রাজ্যের সমালোচনা, তাই কি পশ্চিমবঙ্গে সিএজি রিপোর্ট ব্রাত্য
West Bengal Legislative Assembly

একটু স্বচ্ছতার জন্য

দেশের রাজ্য সরকারগুলিকে, বিশেষত আমাদের নিজেদের পশ্চিমবঙ্গের সরকারকে, বলা যায়: বিধানসভার দরজা-জানলা খুলে দিন, সাধারণ মানুষ দেখুন, শুনুন যে, বিধানসভায় কী আলোচনা হচ্ছে।

Advertisement

অশোক কুমার লাহিড়ী

শেষ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৫ ০৬:৩৮
Share:

পশ্চিম বার্লিনে, ১৯৮৭ সালের ১২ জুন, বার্লিন প্রাচীরের ব্রান্ডেনবার্গ গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগানের সংক্ষিপ্ত ভাষণ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। সোভিয়েট ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক গর্বাচেভের উদ্দেশে তাঁর আহ্বান: “গর্বাচেভ সাহেব, এই গেট খুলে দিন! এই প্রাচীর ভেঙে ফেলুন!” একই ভাবে দেশের রাজ্য সরকারগুলিকে, বিশেষত আমাদের নিজেদের পশ্চিমবঙ্গের সরকারকে, বলা যায়: বিধানসভার দরজা-জানলা খুলে দিন, সাধারণ মানুষ দেখুন, শুনুন যে, বিধানসভায় কী আলোচনা হচ্ছে।

Advertisement

বিধানসভায় আলোচনার ব্যাপারে এত গোপনীয়তা কেন? বিধানসভার ব্যাপারে স্বচ্ছতা কোথায়? এ ব্যাপারে আদালতের কিছু অভিমতও আমাদের সামনে আছে। ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে, উচ্চ আদালত তামিলনাড়ু রাজ্য বিধানসভার সচিবালয়কে বিধানসভার কার্যক্রম সামান্য সময়ের (পাঁচ থেকে দশ মিনিট) বিলম্বে সম্প্রচার করার বিষয়ে বিবেচনা করতে বলেছিল— বিলম্বিত সম্প্রসারণ, যাতে স্পিকার অসংসদীয় বা আপত্তিকর বিষয়বস্তু বাদ দেওয়ার মতো সময় পান। আদালত এও উল্লেখ করে যে, রাজনীতিকদের দ্বারা করা কোনও অসংসদীয় বা অনিয়মতান্ত্রিক মন্তব্য তাঁদের বিরুদ্ধেই যাবে। বিধানসভার কার্যক্রমকে গভীর অন্ধকারে রাখাটা স্বচ্ছতার পরিপন্থী। জনতার প্রতিনিধিরা বিধানসভায় কী বলছেন, তা জনতা জানতে চায়। বিধানসভার আলোচনা জানাটা জনগণের অধিকার।

তৃণমূল কংগ্রেসের ঘনিষ্ঠ আম আদমি পার্টির ভগবন্ত সিংহ মান ২০২২ সালে পঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরেই ঘোষণা করেন যে, বিধানসভার কার্যক্রম সোজাসুজি সম্প্রসারণ করবেন। তাই মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী এবং বিধানসভার মাননীয় অধ্যক্ষকে বিধানসভার কার্যক্রম সম্প্রসারণের অনুরোধ আশা করি ঔচিত্যবোধের অন্তরায় নয়। অনুরোধ, স্বচ্ছতা আনুন! বিধানসভার দরজা-জানলা খুলে দিন। জনতা সব না বুঝলেও অনেকটাই বোঝে— তারা জ্ঞানবুদ্ধিরহিত বা মূর্খ অবশ্যই নয়। বিধানসভায় উপস্থাপিত কোন যুক্তিটা সঠিক, কোনটা ভুল, জনগণ নিজেই বিচার করুক।

Advertisement

স্বচ্ছতার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হচ্ছে সরকারি টাকাকড়ির হিসাব। এ বার হিসাবের ব্যাপারে আসা যাক। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দিল্লির নির্বাচনে নিয়ন্ত্রক ও মহা হিসাবরক্ষকের প্রতিবেদন কোথায়— যাকে সংক্ষিপ্ত পরিভাষায় কন্ট্রোলার অ্যান্ড অডিটর জেনারেল (সিএজি) রিপোর্ট বলা হয়— তা নিয়ে ঝড় তুলেছিল। তৎকালীন আম আদমি পার্টির সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছিল এই প্রতিবেদনগুলি লুকিয়ে রাখার। ক্ষমতায় আসার পর, মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তের নেতৃত্বে নবগঠিত বিজেপি দিল্লি সরকার ইতিমধ্যে সিএজি-র কয়েকটি প্রতিবেদন বিধানসভায় উপস্থাপন করেছে।

ভারতের সংবিধানের ১৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সিএজি কেন্দ্র এবং রাজ্য স্তরে বিভিন্ন সরকারি বিভাগে কেমন কাজ হয়েছে এবং সরকারি নিয়মকানুন পালিত হয়েছে কি না তা নিরীক্ষা করেন, এবং সেই নিরীক্ষার ফলাফলের প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। এ ছাড়া, বিভিন্ন স্ট্যাটুটরি বা বিধিবদ্ধ সংস্থা, বোর্ড এবং সরকারি সংস্থার নিরীক্ষা থেকে উদ্ভূত পর্যবেক্ষণ এবং রাজস্ব প্রাপ্তি সম্পর্কিত পর্যবেক্ষণও পৃথক ভাবে উপস্থাপন করেন। রাজ্য পর্যায়ে প্রধান হিসাবরক্ষক (নিরীক্ষা)/ হিসাবরক্ষক (নিরীক্ষা) দফতরগুলি সিএজি-র কার্যনির্বাহী সংস্থা।

সিএজি প্রতিবেদনের খসড়া রাজ্য সরকারের কাছে পাঠান, এবং আলোচনার পর প্রতিবেদন রাজ্য সরকারকে দেন। রাজ্য সরকার সেই প্রতিবেদন বিধানসভায় পেশ করে এবং তার পর সেই প্রতিবেদন জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ২০২০-২১ সালের পরে কোনও প্রতিবেদন জনসমক্ষে নেই। কেন? কারণ, সিএজি-র প্রতিবেদনে রাজ্য সরকারের ত্রুটিবিচ্যুতি সামনে আসে। অনেক অস্বস্তিকর প্রশ্ন ওঠে। অনর্থক কেন সমালোচনার দরজা খুলে দেবে সরকার?

এটা অনেকটা ডাক্তারি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করানোর মতো। আমরা প্রায়ই এমন পরীক্ষা এড়িয়ে চলি, যাতে ডাক্তার বা আমাদের কাছের মানুষরা আমাদের খাদ্যাভ্যাসে বিধিনিষেধ আরোপ করতে না পারেন, বা সকালে হাঁটতে যাওয়ার জন্য জোর করতে না পারেন। এটা হয়তো যুক্তিসঙ্গত নয়, কারণ সমস্যা প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত না করলে পরবর্তী কালে জটিলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা থাকে। তবুও আমরা তা প্রায়ই করি— বিশেষত যখন জানি যে, কিছু সমস্যা থাকতে পারে, যার সমাধান প্রয়োজন।

কিছু সরকার শুধু সিএজি-র প্রতিবেদন সামনে আনতে চায় না তা-ই নয়, বিধানসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি সম্বন্ধেও ভীষণ স্পর্শকাতর। সাংবিধানিক প্রথা অনুযায়ী বিরোধী পক্ষের কোনও বিধায়ককে পিএসি-র সভাপতি করার একটা পরম্পরা আছে। অনেকটা আপনার কোনও ঘনিষ্ঠ ডাক্তারের কাছে না গিয়ে অন্য কোনও ডাক্তারের কাছে যাওয়ার মতো— চিকিৎসা যাতে আবেগবর্জিত, নৈর্ব্যক্তিক ভাবে হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে চাইলে এমনটা করাই বিধেয়। কিন্তু তা হলে তো অনেকটা গোদের উপরে বিষফোড়া হয়ে যাবে! সুতরাং, এই প্রথাকেও জলাঞ্জলি দেওয়ার একটা প্রবণতা থাকে। তাই, হিসাবের ক্ষেত্রে যদি চান যে, সঠিক তথ্য যাতে কোনও মতেই সামনে না আসে, তবে দু’টি পদক্ষেপ করা হয়— সিএজির প্রতিবেদনগুলি দেরি করা, এবং বাছাই করা কোনও ‘নিজের লোক’কে পিএসি-র সভাপতি নিয়োগ করা। দুর্মুখেরা বলেন, পশ্চিমবঙ্গে দু’টিই নাকি হয়েছে।

এক জন জনপ্রতিনিধি, একটি রাজনৈতিক দলের টিকিটে নির্বাচিত হয়ে আইনসভায় গেলে বিধানসভা বা লোকসভার মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত সেই দল ত্যাগ করে অন্য দলে যাওয়াটা নিয়মবিরুদ্ধ। ১৯৮৫ সালে ৫২তম সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলবদল— যা বহু ক্ষেত্রেই অনৈতিক লেনদেনের কারণে ঘটে— বেআইনি করা হয়। বিধানসভা বা লোকসভার কার্যকালে দলবদল করলে, সভার সদস্যপদ খারিজ হওয়ার নিয়ম। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, সংবাদপত্রে, টেলিভিশনের পর্দায় এবং জনসভায় সাধারণ মানুষ যা-ই দেখুন না কেন, কে ‘দলবদলু’ সেটা নির্ধারণ করতে বিধানসভা এবং লোকসভার অধ্যক্ষরা ভীষণ বেগ পেয়েছেন এবং পাচ্ছেন। অনেকটা সেই পুরনো কীর্তনের পদের মতো: “তুমি পুরুষ কি নারী, আমি বুঝিতে নারি, স্বয়ং না বোঝালে তা কি বুঝিতে পারি!” পিএসি-র অধ্যক্ষের পদে এক জন সে রকম ‘বিরোধী পক্ষ’র বিধায়ককে বসালে— যিনি কোন পক্ষে আছেন বোঝা মুশকিল, এমন কাউকে— চোরও মরে, লাঠিও ভাঙে না। সাধারণ মানুষ তাঁদের সাধারণ বুদ্ধিতে প্রশ্ন করছেন, পশ্চিমবঙ্গে সে রকম কিছু হচ্ছে নাকি?

বিধানসভার কার্যক্রম এবং সরকারি টাকাপয়সার হিসাব সম্বন্ধে ধোঁয়াশা যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হয়, তা হলে যাঁরা এই ধোয়াঁশা সৃষ্টি করেন, তাঁরা নিশ্চিত ভাবে লাভ আছে মনে করেই করেন। সাময়িক লাভ অবশ্যই আছে— সমালোচনার মুখ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। কিন্তু আখেরে লাভ হয় না। এটা অনেকটা ক্যানসার রোগের মতো। দুরারোগ্য ব্যাধি; ডাক্তাররা বলেন, যখন রোগের কোনও উপসর্গ চোখের সামনে না উঠে আসে, তখনই সমস্যা গভীর হয়ে যায়। রোগ যত দেরিতে ধরা পড়ে, চিকিৎসা তত কঠিন হয়ে ওঠে। মানুষের ব্যাধির ক্ষেত্রে ডাক্তার না দেখানোর মতো, সরকারের স্বচ্ছতা না আনার সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের সমস্যার ক্যানসার স্টেজ ওয়ান থেকে স্টেজ ফোরে চলে যায়। বিধানসভার কার্যক্রম এবং সরকারি টাকাপয়সার হিসাব জনতার কাছ থেকে লুকালে তাতে শুধু সরকারি পরিচালন প্রক্রিয়ার সমস্যার উপসর্গগুলিই লুকানো যায়, সমস্যার উপশম হয় না। সমস্যা বাড়তেই থাকে, এবং ক্যানসারের মতো দুরারোগ্য এবং জটিলতর হয়ে ওঠে। শাসক দলের কাছে নিবেদন, আপনারা জনগণ দ্বারা নির্বাচিত, এবং জনতার কাছে দায়বদ্ধ। সরকারি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনুন, সরকারি টাকাপয়সার হিসাব সময়মতো দিন।

বিধায়ক, বিজেপি, পশ্চিমবঙ্গ

আনন্দবাজার অনলাইন এখন

হোয়াট্‌সঅ্যাপেও

ফলো করুন
অন্য মাধ্যমগুলি:
আরও পড়ুন
Advertisement