেলা বেড়ে গেল, কেউ টের পেলেন না।

বেলা তৃতীয় প্রহরে মহাপ্রভুর সংজ্ঞা ফিরে এল।

‘হরি’ ‘হরি’ নাম উচ্চারণ করতে করতে মহাপ্রভু শয্যায় উঠে বসলেন।

মহাপ্রভুকে সংজ্ঞাপ্রাপ্ত দেখে সকলের আনন্দ যেন ধরে না।

সার্বভৌমমশাই সহর্ষে মহাপ্রভুকে নমস্কার করলেন। করজোড়ে মহাপ্রভুকে মধ্যাহ্নভোজের অনুরোধ জানালেন।

মহাপ্রভু জানেন, এই অনুরোধ এড়ানো ভীষণ কঠিন। সপার্ষদ সমুদ্রস্নান করে ফিরে এসে তাঁরা সকলে আহারে বসলেন।

স্বর্ণথালায় অন্ন ও বিবিধ ব্যঞ্জন সাজিয়ে মহাপ্রভুকে আহারে বসালেন ভট্টাচার্যমশাই। পণ্ডিতচূড়ামণি নিজে বসে থেকে মহাপ্রভুর আহার তদারকি করলেন।

আহারের পরে মহাপ্রভুর বিশ্রামের ব্যবস্থা করে পণ্ডিতচূড়ামণি এসে বসলেন গোপীনাথ আচার্যের কাছে। ধীরে ধীরে মহাপ্রভুর পূর্বাশ্রমের সকল কথা তিনি জেনে নিলেন গোপীনাথের কাছ থেকে। সমস্ত শোনার পরে মহাপ্রভুর প্রতি শ্রদ্ধায় তাঁর অন্তর পরিপূর্ণ হয়ে উঠল।

মহাপ্রভুকে সঙ্গে করে জগন্নাথ-দর্শন করে এসে সার্বভৌম বললেন, “বেদান্ত শ্রবণই সন্ন্যাসীর ধর্ম।”

সাত দিন ধরে পণ্ডিতচূড়ামণির কাছে থেকে মহাপ্রভু নিরন্তর বেদান্ত শুনলেন। মৌনী হয়ে শুধু শুনতেই থাকলেন।

সাত দিন পরে মহাপ্রভু দীপ্তকণ্ঠে তাঁর কাছে বেদান্তভাষ্যের অদ্বৈতবাদের অসারতা ব্যাখ্যা করলেন। দ্ব্যর্থহীন ভাষায় আদি শঙ্করাচার্যের নিন্দা করে বললেন, “শঙ্করভাষ্য প্রকৃতই বেদান্তবিরুদ্ধ। মায়াবাদীগণ আসলে প্রচ্ছন্ন নাস্তিক।”

ভট্টাচার্যমশাই যেন নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। দণ্ডবৎ তিনি মহাপ্রভুর পদতলে পতিত হলেন। মহাপ্রভু পরম সমাদরে তাঁকে তুলে ধরলেন। ভট্টাচার্যমশাই ভাবলেন, মহাপ্রভুর চরণস্পর্শ পেয়ে তাঁর মনের সমস্ত জড়ত্ব দূর হয়ে গেল। তিনি মহাপ্রভুর একনিষ্ঠ ভক্ত হয়ে উঠলেন।

মহাপ্রভু আঠারো দিন ভট্টাচার্যগৃহে অবস্থান করে কৌপীনমাত্র সম্বল করে ভিক্ষুকের বেশে দক্ষিণ ভারতের উদ্দেশে যাত্রা করলেন। সঙ্গী কেবল পরম ভক্ত ব্রাহ্মণ কৃষ্ণদাস।

পশ্চিমাকাশে সূর্য অস্ত গিয়েছে বেশ কিছু ক্ষণ। আকাশে আধখানা চাঁদ অতুল সমুদ্রের জলরাশির উপরে রুপোলি জ্যোৎস্না বিছিয়ে দিয়েছে। চাঁদের আলোর মুকুট পরে ঢেউগুলি অনবরত বেলাভূমির পায়ের কাছে এসে এক বার মাথা ছুঁইয়ে আবার ফিরে যাচ্ছে। এ যেন একটা খেলা। অনন্তকাল ধরে এই খেলার কোনও বিরাম নেই, বিরতি নেই।

অবসরকালে, নৃসিংহ এই সময়টায় সমুদ্রের উপকূলে এসে বসে থাকেন।

ক্রমশ

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement