বাংলা তথা ভারতীয় শিল্পপতিদের পাশাপাশি ব্রিটেনের শিল্পমহলের প্রথম সারির বহু প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন সেন্ট জেমস কোর্টের বাণিজ্যবৈঠকে। ছবি: ফেসবুক।
বিলেত থেকে বাংলায় বিনিয়োগ আনতে এসেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি একা নন। বাংলার জন্য দরবার করল বাংলায় ব্যবসা করা শিল্পমহলও। কেন বাংলায় এলে লাভ? তার ব্যাখ্যা দিলেন সবাই। সবারই সার কথা, বাংলার এই মুহূর্তের শিল্পপরিবেশ। মঙ্গলবার লন্ডনের বঙ্গশিল্পসম্মেলনে উপস্থিত শ’দেড়েক প্রতিনিধির মধ্যে বলার সুযোগ পেলেন কয়েকজনই। কে কী বললেন।
লক্ষ্মী লাভ: সিকে ধানুকা (ধানসেরি ভেনচার্সের এগজ়িকিউটিভ)
ব্রিটেনের শিল্পমহলকে বাংলামুখী করতে নিজের অভিজ্ঞতার কথা বলেন ধানুকা। তাঁর কথায়, ‘‘অসম, হরিয়ানা এবং বাংলায় আমরা ব্যবসা করি। কিন্তু বাংলার মতো লাভ আমরা কোনও রাজ্যে করিনি। বাংলায় আমার কোনও ক্ষতি হয়নি। সর্বদা লাভের মুখ দেখেছি।’’ অতএব, বাংলায় লক্ষ্মী। বাংলাই লক্ষ্মী।
তিন কারণ: হর্ষ নেওটিয়া (অম্বুজা নেওটিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান)
কেন বাংলায় বিনিয়োগ করবে ব্রিটিশ বণিকমহল? এই প্রসঙ্গে তিন কারণের অবতারণা করেন হর্ষ। প্রথমত, বাংলার মুখ্যমন্ত্রী যৌথতায় বিশ্বাস করেন। দ্বিতীয়ত, গত ১২ বছরে পরিকাঠামো উন্নয়নে বাংলা অভূতপূর্ব জায়গায় পৌঁছেছে। পুরো চালচিত্রই বদলে গিয়েছে। এবং তৃতীয়ত, শান্তি হল অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচক। সেই শান্তি এবং সম্প্রীতির পরিবেশ বাংলায় বিরাজমান।
লন্ডনের শিল্প সম্মেলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক।
দরকারে সরকার: কেকে বাঙুর (গ্রাফিতি ইন্ডিয়ার চেয়ারম্যান)
ব্রিটেনের বণিকমহলকে বাংলায় বিনিয়োগের দরাজ আহ্বান জানান বাঙুর। তাঁর কথায়, ‘‘শিল্পস্থাপনের প্রশ্নে সরকার সক্রিয়। সমস্ত দরকারে প্রশাসনকে পাশে পাওয়া যায়। আপনারা আসুন। আপনাদের অভিজ্ঞতা ভাল হবে।’’
আমার কলকাতা: মেহুল মোহানকা (টেগা ইন্ডাস্ট্রিজ়ের কর্ণধার)
আমেরিকা থেকে ২০০১ সালে এমবিএ পাশ করে ফিরেছিলেন কলকাতায়। না-ও ফিরতে পারতেন। থাকতে পারতেন মার্কিন মুলুকেই। কিন্তু ব্রিটেনের বণিকমহলের সামনে মেহুল জানালেন, অন্তরের আহ্বানে তিনি কলকাতায় ফিরেছিলেন। তার পর থেকে ব্যবসা করছেন। এ-ও জানিয়ে দিলেন, অতীতের মতো শ্রমিক অসন্তোষ আর বাংলায় নেই। বিলেতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আহূত শিল্প সম্মেলনেই ঘোষণা করে দিলেন, কল্যাণীতে আরও ৩০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করতে চলেছে তাঁর সংস্থা।
চায়ে পে চর্চা: রুদ্র চট্টোপাধ্যায় (লক্ষ্মী গ্রুপের চেয়ারম্যান)
চায়ের সঙ্গে ব্রিটিশদের যোগের কথা টানেন রুদ্র। ব্রিটিশ ঐতিহ্যের সঙ্গে দার্জিলিংয়ের চায়ের ঐতিহ্য জুড়ে জেন তিনি। চায়ের কী ভাবে বিবর্তন হচ্ছে তা-ও উল্লেখ করেন। জানান, এখন ঠান্ডা পানীয়ের বোতলেও চা সংরক্ষিত করার উপায় বেরিয়েছে। যা ক্রমশ জনপ্রিয়ও হচ্ছে। এবং উত্তরবঙ্গের পাহাড় যে চা শিল্পের বড় ক্ষেত্র, মনে করিয়ে দেন।
সাত জন্মের ফল: শাশ্বত গোয়েন্কা (সঞ্জীব গোয়েন্কা গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান)
আইপিএলের ব্যস্ততার জন্য সঞ্জীব গোয়েন্কা লন্ডন যেতে পারেননি। গিয়েছেন তাঁর পুত্র শাশ্বত। তিনি বলেন, সাত জন্ম ধরে তাঁদের পরিবার কলকাতায় রয়েছে। নয় নয় করে ২০০ বছর। কলকাতাই তাঁদের ঘর। সরকারের ভূমিকা, মুখ্যমন্ত্রীর আন্তরিকতার ফলে অতীতের (বাম জমানার) জটিলতা কেটে গিয়েছে। বাংলা এখন বিনিয়োগের গন্তব্য।
লন্ডনের শিল্প সম্মেলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি: ফেসবুক।
বেস্ট বেঙ্গল: সঞ্জয় বুধিয়া ( প্যাটন ইন্টারন্যাশনালের এমডি)
তাঁকে অনেকে প্রশ্ন করেন, তিনি কি বাধ্যবাধকতার কারণে কলকাতায় আছেন? ব্রিটিশ বণিক মহলের সামনে বুধিয়া জানান, কোনও বাধ্যবাধকতা নয়। কলকাতা তাঁর পছন্দ, তাই তিনি রয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রশংসা করে বুধিয়া বলেন, ‘‘তিনি হাঁটতে হাঁটতে কথা বলেন। তবে যা বলেন, তা করে দেখান। তাঁর জন্যই ওয়েস্ট বেঙ্গল আজ বেস্ট বেঙ্গল।’’
নিবেদিতা প্রাণ: সত্যম রায়চৌধুরী (সিস্টার নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য)
২০১৭ সালে সিস্টার নিবেদিতার বসত বাড়িতে যখন ‘ব্লু ট্যাগ’ লাগানো হয়েছিল, তখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সেখানে গিয়েছিলেন। সেবারও মমতার অন্যতম সফরসঙ্গী ছিলেন সত্যম রায়চৌধুরী। সেই প্রসঙ্গ টেনে সত্যম বলেন, ‘‘আমি তখনই মুখ্যমন্ত্রীকে কথা দিয়েছিলাম, আমি সিস্টার নিবেদিতার নামে কিছু করতে চাই। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেন, তুমি পারবে? আমি বলেছিলাম, হ্যাঁ পারব। তারপর সিস্টার নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয় করার ভাবনার কথা তাঁকে জানাই।’’ এই সমস্ত ক্ষেত্রে মুখ্যমন্ত্রী কতটা দ্রুততার সঙ্গে কাজ করেন তার উদাহরণ দিতে গিয়ে সত্যম বলেন, সেপ্টেম্বর মাসে মুখ্যমন্ত্রীকে আমি এই ভাবনার কথা বলেছিলাম। নভেম্বর মাসেই তিনি বিধানসভায় সিস্টার নিবেদিতা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিল পাশ করিয়ে দেন। আজ সেই বিশ্ববিদ্যালয় অন্যতম বড় প্রতিষ্ঠান। এবার সপুত্র লন্ডনে গিয়েছেন সত্যম। তাঁর সংস্থা টেকনো ইন্ডিয়া গ্রুপ ম্যাঞ্চেস্টার সিটি ক্লাবের সঙ্গে কলকাতায় ফুটবল স্কুল তৈরির সমঝোতাপত্র (মউ) সাক্ষর করেছে। সংস্থার হয়ে সাক্ষরট করেছেন সত্যম পুত্র দেবদূত।
দুই শহরের কাহিনি: তরুণ ঝুনঝুনওয়ালা (রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের প্রেসিডেন্ট)
ব্রিটিশ সাহিত্যিক চার্লস ডিকেন্স লিখেছিলেন ‘এ টেল অব টু সিটিজ’। যাতে তিনি তুলে ধরেছিলেন একটা শহরের বদলে যাওয়ার কাহিনি। যা পড়ে মনে হতে বাধ্য, আসলে দুটি শহর। কলকাতাকে বদলে দেওয়ার ব্যাপারে মমতার ভূমিকার প্রসঙ্গ তোলেন তিনি। ওই উপন্যাসের উপমা টেনে ঝুনঝুনওয়ালা বলেন, ‘‘বাংলায় এখন সম্ভাবনার বসন্ত এসেছে, বাংলা এখন সেরা সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে।’’
সহজ, স্বচ্ছন্দ, সুন্দর: উমেশ চৌধুরী (টিটাগড় রেলওয়ে সিস্টেমের কর্ণধার)
বাংলায় শিল্পবান্ধব পরিবেশের কথা বলতে গিয়ে এই তিনটি শব্দের অবতারণা করেছেন উমেশ। তাঁর বক্তব্য, বাংলায় এখন বিনিয়োগ করা সহজ, বিনিয়োগকারীদের তাতে স্বাচ্ছন্দ্য রয়েছে এবং পরিবেশও সুন্দর। উমেশ উল্লেখ করেন, রাজ্য সরকারের সদিচ্ছাই এর অন্যতম প্রধান কারণ যার নেতৃত্ব দিচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা।
বাংলা তথা ভারতীয় শিল্পপতিদের পাশাপাশি ব্রিটেনের শিল্প মহলের প্রথম সারির বহু প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন সেন্ট জেমস কোর্টের বাণিজ্যবৈঠকে। ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ শিল্পপতি রমন রসলিঙ্গম বাংলার সঙ্গে ব্রিটেনের ঐতিহাসিক এবং সাংস্কৃতিক যোগের কথা উল্লেখ করেন। একটি বহুজাতিক সংস্থার তরফে এরিনা উইলিয়ামস বলেন, কলকাতায় তাঁদের নতুন দফতর খোলা হয়েছে। সেখানে কাজের পরিবেশ, পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা ইতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় কার্যত ভেসে যাচ্ছেন। এয়ারলাইন সংস্থার অন্যতম কর্ণধার অ্যালান ক্যাম্পবেল মমতার মতিগতি বুঝে আগেই বলে দেন, ব্রিটিশ এয়ারওয়েস যাতে কলকাতা-লন্ডন সরাসরি উড়ান চালায়, সে ব্যাপারে তিনি উদ্যোগী হবেন।