গত ১৩ বছরে কোনও ভোট হয়নি। শেষ হয়েছিল ২০১৩ সালে। হাওড়া পুরসভার দীর্ঘ দিনের জটিলতা শীঘ্রই কাটতে চলেছে। বৃহস্পতিবার হাওড়ায় প্রশাসনিক বৈঠক শেষে তা স্পষ্ট করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। জানালেন, সব ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই হাওড়া এবং বালি পুরসভায় নির্বাচিত পুরবোর্ড গঠিত হয়ে যাবে।
হাওড়ার ভোট নিয়ে জোট কাটার কোনও বার্তা আসে কি না, বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রীর প্রশাসনিক বৈঠকের আগে পুর পরিষেবার পাশাপাশি নজর ছিল সে দিকেও। হাওড়া পুরনিগমের সঙ্গে বালি পুরসভার সংযুক্তিকরণ এবং পৃথকীকরণ ঘিরে আইনি জট এবং ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জটের কারণে বার বার থমকে যায় হাওড়ার ভোট। রাজ্যে পালাবদলের পরে নতুন মন্ত্রিসভা গঠিত হতেই পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল বৈঠক করেন মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে। সেখানেই হাওড়ার ভোট নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হয়েছিল। এ বার মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করে দিলেন, এ বছরের মধ্যেই হাওড়ার পুরভোট হয়ে যাবে।
প্রশাসনিক বৈঠক শেষে মু্খ্যমন্ত্রী জানান, তাঁর সরকারের লক্ষ্য হল হাওড়া শহরের প্রাথমিক চাহিদাগুলি পূরণ করে দীর্ঘমেয়াদে এটিকে আরও ‘বিকশিত নগরী’ হিসাবে গড়ে তোলা। তিনি বলেন, “ওয়ার্ড বিন্যাসের কাজ সম্পূর্ণ করে এই বছরের মধ্যেই নির্বাচিত কর্পোরেশন বা পুরসভার হাতে দায়িত্বভার হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য আমরা আজকের বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়েছি।” তিনি আরও জানান, ইতিমধ্যে পুরসভায় আসনবিন্যাসের কাজ শুরু করার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, “জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে নির্বাচন ছাড়া প্রকৃত পরিষেবার স্বাদ মানুষ পেতে পারে না। তাই সব ঠিকঠাক থাকলে আমরা ডিসেম্বরের মধ্যে গণতান্ত্রিক পৌরবোর্ডের হাতে হাওড়া পুরনিগম এবং বালি তুলে দিতে পারব বলে আমাদের বিশ্বাস।”
পাশাপাশি হাওড়ার পুরপরিষেবাকে আরও উন্নত করার বার্তা দেন মুখ্যমন্ত্রী। হাওড়াবাসীর জন্য পরিস্রুত পানীয় জল, সাফাইয়ের ব্যবস্থা, নিকাশি ব্যবস্থা এবং পার্ক, স্বাস্থ্যকেন্দ্র, পুরসভা পরিচালিত শিক্ষাকেন্দ্র-সহ অন্য নাগরিক পরিষেবার মানোন্নয়নের কথা বলেন তিনি। শুভেন্দু জানান, এই সংক্রান্ত কাজকর্মের জন্য একটি কো-অর্ডিনেশন (সমন্বয়) কমিটি গঠিত হয়েছে। ওই কমিটির সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকবেন জেলাশাসক এবং কমিটির উপর নজরদারি চালাবেন রাজ্যের পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের সচিব।
আরও পড়ুন:
নতুন সরকারের আমলে রেলের সঙ্গেও যাতে রাজ্য প্রশাসনের সঠিক সমন্বয় থাকে, তা-ও স্পষ্ট করে দেন মুখ্যমন্ত্রী। পূর্বতন সরকারের কাছে রেল ছিল ‘শত্রু’, অথচ রেল ছাড়া হাওড়া হয় না— এই বার্তাও স্পষ্ট করে দেন শুভেন্দু। উল্লেখ্য, নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-র আওতায় পড়েন না, এমন অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের জন্য বুধবারই নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। হাওড়ার বৈঠক শেষে পুলিশ এবং আরপিএফ-এর কাছে আবার সেই বার্তাই পৌঁছে দেন তিনি। শুভেন্দু বলেন, “গতকাল থেকে অনুপ্রবেশকারীদের কোর্টে না পাঠিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে বিএসএফ-এর কাছে পাঠানোর আইন কার্যকর হয়েছে পশ্চিমবঙ্গে। পুলিশ কমিশনার এবং আরপিএফ-কে বলে দেওয়া হয়েছে, সিএএ-র আওতায় পড়েন না এমন বাংলাদেশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হাওড়া স্টেশনে ধরা পড়লে, তাঁকে কোর্টে পাঠাবেন না। তাঁকে ভাল করে খাওয়াদাওয়া করিয়ে সোজা বনগাঁ পেট্রাপোল সীমান্তে, নইলে বসিরহাটে বিওপি (সীমান্ত চৌকি)-র কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করবেন।” এমন কত জন অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়ছেন, সেই সংখ্যা প্রতি সপ্তাহে ডিজিপি মারফত মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে পাঠানোর জন্যও বলেছেন তিনি।
পাশাপাশি পূর্বতন সরকারের আমলে যত রাজনৈতিক হিংসার অভিযোগ বা মহিলাদের উপর অত্যাচারের অভিযোগ উঠেছিল, সেই সব ঘটনায় পুলিশকে পদক্ষেপ করতে নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “পুলিশকে স্পষ্ট বলা হয়েছে— নতুন করে এফআইআর করতে, অ্যাকশন নিতে।” একই সঙ্গে অবৈধ নির্মাণের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে একটি তথ্যানুসন্ধান দল গঠিত হবে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। জানিয়েছেন, যে নির্মাতারা দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় তদন্ত করা হবে।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিক বৈঠকের সময়ে তৃণমূল নেতা অরূপ রায়ের বিরুদ্ধে ওঠা বিভিন্ন অভিযোগ প্রসঙ্গেও প্রশ্ন করা হয় শুভেন্দুকে। উত্তরে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “তদন্তে উঠে আসবে। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু এবং এডিজি পদমর্যাদার আইপিএস জয়রমন সাহেবের নেতৃত্বে কমিশন হয়েছে। কমিশন ১ জুন থেকে কাজ শুরু হবে। নাগরিক শুনানি করবে। অভিযোগ নেবে।” মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, যদি কারও কিছু তথ্য থাকে, সেই তথ্য যেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কমিশনকে জানান। মুখ্যমন্ত্রী আশ্বাস দেন, প্রমাণিত তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত এফআইআর হবে। শাস্তিও হবে। আর্থিক দুর্নীতির ক্ষেত্রে সরকারি টাকা উশুল করা হবে বলেও জানান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, হাওড়া পুরসভায় প্রায় ১৭০০ জন অস্থায়ী কর্মী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৫০০ জন বেতন তোলেন কিন্তু পরিষেবা দেন না বলে মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রাথমিক অভিযোগ জমা পড়েছে। ওই নির্দিষ্ট অস্থায়ী কর্মীদের প্রসঙ্গে শুভেন্দু বলেন, “আট ঘণ্টা তো দূর, আট মিনিটও পরিষেবা দেন না। কারণ, তাঁরা রাজনৈতিক প্রভাবশালীদের আশীর্বাদপুষ্ট। আমরা তাঁদের ক্ষেত্রেও বলছি, কোন দল করেন, সেটা বড় কথা নয়। টাকা পুরসভা থেকে পান। আপনাদের কাজটা করতে হবে। পরিষেবা দিতে হবে। মানসিকতা বদলান। চিন্তা ভাবনা বদলান। এই সরকার এ সব ক্ষেত্রে ‘জ়িরো টলারেন্স’ নীতিতে চলবে।”